মসজিদের শহর ঢাকা। এই শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে আছে শত শত বছরের ইসলামী ঐতিহ্যের নিদর্শন। সেই ইতিহাসের পাতায় এক উজ্জ্বল নাম ‘বিনত বিবি মসজিদ’। এটি কেবল একটি প্রাচীন উপাসনালয় নয়, বরং মধ্যযুগীয় বাংলার নারীর ক্ষমতায়ন ও ধর্মীয় নিষ্ঠার এক অনন্য দলিল। পুরান ঢাকার নারিন্দায় অবস্থিত এই মসজিদটি ঢাকার বিদ্যমান প্রাচীনতম মুসলিম স্থাপত্য হিসেবে স্বীকৃত।
ইতিহাসবিদ ও শিলালিপির তথ্যানুযায়ী, মসজিদটি সুলতানি আমলের শেষ দিকে নির্মিত। ১৪৫৬ খ্রিষ্টাব্দে (হিজরি ৮৬১) মারহাফত বিনত নামক এক ধর্মপ্রাণ নারী এটি নির্মাণ করেন। তিনি ছিলেন আরকান আলী নামক এক সওদাগরের মেয়ে। প্রাক-মুঘল যুগে যখন সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে পুরুষের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তখন নিজস্ব অর্থ ও উদ্যোগে এই মসজিদ নির্মাণ করে এক সাহসী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন বিনত বিবি। তার নামেই কালক্রমে মসজিদটি পরিচিতি লাভ করে।
বিনত বিবি মসজিদের আদি কাঠামোতে সুলতানি ও প্রাক-মুঘল স্থাপত্যের সংমিশ্রণ দেখা যায়। এটি মূলত একটি বর্গাকার ও এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ ছিল। এর চার কোণে ছিল চারটি ছোট অষ্টকোণাকৃতি বুরুজ বা মিনার। চুন-সুরকি ও পাতলা ইটের গাঁথুনিতে নির্মিত দেয়ালে ছিল পোড়ামাটির ফলক (টেরাকোটা) ও জ্যামিতিক কারুকাজ, যা বাংলার আদি মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পুরান ঢাকার নারিন্দা রোড ও পঞ্চবাটি মোড়ের নিকটবর্তী এলাকায় এটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মসজিদ চত্বরেই একটি প্রাচীন কবর রয়েছে, যা স্থানীয়দের বিশ্বাস অনুযায়ী বিনত বিবির নিজের। পাশেই তার বাবা আরকান আলীর সমাধি ছিল বলে ধারণা করা হয়। যদিও আধুনিক সংস্কারের ফলে মূল সমাধি কাঠামোর আদি রূপ অনেকটা বদলে গেছে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও মুসল্লিদের চাহিদার কারণে বিভিন্ন সময়ে মূল মসজিদটির ব্যাপক সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। আদি এক গম্বুজের জায়গায় বর্তমানে বহুতল ভবন ও নতুন গম্বুজ নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর একে সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে তালিকাভুক্ত করলেও আধুনিক নগরায়নের চাপে এর প্রাচীন নান্দনিকতা এখন অনেকটাই ম্লান। বিনত বিবি মসজিদ প্রমাণ করে যে, ইসলামে নারীর সম্পত্তির অধিকার এবং জনকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ সুদূর অতীত থেকেই বিদ্যমান ছিল। এটি কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; বরং মধ্যযুগীয় বাংলার এক নারীর স্বপ্ন ও সাহসের বহিঃপ্রকাশ। ঢাকার ইতিহাসের শেকড় কতটা গভীরে, এই মসজিদটি আমাদের সেই সত্যই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই এর সঠিক সংরক্ষণ ও ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।



