খুলনা ব্যুরো
- এখনো আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না
- হেড অফিসে তদবির করে আরো ঋণ নেয়ার চেষ্টা
খুলনায় পাট খাতে দেয়া সোনালী ব্যাংকের দেড় হাজার কোটি টাকা ঋণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। খুলনায় সোনালী ব্যাংকের ছয়টি শাখার ১১২ জন পাট ব্যবসায়ীর কাছে বকেয়া মোট ঋণের পরিমাণ এক হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা, যা সুদসহ তা বর্তমানে প্রায় দুই হাজার কোটিতে পৌঁছেছে।
সোনালী ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার অফিস সূত্রে জানা গেছে, খুলনা করপোরেট শাখার পাট খাতে ৫২ জন ব্যবসায়ীর কাছে দেয়া মোট ঋণ ৩৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। তাদের সবাই খেলাপি হয়েছেন। শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৯৯.৪৮ শতাংশ। দৌলতপুর করপোরেট শাখায় ১৯ জনের কাছে পাওনা ৬৬৯ কোটি পাঁচ লাখ টাকা । তাদের মধ্যে ১৬ জনের কাছে পাওনা ৪৩৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। দৌলতপুর কলেজ রোড শাখার ২০ জনের কাছে মোট পাওনা ৩২২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৯ জন খেলাপি গ্রাহকের কাছে পাওনা ৩১৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। শতকরা হিসাবে ঋণ খেলাপি ৯৮.৮৮ শতাংশ। একই চিত্র খুলনা, খালিশপুর এবং স্যার ইকবাল রোডে সোনালী ব্যাংক শাখায়। ঋণখেলাপি ১০৮ জন গ্রাহককে ব্যাংক থেকে চূড়ান্ত নোটিশ দেয়া হয়। এর পর লিগ্যাল নোটিশ দেয়া হয়েছে। সেগুলোরও সময় শেষ হয়েছে।
পাট ঋণের সব থেকে ভয়াবহ চিত্র সিসি প্লেজের ক্ষেত্রে। দেড় হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে প্লেজ ঋণই এক হাজার কোটি টাকা। পাট ব্যবসায়ীরা শুধু কাগজপত্রে প্লেজের গুদামে পাট দেখিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো পাট নেই। আওয়ামী আমলের শেষ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের যৌথ তদন্তে এসব চিত্র উঠে এসেছিল।
সোনালী ব্যাংক দৌলতপুর কলেজ রোড শাখার একটি সূত্রে জানা গেছে, সিরাজুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ী ব্যাংকের প্রধান কার্ষালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কক্ষে অবস্থান করে ঋণ পাস করে নিয়ে লোপাট করে দিয়েছেন। তিনি এখনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দিয়ে মুঠোফোনে আদেশ দিয়ে নানা সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। এই সিরাজুল ইসলাম ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বিধিবহির্ভূতভাবে দশ বছরে ৯০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। তিনি ও ছেলে সুমনসহ তাদের তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছে সোনালী ব্যাংকের এখন প্রায় একশত কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। সম্প্রতি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ কেউ সিরাজুল ইসলামকে সুবিধা দিতে আবারো ফোন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শাখা থেকে লিখিত আদেশ না দিলে কোনো ঋণ ডিসবার্স করা সম্ভব না বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাংকের খুলনা জোনের জেনারেল ম্যানেজার মো: মোশারেফ হোসেন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, পাট খাতে যারা ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেয় না তারাই বারবার সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। আর যারা নিয়ম মানছে তাদের কোনো সুবিধাই দেয়া যাচ্ছে না। ফলে ব্যাংকিং খাত ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ব্যাংকের অর্থ লোপাটের অন্যতম হোতা ভিজে সিরাজ নামে এক নতুন রফতানিকারক।
পাট ব্যবসায়ীদের একটি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ সৈয়দ আলী বিগত সরকারের আমলে অর্থমন্ত্রী বরাবরে একটি চিঠি পাঠান। ওই চিঠিতে তারা কাঁচা পাট রফতানিকারকদের সব বকেয়া এবং দেনা একটি সুদবিহীন ব্লকড হিসাবে স্থানান্তর করে ১০ শতাংশ সহায়ক জামানত গ্রহণ করে ২৫ বছরে পরিশোধের সুযোগ দাবি করেন। সে সময় খুলনা-৩ আসনের এমপি ও সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মুন্নুজান সুফিয়ানসহ বিজেএর নেতারা অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের আবেদনের পক্ষে নানা যুক্তি দেখিয়েছিলেন।
এ ব্যাপারে সোনালী ব্যাংক খুলনা জোনের জেনারেল ম্যানেজার জাহিদুর রহমান বলেন, পাট খাতে বিনিয়োগকৃত সব ঋণখেলাপি হয়েছে। গত সরকার বিশেষ সুযোগ দেয়ায় তারা পাট খাতের ব্যবসায়ীদের দুই বছরের মধ্যে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নিতে পানেরনি। প্লেজে দেয়া ঋণ বিপর্যয়ের কারণে নতুন করে কোনো ঋণ দেয়া হচ্ছে না।
উল্লেখ্য, ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় ইতোমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সোনালী ব্যাংকের জিএম নেপাল চন্দ্র, একাধিক ডিজিএম, কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীসহ সাতজনের নামে মামলা করেছে।



