সাড়ে ৪ মাসের সর্বনিম্ন লেনদেন ডিএসইর

রিজেন্ট টেক্সটাইল পরিচালকদের ১০০ কোটি টাকা জরিমানা

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রবণতার কারণে দিনের পর দিন কমছে পুঁজিবাজারের লেনদেন। বেশ কয়েকদিন থেকে চলতে থাকা এ প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে হতাশা তৈরি করেছে তারই প্রতিফলন ঘটে বাজারের লেনদেনে। গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন নেমে আসে ৬০১ কোটি টাকায়, যা গত সাড়ে ৪ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি বছরের ৭ এপ্রিলের পর আর এ পর্যায়ে নামেনি পুঁজিবাজারটির লেনদেন। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাজারের ধারাবাহিক পতনের কারণে এক দিকে বিনিয়োগকারীদের মূলধন হ্রাস পাচ্ছে, তেমনিভাবে হতাশায় তাদের একটি বড় অংশ সাইড লাইনে চলে যাচ্ছেন।

গতকাল ছিল সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবস। রোববার প্রথম কার্যদিবসে ২৩ দশমিক ৮৬ পয়েন্টের পর গতকাল ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্সের পতন ঘটেছে ৭৮ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট। ৫ হাজার ৭২২ দশমিক ২১ পয়েন্ট থেকে সোমবার সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি একইদিন লেনদেনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৫৬ পয়েন্টে। অর্থাৎ মাত্র দু’টি কার্যদিবসেই সূচকটির অবনতি ঘটেছে প্রায় ১৪৩ পয়েন্ট। সোমবার ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১৪ দশমিক ৬৩ ও ১৬ দশমিক ৩১ পয়েন্ট।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৭৮ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট হারায় গতকাল। ১৫ হাজার ৪২৯ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি বিকেলে লেনদেনশেষে স্থির হয় ১৫ হাজার ২৫১ দশমিক ৩৯ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৯১ দশমিক ৯৮ ও ৮৬ দশমিক ৯৬ পয়েন্টে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশের অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা বিরাজ করছে তারই প্রতিফলন ঘটছে পুঁজিবাজারে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কট নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের দেয়া বক্তব্য দেশের শিল্প ও সেবা খাতের জন্য খুব সুখকর নয়। এ দুই খাতের বেশ কিছু কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। আর গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কট এ দুই খাতের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করবেই। আর এ কারণে এ সঙ্কটের সুরাহা না হওয়া অবধি বাজার তার স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে পারবে না।

গতকাল লেনদেনের শুরুতেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজারগুলো। বিভিন্ন পর্যায়ে এ চাপ সামলে ঊর্ধ্বমুখী হতে চাইলে বিক্রয়চাপের তীব্রতা তা হতে দেয়নি। লেনদেনের শেষদিকে এসে এ চাপ আরো তীব্র হলে দুই পুঁজিবাজারেই সবগুলো সূচকের বড় পতন ঘটে। এ সময় দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেন হওয়া কোম্পানির প্রায় ৯২ শতাংশ দরপতনের শিকার ছিল। ডিএসইর বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায় এদিন বাজারটির বেশিরভাগ খাতেই শতভাগ কোম্পানি দর হারিয়েছে। বড় দরপতনের শিকার খাতগুলোর অন্যতম ছিল সিরামিকস, সিমেন্ট, কাগজ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, টেক্সটাইলস ও বীমা খাত। ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৮৭টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১৪টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ৩৫৫টি। দর অপরিবর্তিত ছিল ১৮টির। অনুরূপভাবে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ১৯১টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ২১টির দর বাড়ে, ১৬০টির কমে এবং ১০টি সিকিউরিটিজের দর অপরিবর্তিত থাকে।

এদিকে শেয়ারবাজার থেকে আইপিওর মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগে টেক্সটাইল খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলসের পাঁচ পরিচালককে মোট ১০০ কোটি টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগের আদেশ অনুযায়ী, পাঁচ পরিচালককে প্রত্যেককে ব্যক্তিগতভাবে ২০ কোটি টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। তারা হলেন- ইয়াকুব আলী, ইয়াসিন আলী, তানভীর হাবিব, মাশরুফ হাবিব ও সালমান হাবিব। বিএসইসির আগের নির্দেশনা অনুযায়ী রিজেন্ট টেক্সটাইলের অপব্যবহৃত ৯০ কোটি টাকা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে জমা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সময়সীমা শেষ হলেও অর্থ ফেরত দেয়া হয়নি। এ কারণে তদন্তশেষে পরিচালকদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করেছে কমিশন।

কমিশন বলছে, আদেশ জারির ২০ কার্যদিবসের মধ্যে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না করলে প্রত্যেক পরিচালকের ওপর প্রতিদিন অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা আরোপ হবে। জরিমানা বকেয়া থাকা পর্যন্ত এই অতিরিক্ত অর্থ আদায় অব্যাহত থাকবে। বিএসইসির তদন্তে আইপিওর অর্থ ব্যবহারে আরো গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। তদন্ত অনুযায়ী, সুদসহ ৮০ কোটি ১১ লাখ টাকা রিজেন্ট টেক্সটাইলের অব্যবহৃত আইপিও অর্থ থেকে সরিয়ে লিগ্যাসি ফ্যাশন লিমিটেডের ৯৯ শতাংশ মালিকানা নেয়া হয়েছে।

লিগ্যাসি ফ্যাশন একই পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত একটি প্রতিষ্ঠান। কমিশনের বিবেচনায়, আইপিওর অর্থ এভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা বিধিবহির্ভূত। শুধু অর্থ স্থানান্তর নয়, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে লেনদেনের তথ্য আর্থিক প্রতিবেদনে উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও অনিয়ম পেয়েছে বিএসইসি। তদন্তে বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড (বিএএস) ১ এবং আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস ২৪ অনুসরণ না করার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ছাড়া কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে প্রকৃত ও ন্যায্য আর্থিক চিত্র তুলে ধরতে ব্যর্থতার বিষয়টিও চিহ্নিত করেছে কমিশন।

রিজেন্ট টেক্সটাইল ২০১৫ সালে আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ১২৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। ওই অর্থ দিয়ে কোম্পানির বিএমআরই প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নতুন একটি তৈরী পোশাক ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় কোম্পানিটি একাধিকবার সময় বাড়ায়। এর ফলে আইপিওর অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ছিল। পরে ওই অর্থের একটি অংশ অন্য প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের ঘটনায় আইপিও অনুমোদনের সময় দেয়া শর্ত লঙ্ঘন হয়েছে বলে মনে করছে বিএসইসি।