- বিপণন কোম্পানিগুলোর দাবি : সরবরাহে কোনো সঙ্কট নেই
- জনমনে জিজ্ঞাসা : এত তেল যাচ্ছে কোথায়?
- পাম্প মালিকদের মতে : রেশনিংয়ের ঘোষণা না দিলে এই সমস্যা হতো না
- পরামর্শ : সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে রিফাইনারি থেকে সরাসরি পাম্পে সরবরাহের প্রস্তাব
চট্টগ্রাম বন্দরে একের পর এক জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ নোঙর করছে, আবার তেল খালাস করে ফেরতও যাচ্ছে। বেসরকারি রিফাইনারিগুলোতেও পেট্রল-অকটেন রাখার মতো স্টোরেজ ট্যাংক খালি নেই। কিন্তু জ্বালানি তেলের পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি এখনো বহাল। ফলে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- এত তেল যাচ্ছে কোথায়? তেল বিপণন কোম্পানিগুলো বলছে সরবরাহে কোনো সঙ্কট নেই, অথচ পাম্প মালিকদের দাবি, আগে কখনো এত পরিমাণ তেল তারা বিক্রি করেননি।
একটি সূত্র দাবি করেছে, মার্চ মাসে বেসরকারি রিফাইনারির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সরবরাহ না পেয়ে সরকারকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া দামে তেল কিনতে হয়েছে। বাড়তি রেটের আশায় বেসরকারি রিফাইনারিগুলো গত মাসে তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী বিপিসিকে পেট্রল ও অকটেন সরবরাহ না দেয়ায় এক ধরনের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে, যা বাজারে সঙ্কটকে তীব্র করে তুলেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, এক দিকে চট্টগ্রাম বন্দরে তেলবাহী জাহাজের ভিড়, অন্য দিকে সরকার পাম্পগুলোতে সরবরাহ ২০% বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। তা সত্ত্বেও পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন কমছে না। একাধিক পাম্প মালিক জানান, গত বছরের তুলনায় ৩০% পর্যন্ত সরবরাহ কম দেয়া হচ্ছে। তারা আরো জানান, ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কে মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করছে। মোটরবাইক চালকরা দিনে কয়েকবার তেল নিচ্ছেন এবং ৫-৬ লিটার নেয়ার গাড়িগুলো এখন ২০ লিটার করে তেল নিচ্ছে। পাম্প মালিকদের মতে, সরকার রেশনিংয়ের ঘোষণাটা না দিলে এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
সরবরাহ ও মজুদের প্রকৃত চিত্র
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬৮.৩৫ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি সরবরাহ করেছে, যার মধ্যে ডিজেল ৬২.৬৯% এবং অকটেন ৫.৯০%। বর্তমান পরিস্থিতি নিম্নরূপ :
ডিজেল : চলতি মাসে চাহিদা ৪ লাখ টন। ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত মজুদ ১ লাখ ২২ হাজার ৬৩৩ টন এবং খালাসের অপেক্ষায় আছে ১ লাখ ৬৪ হাজার টন।
অকটেন : মাসিক চাহিদা ৪৭ হাজার টন। ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত মজুদ ছিল ২৭ হাজার ৬০২ টন। গত মঙ্গলবার নতুন জাহাজে আরো ২৭ হাজার টন অকটেন খালাস হয়েছে। এর বাইরে বেসরকারি রফাইনারিগুলোর মজুদ এখনো হিসাবের বাইরে।
পেট্রল : মজুদ ১৮ হাজার ৪৫৪ টন।
ফার্নেস অয়েল : মজুদ ৬০ হাজার ৬৮৭ টন (৩০ দিনের জন্য পর্যাপ্ত)।
বিপিসি জানিয়েছে, আমদানির পাশাপাশি সুপার পেট্রো পিএলসি, অ্যাকোয়া রিফাইনারি এবং পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন গ্রহণ করা হয়েছে। তবে সুপার পেট্রকেমিক্যাল গত ১৬ এপ্রিল বিপিসিকে চিঠিতে জানিয়েছে, তারা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করলেও ৮ এপ্রিল থেকে বিপিসি তেল নিতে অপারগতা জানাচ্ছে। ফলে তিনটি ট্যাংকার বর্তমানে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে এবং স্টোরেজ সঙ্কটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
কেন এই কৃত্রিম সঙ্কট?
বিপিসির সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধকালীন সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ৩০ দিনের জোগানকে টেনে ৬০ দিনে রূপান্তর করার জন্য সরবরাহে রেশনিং করা হয়েছে। তবে তিনি অভিযোগ করেন, বেসরকারি রিফাইনারিগুলো মার্চের আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্য পাওয়ার আশায় (এপ্রিলের পেমেন্ট রেট বেশি) উদ্দেশ্যমূলকভাবে গত মাসে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল। তাদের সরবরাহের ওপর ভরসা করে বিপিসি মার্চে আমদানির পরিকল্পনা রাখেনি, যা সঙ্কটের মূল কারণ।
অন্য দিকে সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারির সাবেক ডিএমডি নিজাম উদ্দিন মাহমুদ হোসেন পরামর্শ দেন, যেহেতু বিপিসির স্টোরেজ ট্যাংক আমদানিকৃত তেলে পূর্ণ, তাই বেসরকারি রিফাইনারির তেল সরাসরি ডিও লেটারের মাধ্যমে পাম্পে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করলে স্টোরেজ ও বাজার-উভয় সঙ্কটই দ্রুত সমাধান সম্ভব।
পদ্মা অয়েল পিএলসির এমডি ইঞ্জিনিয়ার মো: মফিজুর রহমান জানান, সরবরাহ ২০% বাড়ানো হয়েছে এবং বড় শহরগুলোতে দীর্ঘ লাইন কমতে শুরু করেছে। তিনি দাবি করেন, গত বছরের আনুপাতিক হারেই পাম্পগুলোতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে এবং বর্তমানে কোনো জাহাজ ডেমারেজ (ক্ষতিপূরণ) দিচ্ছে না, যা প্রমাণ করে স্টোরেজ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
উল্লেখ্য, দেশে সরকারি সিলেট গ্যাসফিল্ডের পাশাপাশি সুপার পেট্রোকেমিক্যাল, অ্যাকোয়া রিফাইনারি, পারটেক্স পেট্রো এবং পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি নিজস্ব কনডেনসেট থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন করে থাকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরো ১০-১২ দিন সময় লাগতে পারে।



