বিশেষ সংবাদদাতা
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুথিডং অঞ্চলের ছোট্ট রোহিঙ্গা গ্রাম হোইয়ার সিরি। একসময় যেখানে ছিল ধানক্ষেত, গবাদিপশু আর শিশুদের কোলাহল- আজ সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পোড়া ঘরের ধ্বংসাবশেষ, মানুষের কঙ্কাল আর মাথার খুলি। ২০২৪ সালের ২ মে এই গ্রামেই সংঘটিত হয় ভয়াবহ এক হত্যাযজ্ঞ, যার পূর্ণ চিত্র প্রকাশ্যে আসে প্রায় দুই বছর পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মে ২০২৬ এর প্রতিবেদনে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ওমর আহমদ নামের এক রোহিঙ্গা গোপনে ফিরে যান নিজের গ্রামে। তিনি তখনো জানতেন না সেখানে অপেক্ষা করছে ভয়াল এক মৃত্যুর স্মৃতি। তিনি দেখেন, পুরো গ্রাম লুট হয়ে গেছে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। গ্রামের ধানক্ষেতে পড়ে আছে তার স্বজনদের কঙ্কাল। ওমর বলেন, ‘প্রতিটি পরিবারের গরু-ছাগল ছিল। কিন্তু এসে গ্রামে কোনো পশু দেখিনি। শুনেছি আরাকান আর্মি সব নিয়ে গেছে। যে ধানক্ষেতে প্রায় ৮০ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, সেখানে গিয়ে দেখি চারদিকে শুধু কঙ্কাল আর মাথার খুলি।’
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ২ মে অন্তত ১৭০ জন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করা হতে পারে। আহত বা নিখোঁজের সংখ্যা আরো অনেক বেশি। নিহতদের মধ্যে অন্তত ৯০ জন শিশু ছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ওই দিন ভোরে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াই চলছিল। আতঙ্কিত গ্রামবাসীরা সাদা পতাকা হাতে বুথিডং শহরের দিকে পালানোর চেষ্টা করলে আরাকান আর্মির সদস্যরা বিভিন্ন দিক থেকে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সতর্কতা ছাড়াই হামলা শুরু হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, স্যাটেলাইট ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ মিলেছে।
তৈন্যাপাড়া পাহাড়ের সেই অভিশপ্ত সকাল
গণহত্যায় বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গা নাগরিক ওমর আহমদ বলেন, ‘আমরা যখন গ্রামে ফিরে গেলাম, চারদিকে শুধু কঙ্কাল আর খুলি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখলাম। মাংস পচে গেলেও হাড়ের সাথে মানুষের পরিহিত পোশাক তখনো লেগে ছিল...”।
২০২৪ সালের মে মাসে রাখাইন রাজ্যের বুথিডং এলাকার হোইয়ার সিরি (মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নথিতে ‘হটান শাউক খান’) গ্রামে যে নৃশংসতা ঘটেছিল, তা বিশ্ববাসীর সামনে আসতে সময় লেগেছে এক বছরেরও বেশি। মিয়ানমার জান্তা এবং রাখাইনের সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’ (এএ) উভয় পক্ষের যুদ্ধংদেহি অবস্থানের মাঝে পিষ্ট হয়ে ওই দিন নির্মমভাবে প্রাণ হারান শত শত নিরস্ত্র রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু।
জান্তা ও আরাকান আর্মির সাঁড়াশি চাপ
২০২৪ সালের এপ্রিল ও মে মাসে রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য জান্তা বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র লড়াই শুরু হয়। হোইয়ার সিরি গ্রামটির অবস্থান ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায়- উত্তরে জান্তা বাহিনীর ‘১৫তম মিলিটারি অপারেশনস কমান্ড’ (এমওসি-১৫) এবং দক্ষিণ-পূর্বে ‘৫৫১তম লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন’ (এলআইবি-৫৫১)।
পরাজয়ের মুখে থাকা জান্তা বাহিনী গ্রামের সাধারণ রোহিঙ্গা তরুণদের জোর করে যুদ্ধে নামানোর চেষ্টা করে। তারা হুমকি দেয়, তরুণদের না পাঠালে পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হবে। অন্যদিকে, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের গ্রাম খালি করার নির্দেশ দেয়। সাধারণ গ্রামবাসীরা দ্বিমুখী সঙ্কটে পড়েন। জান্তা বাহিনী তাদের বাঙ্কারে অবরুদ্ধ করে রাখে এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ‘তোমরা মরলে আমরাও মরব।’
২ মে ২০২৪ : সেই নির্মম গণহত্যা
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ২ মে ভোরে জান্তা সেনারা গ্রামে ঢুকে পড়লে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে হোইয়ার সিরি এবং আশপাশের গ্রাম থেকে আসা হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা সাদা পতাকা হাতে নিয়ে বুথিডং শহরের দিকে রওনা হন। কিন্তু ‘তৈন্যাপাড়া পাহাড়’ নামক স্থানে পৌঁছানো মাত্রই কোনো সতর্কতা ছাড়াই চারদিক থেকে তাদের ওপর ভারী অস্ত্র দিয়ে গুলি চালানো শুরু করে আরাকান আর্মির যোদ্ধারা।
কবির আহমেদ নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ‘তারা মাত্র পাঁচ ফুট দূর থেকে গ্রামবাসীদের ওপর গুলি চালাচ্ছিল। প্রথমে আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হলো, তারপর আমার স্ত্রী ও ছোট মেয়ে দু’টি। আমার স্ত্রী যখন গুলি খেয়ে আমার পাশে পড়ে যান, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আমি অক্ষত আছি। তিনি শেষ মুহূর্তে তার কাছে থাকা ১,৪৫,০০০ কিয়াত আমার হাতে দিয়ে ফিসফিস করে আমাকে পালিয়ে যেতে বললেন। এক মিনিট পর তিনি চিরতরে শান্ত হয়ে গেলেন।’ আরেকজন বেঁচে যাওয়া নারী রশিদা খাতু জানান, একটি মসজিদের পাশের ধানক্ষেতে জড়ো করে বেসামরিক নাগরিকদের ব্রাশফায়ার করা হয়েছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নামসহ ১৭০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে ৯০ জনই শিশু। তবে স্থানীয় অধিকারকর্মীদের মতে, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে।
সত্য গোপন ও দীর্ঘ নীরবতা
ঘটনার পরপরই আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ‘ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান’ (ইউএলএ) এই হত্যাকাণ্ডের দায় সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। উল্টো তারা বন্দী গ্রামবাসীদের বন্দুকের মুখে ভুয়া ভিডিও সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করে, যাতে বলা হয় আরাকান আর্মি কোনো বেসামরিক মানুষ মারেনি। ২০২৫ সালের জুলাই মাসের দিকে যখন ওমর আহমদ এবং কবির আহমেদের মতো ভাগ্যাহত বেঁচে যাওয়া নাগরিকরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার শরণার্থী শিবিরে পৌঁছাতে সক্ষম হন, তখনই এই ভয়াবহ সত্য বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাসরপাড়া শিবিরের এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘তারা আমাদের টাকা-পয়সা, গয়না সব লুটে নিলো। এখন আমরা একটা খোলা খাঁচায় বন্দী-না আছে পর্যাপ্ত খাবার, না আছে কোথাও যাওয়ার স্বাধীনতা। উল্টো আমাদের দিয়ে দিনরাত খাটানো হচ্ছে...।’
উত্তর রাখাইনের হোইয়ার সিরি গ্রামে চালানো ওই গণহত্যার রক্ত শুকানোর আগেই শুরু হয়েছিল বেঁচে যাওয়া মানুষদের ওপর আরেক দফা নির্যাতন। আরাকান আর্মির নির্বিচার গুলি থেকে যারা অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন, তারা গত দুই বছর ধরে একবিংশ শতাব্দীর এক নির্মম দাসত্বের শিকার হয়ে আছেন।
লুটপাট, নাসরপাড়া বন্দিশিবির ও মানচিত্রহীন হোইয়ার সিরি
গণহত্যার পর প্রাণভয়ে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গারা বুথিডং উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বড় একটি দল যখন ‘উ হ্লা পে’ এলাকায় পৌঁছায়, তখন আরাকান আর্মির যোদ্ধারা তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। আশ্রয়প্রার্থী নারীদের অলঙ্কার এবং পুরুষদের কাছে থাকা শেষ সম্বল নগদ টাকা জোরপূর্বক কেড়ে নেয়া হয়। এরপর তাদের বাধ্য করা হয় হোইয়ার সিরি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত ‘নাসরপাড়া’ (বর্মী নাম ন্গেট থে) নামক একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে গিয়ে থাকতে।
দুই বছর ধরে এই অস্থায়ী শিবিরে অমানবিক জীবনযাপন করছেন বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গারা। ক্যাম্পের বাসিন্দাদের স্বাধীনভাবে চলাচলের কোনো অধিকার নেই। সেখানে তীব্র খাদ্য ও চিকিৎসা সঙ্কট রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বন্দী রোহিঙ্গাদের দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে বাধ্যতামূলক শ্রম করানো হচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঐতিহ্যবাহী হোইয়ার সিরি গ্রামটি পুড়িয়ে সম্পূর্ণ মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। দুই বছর কেটে গেলেও কোনো রোহিঙ্গাকে তাদের ভিটেমাটিতে ফিরতে দেয়া হয়নি। আরাকান আর্মির দাবি, গ্রামটিতে প্রচুর ‘ল্যান্ডমাইন’ এবং অবিস্ফোরিত বোমা ছড়িয়ে আছে। তবে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের ফিরতে না দিলেও আরাকান আর্মি ঠিকই সেই পোড়া ভূমির ওপর নিজেদের সামরিক চেকপোস্ট এবং গবাদিপশুর খামার তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ সীমান্ত ও প্রত্যাবাসন সঙ্কট
যেসব রোহিঙ্গা কোনোমতে আরাকান আর্মির চোখ ফাঁকি দিয়ে এক বছর পর (২০২৫ সালের মাঝামাঝি) বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে পেরেছেন, তারা এখন কক্সবাজার ক্যাম্পে আশ্রিত। তারা আন্তর্জাতিক আদালতে এই গণহত্যার বিচার চান। তবে তাদের ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চিত। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শরণার্থীদের অধিকারের ওপর নানা বিধিনিষেধ রয়েছে এবং ঢাকা দ্রুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে আগ্রহী। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর স্পষ্ট মত হচ্ছে মিয়ানমারে এই মুহূর্তে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের কোনো পরিবেশই নেই। জান্তা সরকার এবং আরাকান আর্মি-উভয় পক্ষই রোহিঙ্গাদের জন্য সমান বিপজ্জনক।
আজ দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো কোনো বিচার বা ক্ষতিপূরণ পায়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই উদাসীনতা রাখাইনে বসবাসরত অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের আরো বেশি অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
আইনের চোখে রাখাইন সঙ্ঘাত
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বা যুদ্ধের আইন অনুযায়ী, মিয়ানমার জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যকার এই লড়াই একটি ‘অ-আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সঙ্ঘাত’। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিশ্লেষণে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রে ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনের ‘কমন আর্টিকেল ৩’ এবং প্রথাবদ্ধ আন্তর্জাতিক মানবিক আইন সরাসরি প্রযোজ্য।
বেসামরিক প্রতিরোধ ও বৈষম্যের নীতি : যুদ্ধের আইন অনুযায়ী, সঙ্ঘাতের কোনো পক্ষই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে না। হোইয়ার সিসির ঘটনায় এই নীতি সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করা হয়েছে।
‘মানবঢাল’ ও জোরপূর্বক নিয়োগের অপরাধ : জান্তাবাহিনী রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করেছে এবং বেসামরিক এলাকাকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে। তদন্তের দাবি উঠেছে যে, জান্তাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধ করেছে কি না।
কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি : আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, শুধু মাঠপর্যায়ের যোদ্ধারাই নয়, আরাকান আর্মির শীর্ষ কমান্ডার এবং জান্তা নেতারাও এই যুদ্ধাপরাধের দায় এড়াতে পারেন না। অপরাধের কথা জেনেও তা না থামানো বা অপরাধীদের শাস্তি না দেয়া ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’র অধীনে মারাত্মক অপরাধ।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সুপারিশমালা
রাখাইনের এই ভয়াবহ মানবাধিকার বিপর্যয় ও যুদ্ধাপরাধের অবসান ঘটাতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ) সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ, বাংলাদেশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশমালা পেশ করেছে।
আরাকান আর্মি ও ইউনাইটেড লিগ অব আরাকানের প্রতি এইচআরডব্লিউর বক্তব্য হলো- আন্তর্জাতিক মানবিক আইন পুরোপুরি মেনে চলতে হবে। বেসামরিক নাগরিক ও তাদের সম্পদের ওপর হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং বন্দীদের সাথে মানবিক আচরণ করতে হবে। একই সাথে রোহিঙ্গাদের ওপর আরোপিত চলাচলের বিধিনিষেধ দূর করতে হবে এবং নাসরপাড়া ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের নির্বিচার আটকে রাখার প্রক্রিয়া বন্ধ করে সব বেসামরিক নাগরিককে মুক্তি দিতে হবে। এ ছাড়া নাসরপাড়া ক্যাম্প ভেঙে দিয়ে সেখানকার বাসিন্দাদের কোনো ভয়ভীতি বা জোরজবরদস্তি ছাড়াই স্বেচ্ছায় হোইয়ার সিরি বা তাদের পছন্দমতো যেকোনো স্থানে স্বাধীনভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণ বা গবাদিপশুর খামারে জোরপূর্বক ও বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম খাটানো বন্ধ করতে হবে। যুদ্ধে শিশু নিয়োগ এবং জোরপূর্বক রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিকদের সামরিক কাজে ব্যবহার করা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ সংস্থাগুলোকে অবাধে মানবিকসহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ দিতে হবে।
এ ছাড়া ভয় দেখিয়ে বা জোর করে রোহিঙ্গাদের দিয়ে নিজেদের নির্দোষ দাবি করার ‘ভুয়া ভিডিও জবানবন্দী’ বা বিবৃতি রেকর্ড করার অনৈতিক চর্চা বন্ধ করতে হবে। হোইয়ার সিরি গণহত্যার অকাট্য প্রমাণ (যার মধ্যে মানবদেহের অবশিষ্টাংশ বা কঙ্কাল অন্তর্ভুক্ত) আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থা আইআইএমএমর কাছে হস্তান্তর করতে হবে। সেই সাথে জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের তদন্তের জন্য ঘটনাস্থলে অবাধ প্রবেশাধিকার দিতে হবে।
মিয়ানমার সামরিক জান্তার প্রতি এইচআরডব্লিউর বক্তব্য হলো- আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে। যুদ্ধক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক ও বেআইনিভাবে নিয়োগ, বিশেষ করে শিশু সৈন্য ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষকে ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে। রাখাইনের সর্বত্র মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ সুগম করতে হবে এবং যুদ্ধাপরাধে জড়িত সেনাকর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ সরকারের প্রতি এইচআরডব্লিউর বক্তব্য হলো- মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং জোরপূর্বক পুশব্যাক না করার আন্তর্জাতিক নীতি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। হোইয়ার সিরি গণহত্যার শিকার এবং দীর্ঘদিন বন্দিদশা ও ট্রমার মধ্য দিয়ে যাওয়া শরণার্থীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মানসিক ও সামাজিক কাউন্সেলিং সেবা দিতে হবে। ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশে আসা নতুন শরণার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য, বাসস্থান এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। রাখাইনে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর যেকোনো প্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে হবে।
আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী, আসিয়ান, ভারত ও চীনের প্রতি এইচআরডব্লিউর বক্তব্য হলো- মিয়ানমারে চলমান যুদ্ধাপরাধের স্বাধীন তদন্তের স্বার্থে আইআইএমএম, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূতদের প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কৌশলগত সহায়তা দিতে হবে। মিয়ানমার জান্তা এবং আরাকান আর্মি- উভয় পক্ষকেই আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার জন্য কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে। মিয়ানমার ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মানবিকসহায়তার জন্য বৈশ্বিক তহবিলের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
এ ছাড়া জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদকে মিয়ানমারের ওপর একটি বৈশ্বিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারির প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে। চীন ও রাশিয়ার মতো সদস্য দেশগুলোকে এই অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবে সমর্থন দেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত জান্তা ও আরাকান আর্মির শীর্ষ নেতাদের চিহ্নিত করে তাদের ওপর সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।



