সাক্ষাৎকার : অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

ঐক্যবদ্ধ না হলে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition

শিক্ষাবিদ, দর্শনশাস্ত্রজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছেন, দেশে এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বে দূরদর্শিতা প্রয়োজন। নিজেরটা না দেখে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড় তা আক্ষরিক অর্থে নিয়ে আসতে হবে। জাতীয় স্বার্থে ও ইস্যুতে আমাদের এক লাইনে আসতে হবে। তিনি বলেন, জাতিগত ও আন্তর্জাতিকভাবে আমরা এক জটিল পর্যায়ে রয়েছি। ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ঐক্যকে যথেষ্ট শক্তিশালী করতে পারছি না।

নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, দলমত নির্বিশেষে জাতি ঐক্যবদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত তরুণদের আত্মত্যাগ, হাদির মৃত্যু, অনেক তরুণের অঙ্গহানির পেছনে যে আকাক্সক্ষা ছিল তা পূরণ হবে না। গত দেড় বছরে আমরা আমাদের লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছি। যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল তারাও কিন্তু ভাগ হয়ে গেছে। অনেকে দল ছেড়ে অন্য দলে যাচ্ছে। ছোটছোট আপসকামিতা, ছোটছোট সুযোগ সুবিধা এই তরুণদের বিভ্রান্ত করছে।

সাক্ষাৎকারের চৌম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা হলো :

নয়া দিগন্ত : জুলাই আন্দোলনে মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন আমাদের সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে কোথায় নিয়ে যাবে? এর দার্শনিক ভিত্তি কী?

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : সামাজিক বা রাজনৈতিক বিপ্লবের আগে প্রথম যে বিবর্তন ঘটে তা মানুষের মনে, যাকে আমরা বলি মনোবিপ্লব। কাজ করার আগে মানুষ প্রতিনিয়ত ভাবে। যেমন-আমরা বলি ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। জুলাই আন্দোলনে যে পরিবর্তন আমরা দেখলাম তা মনোজগতে পরিবর্তনের বিস্ফোরণ। শিকড় গেড়ে বসা একটা শাসনব্যবস্থা এবং সেই সাথে শাসক, তাদের সাথে যারা সহযোগী ছিল তাদের পতন হয়ে গেল। একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। এটি একদিনে হয়নি। দর্শনশাস্ত্রে বলা হয় বিবর্তনিক ইভালিউশন। ধীরে ধীরে সংগোপনে যেটা ঘটে তা বিবর্তন। বিপ্লব কোনো সূচিকর্ম না। এটা হচ্ছে একটা শ্রেণী আরেকটা শ্রেণীকে জোর করে ক্ষমতাচ্যুত করে দেয়, যা জুলাই আন্দোলনে দেখলাম। তাদের প্রত্যাশা কিন্তু পূরণ হয় নাই। তারা অপেক্ষা করছে, প্রতিক্ষেত্রে তারা বঞ্চিত হচ্ছে।

নয়া দিগন্ত : তারা কথা বলতে পারছে না?

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : এমনকি নিজের দাবি জানাতে পারছে না। একটাপর্যায়ে যারা মূল ক্ষমতায় তারা পর্যন্ত বন্দী হয়ে গেল। শেখ হাসিনা নিজেও কিন্তু একটাপর্যায়ে স্বাধীনভাবে ভাবতে ও কথা বলতে পারত না। শহীদ মুনীর চৌধুরীর শিক্ষক ছিলেন মুহাম্মদ আব্দুল হাই। ওনার একটা বই আছে, ‘তোষামোদ ও রাজনীতির ভাষা’। এখন আমাদের রাজনীতির মধ্যে তোষামোদ ঢুকে গেছে। শুধু রাজনীতি নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রে তোষামোদ মানে অতি কথন। অতিরঞ্জন, যে যা না তাকে তা বলা। রাজনৈতিককর্মীরা সেøাগান দিচ্ছে, ‘আমার নেতার চরিত্র, ফুলের মতো পবিত্র’, কর্মীরা হাসছে, নেতাও হাসছে, নেতাও জানে তিনি একটা চরিত্রহীন। ৫৫ বছরের বেশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছি, শেষ দিকে অনেক ছাত্রী এসে আমাকে বলত, স্যার আমার বিয়ে, আপনি থাকবেন। মজা করে বলতাম কে ঠিক করল, বলত নিজেরাই ঠিক করেছি। মেয়ে নিজেই জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। এখন ক্ষমতার সুউচ্চ শিখরে যারা; তারা কিন্তু ঘেরাও করা। সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বলেছিলেন, একটা ডিম উনি পুরোটা খেতে পারেন না। স্বৈরশাসক যে সেও নিয়ন্ত্রণে।

শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর আস্তে আস্তে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর দিকে ঝুঁকে গেলেন। তখন ভারত খুশি হয়নি। ওআইসির সম্মেলনে পাকিস্তানে যান শেখ মুজিবুর রহমান ইন্দিরা গান্ধীর কথা না মেনে। তখন তিনি ভারতকে বলেছিলেন, যুদ্ধে তোমরা আশ্রয় দিয়েছো, সাহায্য করেছে কিন্তু ভারত তো আমাকে খাদ্যসহায়তা দিতে পারবে না। ওই সময়ের মধ্যপ্রাচ্য আজকের চেয়েও অনেক ধনী ছিল।

তো জুলাই আন্দোলনেরও একটা দীর্ঘ ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল, চৈন্তিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে জুলাই আন্দোলন দীর্ঘ বঞ্চনার ভেতর থেকে উঠে এসেছে। দীর্ঘ ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা ও তোষামোদের কারণে মূল ক্ষমতায় যাদের মনে করা হয়, তারা আসলে ‘কাগুজে বাঘ’। শেখ হাসিনাও বুঝতে পারেনি তার কমান্ড আর কাজে আসবে না। তিন ও চার আগস্টে তিনি বলেছেন, আমি তো তোমাদের সুযোগ সুবিধা দিয়েছি, সেনাবাহিনী প্রধান তার আত্মীয় হন, এমন একটা পরিস্থিতি হয়েছিল তার কথাও তিনি মানতে পারছেন না। পরিস্থিতি এমন একটা পর্যায়ে গিয়েছে, যখন তা শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। জনগণ রাস্তায় বের হয়ে গেছে। এখন মারবেন, কয়জনকে মারবেন।

নয়া দিগন্ত : অনেক সময় নীরব প্রতিবাদও তো একপর্যায়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : এই যে মানববন্ধনে দেখেন সবাই নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, ‘থ্রু সাইলেন্স, দে আর স্পিকিং’, দর্শনের ভাষায় বলে, ‘অনুচ্চারিত ভাষা’, অনেক সময় সাইলেন্স ল্যাঙ্গুয়েজ অনেক বেশি শক্তিশালী। একটা লোক দুর্ঘটনায় মাটিতে পড়ে গিয়ে বলছে, আমাকে সাহায্য কর, হাসপাতালে নিয়ে যাও, আশে পাশের কেউ শুনছে না। আবার সাদা কাপড় দিয়ে একটা লোককে ঢেকে রাখা হয়েছে, তার পাশেই ছোট একটা মেয়ে নিশ্চুপ বসে কাঁদছে, দেখবেন অনেকে তাকে সাহায্য করছে। যেমন- বলা হয় অমুক মৃত নেতা জীবিত নেতার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এই সাইলেন্স একসময় আবার প্রকাশিত হয়। ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগে যেমন হয়, মনুষ্য সমাজেও এমন সৃষ্ট হয়। ওই রকমই একটা ঘটনা আমাদের ৫ আগস্ট।

নয়া দিগন্ত : নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে নির্বাচিত সরকার আসবে, তো মানুষের ভেতরের এই আকাক্সক্ষা বা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দাবি যদি পূরণ না হয়, তাহলে এই ভাঙ্গাগড়ার খেলা কি চলতেই থাকবে?

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : ইতিহাস তাই বলে। রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। কিন্তু অপটিমিস্টিক বা আশাবাদী লোক হিসেবে বলি এমন কোনো মেঘাচ্ছন্ন আকাশ নেই যা পরিষ্কার হবে না। এমন রাত নেই, যা পোহাবে না। যতক্ষণ না মানুষের আচরণের মধ্যে, চিন্তার মধ্যে, কর্মের মধ্যে বড় কোনো পরিবর্তন না হচ্ছে, তখন মানুষ প্রত্যাশা করবে, যত বেশি প্রত্যাশা করবে তত বেশি আশাহত হবে। আবার নতুন বিকল্প সে খুঁজবে। এভাবে সমাজ এগিয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাস বলে আকাশ কখনো কখনো মেঘাচ্ছন্ন হবে, কিন্তু ইতিহাস কখনো পুরোপুরি পেছনে চলে যাবে না। মানুষ বলছে হয়তো বিএনপি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসবে, বিএনপির কাছাকাছি কোনো দল ক্ষমতায় আসবে। তবে তারা দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রত্যাশা, কতটা দলটি পূরণ করতে পারবে বলা মুশকিল। এমন না যে আমি একটা কমান্ড দিয়ে দিলেই সব হয়ে যাবে। জনগণ তাদের মধ্যে যদি চেতনার স্তর উন্নতি না হয়, তাদের যদি নৈতিক মান উন্নত না হয়, তাদের মধ্যে যদি পরম সহিঞ্চুতা না আসে, তাদের মধ্যে যদি একটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অনুভূতি কাজ না করে, বাস্তব অবস্থার সৃষ্টি না হয় তাহলে আমার মনে হয় না আমরা বেশি দূর যেতে পারব। আবার একটা বিপ্লব, আরেকটা প্রতিবিপ্লব হবে। একটা ক্রিয়া আরেকটা প্রতিক্রিয়া হবে। নিজেদের পরিবর্তন না করে খুব বেশি প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, খোদ আল্লাহ যিনি সর্বশক্তিমান, আল্লাহ কেন জাতির ভাগ্যের পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, আমরা যদি ভাগ্যের পরিবর্তন করি তাহলে আল্লাহর দরকার কী? আল্লাহরও দরকার আছে, কারণ তার সৃষ্টির মধ্যেই তো কাজ করে। তো এমন না যে কেউ আসবেন, কোনো একজন নেতা আসবেন, ঘোষণা দেবেন আর সব হয়ে যাবে তা নয়। বিদায় হজ্জের ভাষণ রাসূলুল্লাহ সা: শেষে দিয়েছেন। হঠাৎই মক্কা শরিফে আবির্ভূত হয়ে তিনি কিন্তু ওই ভাষণ দেননি।

নয়া দিগন্ত : তার আগে তো তাকে সমাজ গঠন, এমনকি যুদ্ধ বিগ্রহের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : মানুষ গঠন করতে হয়েছে। সোনার দেশ, সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ লাগবে। সোনার মানুষ মানে স্বর্ণ দিয়ে তৈরি নয়, নৈতিক মানুষ। বিবেকবান মানুষ, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষ। যে মানুষের হৃদয় ভালোবাসায় পূর্ণ। বর্তমান যুগে নতুন আইডিয়া আসছে, শুধু মানুষকে ভালোবাসলে হবে না, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে। নির্বিচারে প্রকৃতির ওপর অবহেলা করছি, প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। ন্যাচারাল জাস্টিস হচ্ছে। নিশ্চয় আমরা আশা করব কিন্তু মানুষের ব্যবহার পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে একধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। মিথ্যা বলবে না, সদা সত্য বলবে এসব নীতি কথা হারিয়ে গেছে।

নয়া দিগন্ত : বাজার অর্থনীতিতে সব ঘুরপাক খাচ্ছে, পণ্যে পরিণত হচ্ছি আমরা।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : এটা হচ্ছে কার্লমাক্সের বিচ্ছিন্নতাবাদ। জীবনের একটা পর্যায়ে মানুষ ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেকে ঢাকা থেকে গ্রামে আর ফিরে যেতে পারে না। অনেক প্রবাসীকে দেখেছি সিলেটে অনেক টাকা খরচ করে বাড়ি করে। কিন্তু সে জীবনে আর আসতে পারে না। এবং একপর্যায়ে সে তার নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সে নিজেই কমোডিটিতে পরিণত হয়ে যায়। এটা কিন্তু সবটা তার হাতে না। সবটা একটা দেশের হাতেও না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাহেব যেমন ইরানের প্রতি আগ্রাসী মনোভাব নিয়েছিলেন, বিশ্বজনমতের চাপে তা হতে পারেনি। মধ্যেপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর চাপ আছে। তাই যদি মনে করেন, কেউ আসবে আর একটা ঘোষণা দেবে আর আমাদের পরিবর্তন হয়ে যাবে, ইতিহাস তা বলে না।

নয়া দিগন্ত : দিন কয়েক আগে জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব ব্রিটেনে দেয়া এক ভাষণে বললেন গত বছর বিশ্বের সামরিক বাজেট ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে যা ব্রিটেনের দেয়া সহায়তার ২০০ গুণ বেশি এবং ব্রিটেনের অর্থনীতির ৭০ শতাংশ বেশি। এত বেশি সামরিক ব্যয় করছে সভ্যতার ধারক দেশগুলো তো আমরা সমাজ, দর্শন, রাজনীতি চর্চা করে বেশি দূর আগাতে পারব কিভাবে?

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : দীর্ঘদিন ব্রিটেন ও আমেরিকায় পড়াশুনা করেছি। ওদেরকে কাছ থেকে দেখেছি, একসময় ব্রিটেন রাজ্যে সূর্যাস্ত যেত না। এতবড় সাম্রাজ্য যে এক জায়গায় সূর্য ডুবলেও অন্য জায়গায় উঠছে। এখন তারা হারাতে হারাতে নিজেদের মধ্যে কেন্দ্রিভূত হয়ে গেছে। তো লেখাপড়ার মান ওদের ভালো বলে এটাকে তারা পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে। চীন, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া অনেক ইলেকট্রনিকস সহজে বানায়, আমেরিকা সেগুলো কেনে, আমরা মনে করি। কৌতুক আছে না বিদেশ থেকে জামা কাপড় কিনে দেশে এনে দেখে যে মেড ইন বাংলাদেশ। কিন্তু ওদের দেশে জামাকাপড়, খেলনা, গাড়ি বানাতে গেলে খরচ বেশি পড়ে। আমাদের মতো সস্তা শ্রম নেই। তার চেয়ে তারা এমন এমন প্রযুক্তি পণ্য ও অস্ত্র তৈরি করে যেগুলো অনেক বেশি এক্সপেনসিভ। অস্ত্র কখন বিক্রি হয় যখন অন্য দেশগুলোতে বিভেদ বাড়ে। পশ্চিমারা খেলনা পিস্তল তৈরির বিরুদ্ধে, যাতে তাদের শিশুরা সন্ত্রাসী না হয়ে ওঠে। কিন্তু বিক্রি করে যুদ্ধ করে টিকে থাকে তারা। পশ্চিমাদেশগুলোকে তারা কি আসলে খুব সভ্য? ইউকেতে দেখেছি ওরা ওদের স্কুলে ছেলেমেয়েদেরকে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত ভারতের ইতিহাস পড়ায় না। তারা যাতে না জানে ভারত ইউকের চেয়ে অনেক আগে থেকে সভ্য দেশ। বারো-তেরো বছরের বাচ্চা যদি জিজ্ঞেস করে কেন তোমরা সভ্যদেশটাকে পদানত করেছিলা। সে যখন নাইন টেনে উঠে যায় তখন তার মধ্যে স্বার্থবুদ্ধি ডেভেলপ করে। সে তখন বুঝে ঠিক আছে আমাদের স্বার্থে আমরা ভারতকে পদানত করেছি। সক্রেটিসের সেই বাক্য, জ্ঞানই পূণ্য। জ্ঞানভিত্তিক সমাজব্যবস্থার কথা সেইজন্য আমরা বলি। এরিস্টটল এসে বললেন, জ্ঞানই যে সব তা নয়। আমরা জ্ঞান মানব কি না সেটা বিবেচ্য।

জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব যত কথাই বলেন, উনি আসলে কাগুজে বাঘ। কারণ তার একটা বড় ফান্ডিং আসে আমেরিকা থেকে। ভেটো পাওয়ার জাতিসঙ্ঘের মূল অ্যাক্টিভিটিজগুলো নাকচ করছে, দুর্বল করছে। স্বার্থের জন্য তারা যুদ্ধাবস্থা বজায় রাখবে, হয়তো ফ্রন্ট চেঞ্জ করবে।

নয়া দিগন্ত : আমরা আমাদের অস্তিত্বকে কিভাবে বাঁচাবো..

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সাথে নৈতিকতার মিশ্রণ দিয়ে আমাদের টিকে থাকতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনগণের অর্থ লোপাট বা অপব্যবহার থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। অব্যবহৃত রাখা যাবে না। এটাও ওয়াইডার অর্থে আপনার চরিত্রের একটা নেগেটিভ সাইট।

নয়া দিগন্ত : শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে তরুণরা ফের আধিপত্যবাদ রুখে দেয়ার শক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে, বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : এটাকে আমাদের স্যালুট করতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহ। এটা ন্যায়সঙ্গত। বুড়োরা নীরবে সহ্য করি। তরুণদের মধ্যে যে আবেগ আছে এটা জরুরি। এটা যথার্থ। কারণ তাদের সহজ সেøাগান, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, তারা ন্যায়বিচার চাচ্ছে, ইনসাফ চাচ্ছে, ইনকিলাব বলছে। এর মানেটা কী? এ সমাজ ভাঙ্গব, নতুন সমাজ গড়ব। সমস্যা হচ্ছে এটাকে ধরে রাখা। ধরে রাখার জন্য তরুণদের আবেগের সাথে বয়স্কদের বুদ্ধিমত্তাটা নিতে হবে। শুধু আবেগে তো কাজ হয় না। গ্লোবাল ওয়ার্ল্ডে বাংলাদেশ কোনো আইসোলেটেড আইল্যান্ড না। আমি আমার বন্ধু নির্বাচন করতে পারি কিন্তু বাপ-মা নির্বাচন করতে পারি না। প্রতিবেশী নির্বাচন করতে পারি না। সবার সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে বৈরিতা নয়, এমন বাস্তবসম্মত হওয়ার পাশাপাশি ভারতের সাথে সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে না ধরতে পারলে আমাদের অস্তিত্ব হারিয়ে যাবে। বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিক অবস্থানে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠী, এর ধর্মীয় ডেমোগ্রাফি নিয়ে আমরা এক মহাচ্যালেঞ্জের ভেতরে আছি। এক দিকে চীন বিরাট শক্তি, আরেক দিকে আমেরিকা বিরাট শক্তি। আগে আমরা ভূমিকে গুরুত্ব দিতাম, এখন জলসীমা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। এসব জিনিস নিয়ে আমরা জটিল অবস্থায় আছি। আবেগ থাকতে হবে, আইডেন্টটিটির সার্বভৌমত্ব রাখতে হবে। একই সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ধরে রাখতে হবে। আর্মিতে বলে ওয়ান স্টেপ ব্যাকওয়ার্ড, টু স্টেপ ফরোয়ার্ড। কখনো আমাদের এ ফ্রন্ট চেঞ্জ করতে হবে।

নয়া দিগন্ত : তরুণদের সহায়তার জন্য বুদ্ধিজীবী, সুশীলসমাজ, রাজনীতিবিদদেরও তো এগিয়ে আসা উচিত।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : শিক্ষক, সাংস্কৃতিককর্মী, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ সবার ভূমিকা পালন করতে হবে। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেক বড় বিভক্তি বিরাজ করছে। কুরআন এক, কাবা এক বলি, কিন্তু আমরা এক ফ্রন্টে আসতে পারছি না। ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ঐক্যকে যথেষ্ট শক্তিশালী করতে পারছি না। এটা না হওয়া পর্যন্ত তরুণদের আত্মত্যাগ, হাদির মৃত্যু, তাদের যে আকাক্সক্ষা ছিল তা পূরণ হবে না। লক্ষ্য করুন গত দেড় বছরে আমরা আমাদের লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছি। যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল তারাও কিন্তু ভাগ হয়ে গেছে।

নয়া দিগন্ত : ৫ আগস্টের আগে অনেকে ভীত ছিলেন যে গৃহযুদ্ধ বাঁধবে, দুর্ভিক্ষ ঠেকানো যাবে না। তো সেসব বাধাকে দূর করে আমরা এতটা পথ অতিক্রম করে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অবশ্যই উজ্জ¦ল দেখি। বাংলাদেশীরা দেশে এলে নিয়ম মানে না কিন্তু পৃথিবীর যেকোনো দেশে তারা গেছে মেধার পরিচয় দিয়েছে। দেশের বাইরে তারা সবচেয়ে ওবিডিয়েন্ট, মেরিটোরিয়াস।

নয়া দিগন্ত : সঠিক নেতৃত্ব প্রয়োজন।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : ঠিক। নেতৃত্বের দূরদর্শিতা প্রয়োজন। নিজেরটা না দেখে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড় তা আক্ষরিক অর্থে নিয়ে আসতে হবে। জাতীয় স্বার্থে ও ইস্যুতে আমাদের এক লাইনে আসতে হবে। এ জন্য স্যাক্রিফাইস করতে হবে, নিজেরা সবটা নিয়ে থাকলে হবে না। বিচার মানব তালগাছ আমার- তাহলে বিচারটা হবে না।