- কমেনি হয়রানি, পাল্টেছে দুর্নীতির ধরন
- দেশে সর্বোচ্চ ঘুষ লেনদেন হচ্ছে ভূমিসেবায়
সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও ডিজিটালাইজড করার দাবি করলেও মাঠপর্যায়ে সেবার চিত্র এখনো পাল্টায়নি। ই-নামজারি (ই-মিউটেশন) ও অনলাইন ভূমি উন্নয়ন করব্যবস্থা চালুর ফলে দালালের দৌরাত্ম্য কমার কথা থাকলেও, অনুসন্ধানে দেখা গেছে দুর্নীতির ধরন বদলেছে মাত্র। আগে দালালরা ভূমি অফিসের বারান্দায় ঘুরঘুর করত, এখন তারা ‘ডিজিটাল এজেন্ট’ হিসেবে কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের জরিপ অনুযায়ী, ভূমিসেবা গ্রহণকারী পরিবারগুলোর মধ্যে ৬৬ দশমিক দুই শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়েছে, যা ২০২৩ সালে ছিল ৫১ শতাংশ। পরিসংখ্যানে আরো দেখা গেছে, সেবা গ্রহণকারীদের প্রায় ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ সরাসরি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। এই খাতে বছরে অবৈধ লেনদেন বা ঘুষের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন হাজার ৮১ কোটি টাকা, যা দেশের সব সরকারি সেবা খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ এখন ১১ হাজার ৩১০ টাকায় পৌঁছেছে।
ই-নামজারির জন্য সরকার নির্ধারিত ফি এক হাজার ১৭০ টাকা হলেও বাস্তবে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনলাইন আবেদন জমা দেয়ার পর ‘স্পিড মানি’ বা ঘুষ না দিলে অযৌক্তিক কারণে আবেদন বাতিল করে দেয়া হয়। কর্মকর্তাদের একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে সার্ভার সমস্যার অজুহাত দিয়ে কাজ বিলম্বিত করে, ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে দালাল বা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের আশ্রয় নেয়। অনেক ক্ষেত্রে এই ই-সেবা কেন্দ্রগুলোই কর্মকর্তাদের দালালি সিন্ডিকেটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। বাধ্যতামূলক দালাল নির্ভরতা ইউডিসি বা অনলাইন পোর্টালের চেয়ে মানুষ এখনো দালালের ওপর বেশি নির্ভরশীল কারণ ৯৫ শতাংশ আবেদন এখনো প্রথাগত কাগজ-নির্ভর পদ্ধতি ও দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রসেস হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাধারণ মানুষ সরাসরি সেবা নিতে গেলে তাদের নথিতে নানা ত্রুটি দেখিয়ে ভূমি অফিসের পাশে থাকা দোকানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে একেকটি সমস্যা সমাধানের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। এমনকি ভূমি অফিসের সরকারি ল্যাপটপ ওই বেসরকারি দোকানে ব্যবহার করতে দেখা গেছে, যা তথ্যের নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। বর্তমানে বাংলাদেশের আদালতগুলোতে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে ৪৭ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। আনোয়ার হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী তার নাম সংশোধনের জন্য গেলে কর্মকর্তারা জানান, অরিজিনাল রেকর্ড থেকে সংশোধন আনতে হবে এবং এজন্য ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। দালালদের মাধ্যমে গেলে ফাইল দ্রুত চললেও নিজে গেলে কর্মকর্তাদের অবহেলার শিকার হতে হয়। তিনি পরিবারের জমির ই-নামজারি আবেদন করেছিলেন। সব নথি ঠিক থাকা সত্ত্বেও উপজেলা ভূমি অফিস থেকে অপ্রাসঙ্গিক নথির অজুহাতে কয়েকবার আবেদনগুলো বাতিল করা হয়। কর্মকর্তারা পরোক্ষভাবে তাকে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আসার ইঙ্গিত দেন। শেষ পর্যন্ত কোনো অতিরিক্ত নথি ছাড়াই ঘুষের বিনিময়ে আবেদনগুলো মঞ্জুর হয়।
সম্প্রতি ফরিদপুরের নগরকান্দা ও বোয়ালমারীর দুই উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা ইমরান শেখ ও সরোয়ার হোসেনকে ক্যামেরার সামনে ঘুষের টাকা গুনতে দেখা গেছে। এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
এদিকে গত সোমবার মাঠপর্যায়ে ডিজিটাল ভূমি সেবার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোকে সুরক্ষিত করতে ভূমি মন্ত্রণালয় ১০ দফা বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে। এর প্রধান লক্ষ্য হলো উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোর কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক ও আইসিটি ডিভাইসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে, অননুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ ও সরকারি আইসিটি যন্ত্রপাতির ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে, যাতে বহিরাগত কোনো চক্র বা দালাল ডিজিটাল সিস্টেমের নিরাপত্তা বিঘিœত করতে না পারে। এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং ডিজিটাল জালিয়াতি রোধ করা সহজ হবে বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।
সম্প্রতি ভূমিমন্ত্রী মো: মিজানুর রহমান মিনু বলেছেন, উপজেলা ভূমি অফিসের নিয়ন্ত্রণহীন দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দালালদের হস্তক্ষেপ বন্ধের লক্ষ্যে ই-নামজারি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এখন সেবাগ্রহীতাদের অনলাইন আবেদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আবেদনের প্রতিটি ধাপে এসএমএসের মাধ্যমে আবেদনকারীকে জানানো হয়, যাতে মাঝপথে কেউ অবৈধ সুবিধা নিতে না পারে। ভূমি অফিসে যদি কেউ ঘুষ দাবি করে বা দালালচক্রের হয়রানির শিকার হন, তবে সরাসরি ১৬১২২ নম্বরে ফোন করে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভূমি অফিসের ডিজিটাল সেবা সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদ হওয়ার কথা থাকলেও কর্মকর্তাদের একাংশ ও শক্তিশালী দালাল চক্রের কারণে তা ভোগান্তির নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজিটালাইজেশন কেবল তখনই সফল হবে যখন কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং সাধারণ মানুষের ডিজিটাল লিটারেসি বাড়বে। অন্যথায়, ‘স্মার্ট’ সেবার আড়ালে দুর্নীতির এই আধুনিক সংস্করণ সাধারণ মানুষের ভূমি অধিকারকে আরো বেশি ঝুঁকিতে ফেলবে।
পুরনো সিন্ডিকেট ব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবেই বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে এবং এটি এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে অভিযোগ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, কেবল সফটওয়্যার দিয়ে দুর্নীতি বন্ধ সম্ভব নয়। ঘুষ ও দালালি প্রথা বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। পরিবর্তন আনতে হবে সরকারি সেবার আদর্শিক কাঠামোতে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে সেবা প্রদানের মূল কাঠামো সরকারকেই সংস্কার করতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে সরকারকে যেমন এগিয়ে আসতে হবে, তেমনি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে এবং সব ধরনের ‘অপ-আচরণ’ থেকে দূরে থাকতে হবে।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিক সেবা খাত প্রযুক্তিনির্ভর বা ডিজিটাল হলেও এর আড়ালে পুরনো সিন্ডিকেট, ঘুষ প্রথা এবং দালাল চক্র এখনো শক্তিশালীভাবে টিকে আছে। এর প্রধান কারণ হলো, এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাগুলো পরিকল্পিতভাবেই রেখে দেয়া হয়েছে; এগুলো দূর করার জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়নি। বিগত সরকারের আমলে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তেমন কিছুই বদলায়নি। বরং দুর্নীতি এখন আমাদের প্রশাসনিক ও কাঠামোগত ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে এবং এটি বর্তমানে একটি ‘নীতি’ বা স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে।



