লুণ্ঠিত অস্ত্রের সাথে ভাবিয়ে তুলছে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড

জামিনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই এরই মধ্যে আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেয়া কিছু প্রার্থীকে সেল্টার দিতে শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, ওই প্রার্থীর হয়ে প্রতিন্দ্বীদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। যদিও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে শুরু থেকে এসব সন্ত্রাসীর জামিন বাতিল চেয়ে আবেদন করেছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিএমপি। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি।

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition
  • নির্বাচনে প্রার্থীদের সহায়তা দিতে কাজ করছে সন্ত্রাসীরা
  • ৪৫০ সন্ত্রাসীর নিয়ন্ত্রণে দেড় হাজারের বেশি অস্ত্র

আসন্ন নির্বাচনে লুট হওয়া অস্ত্র, জেল ভেঙে পালানো অপরাধী ও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড ভাবিয়ে তুলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। থানা ও জেলখানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও পালিয়ে যাওয়া অপরাধীদের বিষয়ে ঝুঁকি কিছুটা কম মনে করলেও ৫ আগস্টের পরে জামিন পাওয়া তালিকাভুক্ত ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে কয়েক গুণ। যার কারণে হত্যা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, হুমকিসহ বেড়েছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।

গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে, জামিনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই এরই মধ্যে আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেয়া কিছু প্রার্থীকে সেল্টার দিতে শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, ওই প্রার্থীর হয়ে প্রতিন্দ্বীদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। যদিও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে শুরু থেকে এসব সন্ত্রাসীর জামিন বাতিল চেয়ে আবেদন করেছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিএমপি। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি।

পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, ৫ আগস্টের পর তালিকাভুক্ত ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেককেই তিন থেকে চারবার করে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু বারবারই তারা জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

একটি সংস্থার গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আট বিভাগে ৫০ থানা এলাকায় সাড়ে চার শর বেশি তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী রয়েছে। এসব সন্ত্রাসী ও তাদের সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দেড় হাজারের বেশি কাছে অবৈধ অস্ত্র। এসব অস্ত্রের বেশির ভাগই ব্যবহার হচ্ছে ভাড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া খুন, চাঁদাবাজি, দখলসহ ভয়ঙ্কর সব অপরাধে ব্যবহার হচ্ছে এসব অস্ত্র। রিপোর্ট অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রয়েছে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মতিঝিল, শ্যামপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায়। এ পাঁচ এলাকাকে রেডজোন হিসেবে চিহ্নিত করে একের পর এক অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব এলাকায় তৎপর সন্ত্রাসীদের বিষয়ে বাড়তি গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। টার্গেট কিলিংয়ের জন্য হুমকি-এমন সন্ত্রাসীদের তালিকা করা হচ্ছে। বিভিন্ন টার্গেট কিলিংয়ে মোহাম্মদপুর, ডেমরা ও রূপগঞ্জের চনপাড়ার শুটাররা অংশ নেয়ায় এসব এলাকা ঘিরেও বিশেষ তথ্য দেয়া হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ডিএমপিতে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রয়েছে মতিঝিল বিভাগে। এর পরই ওয়ারী, তেজগাঁও এবং রমনা বিভাগ।

অন্যদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে লুট হওয়া এক হাজার ৩৩৫টি অস্ত্রের কোনো হদিস নেই এখনো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরাধীদের হাতে থাকা বেশির ভাগ অস্ত্রই ভাড়ায় খাটানো হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের প্রশ্রয়েই রয়েছে এসব অস্ত্রধারীরা। ফলে এদের কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশও হুমকিতে পড়তে পারে।

তবে পুলিশ সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনের আগে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতেই পারে। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের স্পেশাল ড্রাইভ চলমান রয়েছে। মাঠপর্যায়ে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ আরো জোরদারের নির্দেশনা হয়েছে। সম্প্রতি অস্ত্র আইনে যে মামলাগুলো হয়েছে, সেগুলোর তদন্তে আরো গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। ঢাকায় অস্ত্রের ঝনঝনানি কমাতে সম্প্রতি ৪০১ জন অবৈধ অস্ত্রধারীর তালিকা করা হয়েছে। এই তালিকা আরো দীর্ঘ হতে পারে। তালিকায় থাকা সবার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে এক বা একাধিক মামলা রয়েছে। তবে এসব অস্ত্রধারীর কেউ কেউ দেশের বাইরে ও কারাগারে থাকলেও বাকিরা নির্বাচনী মাঠে হুমকির কারণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তালিকা অনুযায়ী ঢাকায় অবৈধ অস্ত্রধারী সবচেয়ে বেশি মতিঝিল বিভাগে। এই বিভাগে ১১৮ জন অবৈধ অস্ত্রধারী রয়েছে। এ ছাড়াও রমনা বিভাগে ৩৬, লালবাগে ২৪, ওয়ারীতে ৭৩, তেজগাঁওয়ে ৬১, মিরপুরে ৬০, উত্তরায় ১৩ ও গুলশান বিভাগে ১৬ জন অবৈধ অস্ত্রধারী রয়েছে। এসব তালিকাভুক্ত অবৈধ অস্ত্রধারী ও তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারের আরেকটি সংস্থা সারা দেশের ৭৫৮ জন অবৈধ অস্ত্রধারী এবং অস্ত্র ব্যবসায়ীর তালিকা তৈরি করেছে। সেই তালিকা অনুযায়ী রাজধানীতে অবৈধ অস্ত্রধারীর সংখ্যা ৪৭২ জন। এই তালিকা নিয়ে সরকারের কয়েকটি সংস্থা অভিযান পরিচালনা করছে। তবে তালিকার বড় একটি অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং তাদের ঘনিষ্ঠজন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন দাগি আসামি জামিনে মুক্তি পাওয়ায় অস্ত্রের ঝনঝনানি বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। বাস্তবে হয়েছেও তাই। এজন্য ২০২৫ সালে অস্ত্র আইনে মামলার সংখ্যা বেড়েছে। পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর সারা দেশে অস্ত্র আইনে এক হাজার ৮১৫টি মামলা দায়ের হয়েছে। যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালে রাজধানীর ৫০ থানায়ই ২৩২টি অস্ত্র মামলা হয়েছে। যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৯৭ শতাংশ বেশি।

লুটের ১৫ শতাংশ অস্ত্রের হদিস নেই : জুলাই-আগস্টে দেশের ৪০০-এর বেশি থানা ও কারাগার থেকে পাঁচ হাজার ৮১৮টি অস্ত্র লুট হয়। যার ৮৫ শতাংশ উদ্ধার হয়েছে। তবে পুলিশের এক হাজার ৩৩৫টি অস্ত্র গোলাবারুদের ৩০ শতাংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। গণভবন এলাকা থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ৩২টি অস্ত্রও খোয়া যায়। অপারেশন ডেভিল হান্টের পর ডেভিল হান্ট ফেজ-২ চালিয়ে এবং পুরস্কার ঘোষণা করেও এসব অস্ত্র-গুলি বেহাত রয়ে গেছে। এসব অস্ত্র উদ্ধারে এরই মধ্যে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছে পুলিশ সদর দফতর। এদিকে কারা অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, গণ অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকার পতনের আগে-পরে দেশের ১৭টি কারাগার থেকে দুই হাজার ২৩২ জন বন্দী পালিয়ে যান। পরে তাদের মধ্যে এক হাজার ৫১৯ জনকে ফেরানো সম্ভব হলেও এখনো ফেরার ৭১৩ জন। এ সময় দেশের কারাগারগুলো থেকে ৬৭টি অস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে এখনো ২৭টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। পুলিশের একটি সূত্র বলছে, লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে বেশির ভাগ রাইফেল, শটগান। যা আকারে যথেষ্ট বড়। এসব অস্ত্র কারো কাছে থাকলে তা সহজেই প্রকাশ পাবে। তবে পিস্তল, রিভলবার ছোট হওয়ায় তাকে লুকানো সম্ভব। কারা অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, গত ৫ আগস্ট উদ্ভূত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশের ১৭টি কারাগারের বন্দীরা বিশৃঙ্খলা-বিদ্রোহ করেন। পালিয়ে যান নরসিংদী, শেরপুর ও সাতক্ষীরা কারাগারের সব বন্দী। নরসিংদী কারাগার থেকে ৮২৬, শেরপুর থেকে ৫০০, সাতক্ষীরা থেকে ৬০০, কুষ্টিয়া কারাগার থেকে ১০৫ ও কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ২০০ বন্দী পালিয়ে যান। সব মিলিয়ে দেশের কারাগার থেকে সে সময় দুই হাজার ২৩২ জন বন্দী পালিয়ে যান। পরে তাদের মধ্যে এক হাজার ৫১৯ জনকে ফেরানো সম্ভব হলেও এখনো ফেরারি ৭১৩ জন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন নয়া দিগন্তকে বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সার্বিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট। এরই মধ্যে অপরাধীদের তালিকা তৈরি তাদের ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে। অপারেশন ডেভিল হান্ড ফেজ-২ পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এর মধ্যে তালিকাভুক্ত ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেককে একাধিকবার গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু তারা জামিনে এসে আবার অপরাধে জাড়াচ্ছে। তবে পুলিশের প্রতিটি ইউনিট সর্বোচ্চ অবস্থানে থেকে কাজ করে যাচ্ছে।