ডলার সঙ্কট ও সিন্ডিকেটের চাপ

নিত্যপণ্যের বাজার ফের অস্থির

শাহ আলম নূর
Printed Edition

দেশের নিত্যপণ্যের বাজার আবারো অস্থির হয়ে উঠেছে। চাল, চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল, পেঁয়াজ ও রসুনসহ দৈনন্দিন ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঊর্ধ্বমুখী। কোথাও কোথাও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে কাক্সিক্ষত স্থিতিশীলতা ফিরছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক বাজারের চাপ, ডলার সঙ্কট, এলসি খোলার জটিলতা, অভ্যন্তরীণ বাজারে সিন্ডিকেট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও নীতিগত দুর্বলতার সম্মিলিত প্রভাবেই এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে কয়েকটি প্রধান নিত্যপণ্যের আমদানি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে কমেছে। বিশেষ করে চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল ও গমের আমদানিতে ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও ডলার সঙ্কটে সময়মতো এলসি খুলতে না পারায় আগের মতো পণ্য আনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বাড়ছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরনো দেশী পেঁয়াজের দাম বর্তমানে কেজিপ্রতি ১৩০-১৪০ টাকা। আমদানি করা পেঁয়াজ ৯০-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নতুন ‘মুড়িকাটা’ পেঁয়াজ তুলনামূলক কম দামে ৮৫-৯০ টাকা কেজিতে পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কমলেও দেশীয় খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়েনি। সরু চাল (নাজিরশাইল, মিনিকেট) কেজিপ্রতি ৭০-৭৫ টাকা এবং মাঝারি চাল (পাইজাম, ব্রি-২৮, ব্রি-২৯) ৫৮-৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চিনির দামও বেড়েছে। কিছু দিন আগেও খোলা চিনি কেজিপ্রতি ৯০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ১০০-১১০ টাকায় উঠেছে। ডালের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি স্পষ্ট। ছোট মসুর ডাল কেজিপ্রতি ১৫৫-১৬০ টাকা এবং বড় মসুর ডাল ১৪০-১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ডালের দাম কেজিতে ১০-১২ টাকা বেড়েছে।

তবে তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমদানির চিত্র পুরোপুরি সঙ্কটময় নয়। অক্টোবর ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৫ সময়ে দেশে চিনি আমদানি হয়েছে চার লাখ ৫৪ হাজার টন, যা আগের বছরের থেকে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ভোজ্যতেলের আমদানি হয়েছে পাঁচ লাখ ৯৮ হাজার টন, যা ৩৫ শতাংশ বেশি। ডালের আমদানি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫৭ হাজার টনে, যা আগের বছরের চেয়ে ৮৬ শতাংশ বেশি। তা সত্ত্বেও বাজারে দাম কমছে না।

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী সৈয়দ মো: বশির উদ্দিন বলেন, ডলার সঙ্কটই নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ। ব্যাংকিং খাতে বৈদেশিক মুদ্রার টানাপড়েনে অনেক আমদানিকারক সময়মতো এলসি খুলতে পারছেন না। কেউ এলসি খুললেও পণ্য ছাড় করতে বিলম্ব হচ্ছে। এতে বন্দরে কনটেইনার জট তৈরি হচ্ছে এবং বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, ডলার উচ্চমূল্যে কিনতে হওয়ায় সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপছে।

তিনি আরো জানান, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতাও বড় ভূমিকা রাখছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়ায় পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প রুটে জাহাজ চলাচল করায় সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও পরিবহন ও বীমা ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে।

মৌলভীবাজারের চিনি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাসেম আলী মনে করেন, অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সিন্ডিকেটও বড় কারণ। তার মতে, অল্পসংখ্যক বড় আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীর আধিপত্যের কারণে সুযোগ বুঝে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করা হয়। প্রশাসনের নজরদারি দুর্বল হলে এই সিন্ডিকেট আরো সক্রিয় হয় এবং ভোক্তারা বাধ্য হয়ে বেশি দামে পণ্য কিনেন।

পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিও নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পুরোপুরি কাটতে না কাটতেই সড়কে চাঁদাবাজি, বিধিনিষেধ ও যানজট পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে পাইকারি থেকে খুচরা বাজারে পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত খরচ যোগ হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় উৎপাদনের সীমাবদ্ধতাও বাজার অস্থিরতার অন্যতম কারণ। চাল উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও ডাল, ভোজ্যতেল ও চিনির ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে। দীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরতা কমাতে না পারলে বাজার স্থিতিশীল করা কঠিন হবে। এ দিকে টিসিবির মাধ্যমে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য পণ্য বিক্রি করা হলেও তা মোট চাহিদার তুলনায় সীমিত। অনেক এলাকায় পণ্য সরবরাহ ও তালিকা নিয়ে অভিযোগ থাকায় বাজারে এর প্রভাব কম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল করতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। ডলার ব্যবস্থাপনা সহজ করা, এলসি প্রক্রিয়া দ্রুত করা, অপ্রয়োজনীয় আমদানি খরচ কমানো, পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই অস্থিরতার বোঝা আরো দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে।