দেড় যুগ পর প্যারেড গ্রাউন্ডে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রায় দেড় যুগ পর মহান স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হলো সম্মিলিত বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ। এতে অভিবাদন মঞ্চ থেকে সালাম গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুচকাওয়াজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। মিলিটারি পুলিশের সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রাসহ ১০টার দিকে প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত হন রাষ্ট্রপতি। তাকে অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী।

এর আগে ৯টা ৫৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্যারেড মাঠে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ দেশী-বিদেশী অতিথিরা।

জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের পর সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক মো: সাহাবুদ্দিনকে সম্মান জানিয়ে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। খোলা জিপে প্যারেড পরিদর্শন করেন তিনি। তার সঙ্গী হিসেবে জিপে থাকেন প্যারেড অধিনায়ক মেজর জেনারেল এস এম আসাদুল হক। এ সময় বাদ্য দল ‘জন্ম আমার ধন্য হলো’ গানের সুর বাজাতে থাকে। প্রায় ১৫ মিনিটের রাষ্ট্রপতির প্যারেড পরিদর্শনের পর অধিনায়ক আবারো ঘোড়ায় আরোহণ করে রাষ্ট্রপ্রধানকে ধন্যবাদ জানান।

এরপর অধিনায়ক কুচকাওয়াজ শেষ করার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে অনুমতি চেয়ে ঘোড়ায় চড়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান। অধিনায়কের নেতৃত্বে প্রত্যেকটি দল রাষ্ট্রপতিকে সালাম প্রদর্শনের জন্য এগিয়ে আসতে থাকে। ছন্দবদ্ধ পায়ে সম্মুখে এই দৃপ্ত যাত্রা, মুষ্টিবদ্ধ হাত আর তালমিলিয়ে প্রত্যয়ী শপথের এই প্রদর্শনী চলতে থাকে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে।

মার্চপাস্টের প্রথমে থাকে বিভিন্ন পতাকাবাহী তিনটি দল বা কন্টিনজেন্ট। এরপর পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রপতিকে সালাম দিতে দিতে এগিয়ে যেতে থাকে সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত ইউনিট প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট, সাজোয়া রেজিমেন্ট কন্টিনজেন্ট, ইস্ট বেঙ্গল কন্টিনজেন্ট, বাংলাদেশ ইনফ্যান্টারি রেজিমেন্ট, আর্টিলারি কন্টিনজেন্ট, এয়ার ডিফেন্স কন্টিনজেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারস কন্টিনজেন্ট, সিগনালস কন্টিনজেন্ট, সার্ভিসেস কন্টিনজেন্ট। এরপর জাতীয় পতাকাবাহী কন্টিজেন্টের সদস্যরা রাষ্ট্রপতিকে সালাম জানান, দলটি সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় গ্যালারিতে থাকা বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা সালাম প্রদর্শন করেন আর অন্যান্য দর্শকরা দাঁড়িয়ে সম্মান জানান।

এরপর পর্যায়ক্রমে আসে প্যারাকমান্ডো কন্টিনজেন্ট, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি, ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর, কারা পুলিশ, সম্মিলিত নারী কন্টিনজেন্ট ও মডারনাইজড ইনফ্যান্টারি কন্টিনজেন্টগুলো সালাম প্রদর্শন করে মার্চপাস্ট করে বেরিয়ে যায়। সেনা ও বিজিপির ডগ স্কোয়াড ও অশ্বারোহী কন্টিনজেন্টের পর খোলা গাড়িতে বহনকারী মুক্তিযোদ্ধাদের কন্টিনজেন্ট এগিয়ে যায়।

এরপরই ১০ হাজার ফুট ওপর থেকে মূল মঞ্চের দু’দিকে ২৬ জন প্যারাট্রুপার প্যারেড গ্রাউন্ডে নামেন, যারা জাতীয় পতাকাসহ বিভিন্ন বাহিনীর পতাকা বহন করেন। এরপর প্যারাকমান্ডো টিমের প্যারাট্রুপার দল রাষ্ট্রপতিকে সালাম প্রদর্শন করেন। এর মধ্যেই মাথার ওপরে উড়ে যায় আর্মি অ্যাভিয়েশনের বিমান। পর্যায়ক্রমে আর্মি অ্যাভিয়েশনের বিমান ও হেলিকপ্টার, বিজিবি এয়ার উইংয়ের হেলিকপ্টার, র‌্যাব এয়ার উইংয়ের হেলিকপ্টার, নেভাল অ্যাভিয়েশনের বিমান ও হেলিকপ্টার উড়ে যায়। এরপর প্যারেড গ্রাউন্ডে একে একে এগিয়ে আসে বিভিন্ন বাহিনীর যান্ত্রিক বহরগুলো। যেখানে ট্যাঙ্ক, কামানের মতো ভারী যুদ্ধাস্ত্র ও প্রযুক্তিসহ নানা সরঞ্জাম প্রদর্শিত হয়।

এরপরে শুরু হয় কুচকাওয়াজের এবারের অন্যতম আকর্ষণ বিমান বাহিনীর ‘অ্যারোবেটিক শো’র মহড়া। ‘বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত’ এই প্রতিপাদ্যে বিমানবাহিনীর যুদ্ধ বিমানসহ প্রশিক্ষণ বিমান ও হেলিকপ্টারগুলো বিভিন্ন ফরম্যাশনে উড্ডয়ন কৌশল প্রদর্শিত হয়। পাঁচটি এফ-সেভেন যুদ্ধবিমান বর্ণিল রং ছাড়তে ছাড়তে প্যারেড গ্রাউন্ড প্রদক্ষিণ করে। ‘লো লেভেল’ ফ্লাইং বিমান প্রদর্শনীর পর যোগ দেয় মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান।

এই আধুনিক যুদ্ধবিমানটি রাষ্ট্রপতিকে ‘ফ্লাইং স্যালুট’ প্রদর্শন করে। এরপর কয়েক দফা টার্ন পারফরম্যান্স, লো লেভেল ফ্লাইংও প্রদর্শিত হয়। শেষে মূল মঞ্চের পেছন দিক থেকে এসে ‘ভিক্টোরি রোল’ প্রদর্শন করে ওপরের দিকে মেঘের আড়ালে চলে যায় মিগ-২৯, যেটিকে ‘চূড়ান্ত প্রদর্শনী’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কুচকাওয়াজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় ১১টা ৫৯ মিনিটে। এরপর রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন প্রদর্শনীতে নেতৃত্ব দেয়া বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তাদের সামনে গিয়ে তাদের সাথে হাত মেলান।

রাষ্ট্রপতিকে বিদায় জানাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এগিয়ে এলে তার সাথেও হাত মেলান রাষ্ট্রপ্রধান। এ সময় তিন বাহিনীর প্রধান সাথে ছিলেন। ১২টা ৬ মিনিটে প্যারেড গ্রাউন্ড ত্যাগ করে রাষ্ট্রপতির গাড়িবহর। এ সময় দাঁড়িয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর তিনিও কর্মকর্তাদের সাথে কুশল বিনিময় করেন এবং হাত মেলান। মনোজ্ঞ এ আয়োজন প্রধানমন্ত্রীর পাশে বসে উপভোগ করেন তার কন্যা জাইমা রহমান।

২০০৮ সালের পর অর্থাৎ ১৮ বছর পরে এবার ২৬ মার্চের আনুষ্ঠানিকতায় যুক্ত হলো এ প্রদর্শনী। চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কুচকাওয়াজ বা প্যারেড প্রদর্শনী বন্ধ ছিল। তবে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপনে এ আয়োজন থাকত।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবার স্বাধীনতা দিবসে জাঁকজমকভাবে এ আয়োজন করতে রোজার শুরু থেকে প্যারেড স্কয়ার মাঠে প্রস্তুতি শুরু হয়। গেল মঙ্গলবার ‘চূড়ান্ত রিহার্সেলের’ মাধ্যমে তার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়।

জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা : মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে স্বাধীনতার ঘোষক ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে এই শ্রদ্ধা জানান তিনি।

মাজারে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে এককভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর তিনি মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের সাথে নিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাষ্ট্রীয় এই আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপি চেয়ারম্যান হিসেবে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে পৃথকভাবে শ্রদ্ধা জানান। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সব বীর সন্তানের রূহের মাগফেরাত কামনায় আয়োজিত বিশেষ মুনাজাতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সাথে উপস্থিত ছিলেন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং সহযোগী সংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী। দিবসটি উপলক্ষে মাজার প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।

স্টেডিয়ামে তারেক রহমান : কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে জাতীয় স্টেডিয়ামে স্বাধীনতা দিবসের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ দেখলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রীতি ফুটবল ম্যাচ দেখতে জাতীয় স্টেডিয়ামে আসেন। বিকেল ৪টায় জাতীয় স্টেডিয়ামে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের আয়োজনে এই প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। সাবেক ফুটবলারদের নিয়ে লাল দল ও সুবজ দল এই ম্যাচে লড়াই করেছে।

প্রধানমন্ত্রী এই ম্যাচের উদ্বোধন করেন এবং মাঠে গিয়ে খেলোয়াড়দের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এই সময়ে পুরো গ্যালারিতে দর্শকরা করতালি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রী হাত নেড়ে তাদের অভিবাদনের জবাব দেন। পরে ভিআইপি লাউঞ্জে বসে প্রধানমন্ত্রী ফুটবল খেলা উপভোগ করেন।

এ সময় বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আবদুল্লাহ এম ছালেহ, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২ মেহেদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী সচিব-২ আব্দুর রহমান সানি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।