মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
ইংরেজি ‘উবসড়পৎধপু’ শব্দের বাংলা অর্থ গণতন্ত্র। গণতন্ত্র শব্দটি গ্রিক শব্দ উবসড়ং থেকে উৎপন্ন হয়েছে। উবসড়ং শব্দের অর্থ হচ্ছে জনগণের শাসন। গণতন্ত্র বলতে জনগণের শাসন বা জনগণের ক্ষমতাকে বুঝায়। সুতরাং, জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী দেশের শাসনকার্য পরিচালনার নামই গণতন্ত্র। অন্যদিকে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা হচ্ছে আল্লাহর প্রণীত শাসনব্যবস্থা। ইসলামী বিধিবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালনার ব্যবস্থাকে ইসলামী শাসনব্যবস্থা বলে। অর্থাৎ- ইসলামী শরিয়াহ তথা কুরআন-হাদিস অনুযায়ী ব্যক্তি জীবন, সমাজ জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করার নামই হচ্ছে ইসলামী শাসনব্যবস্থা।
১. ইসলামী শাসনব্যবস্থা কুরআন ও সুন্নার ভিত্তিতে ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত। আর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আইনসভার সদস্যদের নিজস্ব মতামত ও শাসকদের ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালিত।
২. ইসলামিক শাসনব্যবস্থায় সব ক্ষমতার মালিক আল্লাহ এবং আল্লাহর প্রেরিত কুরআন ও রাসূলের হাদিস মোতাবেক শাসনের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সব ক্ষমতার উৎস জনগণ। জনগণের মতামতের ভিত্তিতে শাসনব্যবস্থা কায়েমের কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে সর্বক্ষেত্রে জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হয় না।
৩. গণতন্ত্র একটি মানব রচিত ধর্মহীন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। অন্যদিকে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা হচ্ছে একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা। এখানে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার ভোগ করে।
৪. ইসলামী শাসনব্যবস্থায় কুরআন ও সুন্নার ভিত্তিতে আইন তৈরি হয় এবং কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করা হয়। অন্যদিকে, গণতন্ত্রে বিভিন্ন আদর্শ অনুসারী আইনসভার সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে আইন তৈরি হয় এবং বাস্তবায়ন করা হয়।
৫. গণতন্ত্র যেহেতু জনগণের শাসন সেখানে বিভিন্ন মতের লোক বসবাস করে তাই তাদের প্রত্যকের মতামত আলাদা আলাদা। অনেক সময় শাসক জনগণের মতের বাইরে নিজস্ব আইন তৈরি করে। অন্যদিকে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা হচ্ছে শুধু আল্লাহর আইন। এখানে কারো নিজস্ব মনগড়া আইন তৈরির সুযোগ নেই।
৬. গণতন্ত্রে আইনবিভাগ ও বিচারবিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু বাস্তবে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়না। ঘুষ ও ক্ষমতা দিয়ে ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করা হয়। কোনো অনিয়মের জন্য জনগণ সরাসরি রাষ্ট্র্রপ্রধানের কাছে কাছে গিয়ে নালিশ করতে পারে না।
অন্যদিকে, ইসলামী শাসনব্যবস্থায় বিচারক কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমা-কিয়াসের ভিত্তিতে বিচারকার্য পরিচালনা করে বিধায় এখানে সবার জন্য আইন সমান। বিচারক স্বাধীনভাবে কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক বিচারকাজ পরিচালনা করে। এখানে পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় ধনীর জন্য যে আইন, একজন মিসকিনের জন্য সেই একই আইন।
৭. ইসলামী শাসনব্যবস্থায় কুরআন ও সুন্নার আদর্শে জীবন গড়ার কথা বলা হয়েছে। আর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নেতাদের আদর্শ অনুসরন করে জীবন পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
৮. ইসলামী শাসনব্যবস্থায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অধিকার সমান। কিন্তু গণতন্ত্রে সবার সমান অধিকারের কথা বললেও বাস্তবে শাসকের ক্ষমতা বেশি। শাসকের ইচ্ছার বাইরে অনেক সময় কথা বলা যায় না।
৯. গণতন্ত্রের জনক এরিস্টটল, গ্রিসের সলোন ও খ্রিষ্টান জন লক। আর ইসলামের জনক স্বয়ং আল্লাহ। মহান আল্লাহ তার প্রেরিত রাসূলের মাধ্যমে ইসলামকে পরিপূর্ণতা দান করেছেন।
১০. গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় শাসকরা নিজেদের ইচ্ছামত আইন তৈরি করে এবং ইচ্ছামতো সে আইন প্রয়োগ করে। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় শাসকরা কুরআন-সুন্নাহর বাইরে শাসকের ইচ্ছামতো মনগড়া আইন তৈরি করতে পারে না।
১১. গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় শাসন বিভাগের সদস্য সংখ্যা বেশি, শাসন বিভাগের সদস্যরা নানা রকম দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। একসময় তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর ইসলামী শাসনব্যবস্থায় খলিফা প্রধান একজন তিনি প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে শাসনকর্তা নিয়োগ করে। তাদের মধ্য কুরআন-সুন্নাহর বাইরে কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে দলীয় প্রধান সাথে সাথে তাকে অপসারণ করে।
১২. গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় শাসকরা একবার ক্ষমতায় বসলে আর নামতে চায় না। তারা তখন স্বৈরাচারী কার্যকলাপ চালু করে। আর ইসলামী শাসনব্যবস্থায় শাসক যদি স্বৈরাচার হয় তাহলে বেশি দিন ক্ষমতায় ঠিকে থাকতে পারে না।
১৩. ইসলামী শাসনব্যবস্থা যেখানে বিদ্যমান সেখানে চুরি-ডাকাতি, খুন-ধর্ষণ, টাকা পাচার, ঘুষ-অনিয়ম অত্যন্ত কম। যেহেতু সেখানে কুরআনের শরিয়াহ আইন চালু হওয়ায় মানুষ শাস্তির ভয়ে সহজেই কোনো অপকর্মে লিপ্ত হয় না। আর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এগুলো স ব বিদ্যমান, শাসকরা নিজেরাই অনেক সময় আইনের তোয়াক্কা করে না। তারা ঘুষ-দুর্নীতি, টাকা পাচার ও নানারকম অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে।
১৪. গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিভিন্ন উৎস থেকে এবং মানুষের মনগড়া মতামত থেকে আইন তৈরি হয়। যেমন- ভারত, আমেরিকা, ব্রিটেনকে নকল করে আমাদের সংবিধান তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইসলামী শাসনব্যবস্থায় কুরআন হাদিস ও ইজমা-কিয়াস অনুসরণ করে আইন তৈরি হয়। কুরআন-হাদিসের বাইরে কোনো আইন ঠিকতে পারে না।
১৫. গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় যখন তখন আইনের পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংশোধন সম্ভব।
কিন্তু ইসলামী শাসনব্যবস্থায় কুরআন-হাদিসের বাইরে যখন তখন আইন পরিবর্তন-পরিমার্জন করা যায় না।
১৬. ইসলামী শাসনব্যবস্থা মূলত আল্লাহর আইন ও শাসনব্যবস্থা। আর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা হচ্ছে মানুষের (এরিস্টটল, সলোন ও জন লক) তৈরি শাসনব্যবস্থা।
১৭. ইসলামী শাসনব্যবস্থায় ঈমানদার, এলমধার, তাকওয়াবান, লোভহীন নৈতিক গুণসম্পন্ন ব্যক্তিকে শাসক বানানোর কথা বলা হয়েছে। আর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণ যাকে ইচ্ছা তাকে শাসক হিসেবে নিয়োগ করে। অধিকাংশ সময় শাসক নিজেই নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে।
১৮. গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা একজন রাষ্ট্রদার্শনিকের ব্যক্তিগত মতামত। অন্যদিকে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা সৃষ্টিকর্তার মতামত।
১৯. গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় অনেকগুলো পদ বিদ্যমান। ফলে তারা যার যার অবস্থান থেকে নানারকম দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। একসময় তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, ইসলামী শাসনব্যবস্থায় শাসকপ্রধানসহ প্রত্যেক প্রদেশে একজন প্রশাসক নিয়োগ তাকে। তারা খলিফার আদেশ নিষেধ মেনে চলে। শাসকপ্রধান এবং মজলিসে শূরা যেকোনো সময় যে কাউকে অপসারণের ক্ষমতা রাখে।
২০. ইসলামী শাসনব্যবস্থায় ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা সবার জন্য আইন ও বিচার সমান। কিন্তু, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ধনী-গরিব সবার জন্য আইন ও বিচার সমানের কথা বলা হলেও বাস্তবে গরিবরা ন্যায়বিচার পায় না। গরিব লোকজন টাকার অভাবে মামলা পরিচালনা করতে পারে না। অধিকাংশ সময় শাসকরা নিজেরাই আইনের তেয়াক্কা করে না। শাসকরা নিজেদের সার্থসিদ্ধির জন্য যখন তখন আইন পরিবর্তন করে থাকে।
২১. গণতন্ত্র একটি অপরিপূর্ণ ও অসম্পূূর্ণ জীবন বিধান। অন্যদিকে, ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় পবিত্র কুরআন হচ্ছে পরিপূর্ণ জীবন-বিধান।
২২. গণতন্ত্রে সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ বলা হলে ও প্রকৃতপক্ষে সকল ক্ষমতার মালিক আমলা, এমপি, মন্ত্রী ও শাসকপ্রধান। অন্যদিকে, ইসলামিক শাসনব্যবস্থায় সব ক্ষমতার মালিক আল্লাহ। আমরা তার প্রেরিত গোলাম হিসেবে স্বীকার করি। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতাকে আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২৩. গণতন্ত্রে জনগণের মতের বাইরে গিয়ে শাসকদের ইচ্ছানুযায়ী আইন তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে পারে। যেমন- ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন। এই আইনে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ বিনা দোষে নির্যাতিত হওয়ার নজির রয়েছে। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় কুরআন-হাদিসের বাইরে এবং জনগণের মতের বাইরে শাসকদের ইচ্ছা অনুযায়ী কোনো আইন তৈরি করার সুযোগ নেই।
২৪. গণতন্ত্র যিনি আবিষ্কার করেছেন তিনি গণতন্ত্রকে অভিশাপ ও মূর্খের শাসন বলেছেন। যেহেতু গণতন্ত্র সুষ্ঠু পথে পরিচালিত না হলে তখন জনগণের জন্য অভিশাপে পরিণত হয়। অন্যদিকে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা হচ্ছে শান্তির বাণী। আইয়ামে জাহেলিয়াতের সময়ে নানা রকম বিশৃঙ্খলা ও জঘণ্য খারাপ কাজ থেকে মুক্তি দিয়ে সারা পৃথিবীতে শান্তির বাণী নিয়ে আসে ইসলামী শাসনব্যবস্থা।
গণতান্ত্রিক আইন একটি মনুষ্য প্রবর্তিত আইন। গণতান্ত্রিক আইনের প্রবর্তন, পরিবর্তন ও প্রয়োগ সম্পূর্ণরূপে মানুষের নিজস্ব ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। যদিও গণতান্ত্রিক আইন কিছু সাংবিধানিক মূলনীতি অনুসরণ করে, তবে সেই মূলনীতিগুলোকেও যেকোনো সময় পরিবর্তন করা সম্ভব। গণতান্ত্রিক আইনের পেছনে রয়েছে একটি ফিলোসফি যেখানে বিশ্বাস করা হয় আমাদের পরিচিত এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বাইরে কোনো জগৎ নেই। অতএব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব পৃথিবীতেই অবস্থিত, সৃষ্টিকর্তার হাতে নয়।
ফলে মানুষই রাষ্ট্রের মালিক এবং মানুষই রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নকারী। অন্যদিকে ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মালিক এবং তাঁর আইনই সর্বোচ্চ আইন। ফলে গঠনগত, দর্শনগত, মূলনীতিগত ইত্যাদি আরো অনেক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়, ইসলামী শরিয়াহ আইন ও গণতান্ত্রিক আইন এক ও অভিন্ন নয়; বরং পুরোপুরি বিপরীত। উপরন্তু, আল্লাহ যা কিছু হালাল করেছেন গণতান্ত্রিক আইন তা হারাম করে দিতে পারে এবং যা তিনি হারাম করেছেন তা গণতান্ত্রিক আইন হালাল করে দিতে পারে। আর আল্লাহর বিধানকে পরিবর্তন করা হচ্ছে শিরক। ফলে এই দু’টি আইন একে অপরের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট



