ইরানে ফের হামলার চাপ দিচ্ছে মার্কিন সেন্টকম

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে ইরানের তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে ফের হামলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজনৈতিক সূত্রের বরাতে ইসরাইলের চ্যানেল ১৩ জানায়, ইসরাইল সফরের সময় কুপার এই প্রস্তাব দেন। সম্প্রচারমাধ্যমটি জানায়, কুপার ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর চিফ অব স্টাফ ইয়াল জমির এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের সাথে একটি শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন।

চ্যানেলটির তথ্য মতে, ওই বৈঠকে কুপার ইরানের বিরুদ্ধে ফের লড়াই শুরু এবং দেশটির গ্যাস, তেল ও বিদ্যুৎ শিল্পের সাথে যুক্ত জাতীয় অবকাঠামোতে হামলার আহ্বান জানান। কুপারকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘ইরানের অবকাঠামোতে হামলা খেলার নিয়ম বদলে দেবে, এটি তাদের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে না।’

সেন্টকম প্রধান ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তাদের জানান যে, লড়াই পুনরায় শুরু করাই একমাত্র বিকল্প হতে পারে এবং ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা চালানোর প্রয়োজন হতে পারে। একই সূত্রের বরাতে জানা যায়, কুপার তার এই অবস্থান মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের কাছেও তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি প্রস্তাবটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছেও পৌঁছানো হয়েছে।

এমন সময়ে এই প্রস্তাবের কথা সামনে এলো যখন মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোতে ইরানের সাথে নতুন করে সঙ্ঘাতের আশঙ্কা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছিল। এ ছাড়া সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই অঞ্চলে লড়াই বন্ধে ওয়াশিংটন তাদের প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি ঘটনায় সেন্টকম বৃহস্পতিবার জানায়, তারা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সাথে সমন্বয় করে নিজেদের প্রথম বহুজাতিক অ্যাটাক-ড্রোন টাস্কফোর্স গঠন করেছে।

ইসরাইলি সম্প্রচারমাধ্যমের এই দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এর আগে এপ্রিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় এবং পরে ১৭ জুন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে চূড়ান্ত সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করে। কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিয়তা এবং বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত জ্বালানি ও বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধ নৌ চলাচলের বিষয়ে মতবিরোধের কারণে পরে সেই আলোচনা থমকে যায়।

এরপর ৮ থেকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পুনরায় সামরিক হামলা চালায়। এ সময় ওয়াশিংটন ইরানের ভেতরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করে। এর জবাবে জর্দান, বাহরাইন ও কুয়েতসহ কয়েকটি আরব দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জামে হামলা চালায় তেহরান।

‘অনির্দিষ্টকাল’ নৌ অবরোধের হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের

তবে ইরানের ওপর ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য’ নৌ অবরোধ বজায় রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেই সাথে তেহরানের ওপর আরো অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির হুমকি দিয়েছে ওয়াশিংটন। পানামা সফররত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই নৌ অবরোধ দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা মার্কিন নৌবাহিনীর রয়েছে। রয়টার্স লিখেছে, এই অবরোধের ফলে ইরানের অর্থনীতি ইতোমধ্যে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এ দিকে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইরানকে আরো কঠোর আর্থিক ধাক্কা দেয়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। নিউজম্যাক্স-এর ‘রব শ্মিট টুনাইট’ অনুষ্ঠানে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আগামী সপ্তাহে নতুন ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করুন। কারণ একটি দেশকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ইতিহাসে এ যাবৎকালের নজিরবিহীন সব পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি আমরা।” রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধের জন্য জুনে হওয়া প্রাথমিক সমঝোতা কার্যত ভেস্তে যাওয়ায় পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে ইরান।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে তেহরান। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়েই পরিবহন করা হতো। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ডব্লিউএএম জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হরমুজ অতিক্রম করার সময় আমিরাতের ‘আবু ধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি’র দু’টি জাহাজে হামলা হয়। একে ‘ইরানি হামলা’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে আমিরাত সরকার।

এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এ যুদ্ধ বন্ধের জন্য নিজের দেশেও চাপে পড়েছেন। জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দাম তার জনপ্রিয়তা কমাচ্ছে। তাতে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে ট্রাম্পের দলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, হরমুজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে, তবে ইরান তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তাদের বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি মুক্ত না করা পর্যন্ত এই জলপথ খুলে দেয়া হবে না।

ওয়াশিংটন এর আগে জানিয়েছিল, প্রণালির দুই তীরে অবস্থিত ইরান ও ওমান যদি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে কোনো চুক্তিতে পৌঁছায়, তবেই ইরানি অবরোধ তুলে নেয়া হবে। ট্রাম্প বারবার সামরিক হামলা বাড়ানোর এবং ইরানে ‘কঠিন আঘাত’ হানার হুমকি দিয়েছেন। যদিও এখন পর্যন্ত তিনি স্থলবাহিনী মোতায়েন, কৌশলগত দ্বীপ দখল বা পানি শোধনাগারে (ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট) বোমা হামলার মত পথে হাঁটেননি। বরং চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, সামরিক পদক্ষেপের বদলে তিনি অর্থনৈতিক পন্থার ওপরই বেশি নির্ভর করবেন।

যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ইরান এবং তাদের অস্ত্র সংগ্রহে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে এই চাপের কৌশল তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পারেনি। রয়টার্স জানিয়েছে, এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা ভুল ছিল কি না- এমন প্রশ্নের জবাব দেননি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ। তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে যা করা প্রয়োজন আমরা ঠিক তা-ই করছি।

এ দিকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) বুধবার পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছর বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ প্রতিদিন ৪৩ লাখ ব্যারেল বা প্রায় ৪ শতাংশ কমে যেতে পারে। এক মাস আগেও তাদের অনুমানে এই ঘাটতি দৈনিক ৩৭ লাখ ব্যারেল ছিল। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ না হলে বিশ্বজুড়ে প্রবৃদ্ধিতে বড় ধস নামবে এবং কিছু অঞ্চলে মন্দা দেখা দিতে পারে।

২২৫ কোটি ডলার সমমূল্যের ৪৫টি রিপার ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অন্তত ৪৫টি এমকিউ-৯ ‘রিপার’ ড্রোন হারিয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। এই সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট রিপার ড্রোনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। রিপার ড্রোন মূলত নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কাজে ব্যবহৃত হয়। মার্কিন বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সেন্সর ও অস্ত্রের ধরনভেদে প্রতিটি রিপার ড্রোনের দাম প্রায় তিন কোটি থেকে পাঁচ কোটি ডলার। সে হিসাবে ৪৫টি ড্রোন হারানোর অর্থ শুধু এই ড্রোনগুলোতেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ক্ষতি ১৩০ কোটি থেকে ২২৫ কোটি ডলার। ইরান যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালীর আশপাশে এসব ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি বর্তমানে সংঘাতের অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে।

তবে রিপার ড্রোন তুলনামূলক ধীরগতির এবং অনেক সময় নিচু উচ্চতায় উড়ে। ফলে ইরানের সামরিক বাহিনী এবং ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য এগুলো তুলনামূলক সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হারানো সব রিপার ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করা হয়নি। কয়েকটি ড্রোনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকক্ষের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সেগুলো বিধ্বস্ত হয়েছে।

যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে বাড়ছে চাপ

ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটানো এবং অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত অর্থ চেয়েছে। প্রশাসন প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বাজেট অনুমোদনের চেষ্টা করছে। প্রশাসনের দাবি, পেন্টাগনের অস্ত্রভাণ্ডার দ্রুত পূরণ করতে এই অর্থ জরুরি। তবে অর্থ অনুমোদন হলেও ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত এবং ইউক্রেনকে পাঠানো অস্ত্রের কারণে কমে যাওয়া মজুদ পুরোপুরি পূরণ করতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, দ্রুত অতিরিক্ত অর্থ না পেলে ইরান যুদ্ধের কারণে প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর তৈরি বাড়তি চাপ সামলাতে সামরিক প্রশিক্ষণ কমাতে হতে পারে। তার হিসাবে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ যুদ্ধের ব্যয় ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পুনর্র্নিমাণের খরচ এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।