গ্রামীণ কল্যাণ সম্প্রতি সারা দেশে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে জরায়ুমুখ ও ক্লিনিক্যাল স্তন ক্যান্সারের স্ক্রিনিং প্রদানের একটি স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগ চালু করেছে। এ প্রকল্পের আওতায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ২০ হাজার স্ক্রিনিং করা হবে।
গত ১৯ এপ্রিল শুরু হওয়া এই পাইলট প্রকল্পটি মূলত ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সী এবং ১০ বছরের বেশি সময় ধরে বিবাহিত নারীদের জন্য চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় জীবন রক্ষাকারী প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।
গ্রামীণ কল্যাণের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘একজন মা হলেন তার পরিবারের প্রাণ, অথচ কেবল সচেতনতা ও সামর্থ্যরে অভাবে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের মতো নীরব ঘাতকের কারণে দেশে প্রতি বছর হাজারো পরিবার চরম মানসিক ও আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এই উদ্যোগটি নিশ্চিত করবে যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের দোরগোড়াতেই বিশ্বমানের অনকোলজিক্যাল (ক্যান্সার) সেবা পাবে।’ স্ক্রিনিং কার্যক্রমটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে কৌশলগত সহযোগিতার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে অনকোলজি ক্লাব (বাংলাদেশ), দ্য ইলিক্টা ফাউন্ডেশন (সুইডেন) এবং গ্লোবাল হেলথ ক্যাটালিস্ট (যুক্তরাষ্ট্র)।
সরাসরি এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ার সাথে যুক্তরা হচ্ছেন গাইনিকোলজিক্যাল অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা: শাহানা পারভীন, সহকারী অধ্যাপক ডা: রুমানা আফরোজ, সহকারী অধ্যাপক ডা: ফারহানা হক, গাইনিকোলজিক্যাল অনকোলজি বিভাগের কনসালটেন্ট ডা: সুমিতা সরকার এবং গাইনিকোলজিক্যাল অনকোলজি বিশেষজ্ঞ ডা: সাদিয়া জাবিন খান।
গ্রামীণ কল্যাণ এই উদ্যোগের মাধ্যমে অত্যাধুনিক হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) টেস্টিং চালু করেছে। এতে করে প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্তকরণে বেসরকারি খাতে অন্যতম সফল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে। বর্তমানে সাভার অঞ্চলের নির্দিষ্ট কেন্দ্রগুলোতে, যার মধ্যে রয়েছে সুয়াপুর হেলথ সেন্টার এবং মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে অবস্থিত গ্রামীণ কল্যাণ রাজনগর হেলথ সেন্টার- এই স্ক্রিনিং সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।
এই কার্যক্রমকে সফল করতে গ্রামীণ কল্যাণ সাভারে একটি অত্যাধুনিক মলিকুলার ল্যাব স্থাপন করেছে, যেখানে ইনফ্লুয়েঞ্জা এ এবং বি, কোভিড-১৯, ক্ল্যামাইডিয়া ও গনোরিয়া, যক্ষ্মা (টিবি) এবং থ্যালাসেমিয়াসহ অন্যান্য উন্নত পিসিআর (চঈজ) পরীক্ষা অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে প্রদান করা হচ্ছে।
গ্রামীণ কল্যাণের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম মঈনুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা জীবনরক্ষাকারী, বিশ্বমানের ক্যান্সার সেবা সরাসরি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। আমরা বাংলাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় স্তরের স্বাস্থ্যসেবায় রূপান্তর আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ- যাতে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা এবং সুস্থতা সেবা সমাজের তৃণমূল ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়।’
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের আদর্শ অনুসরণ করে ১৯৯৬ সালে সামাজিক ব্যবসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণ, বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলের ৩৮টি জেলায় ১৫৩টি কমিউনিটি-বেজড স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনা করছে। সংস্থাটি প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে সমন্বিত চিকিৎসাসেবা প্রদান করে। এর পাশাপাশি ৫৮ লাখ বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা (ডোমিসিলিয়ারি হেলথ চেক), এক লাখ ৩০ হাজার আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান, পাঁচ লাখ প্যাথলজি টেস্ট এবং ৩০ হাজার ডাক্তারের পরামর্শ প্রদান করে।
‘ভিশন ২০৩০’-এর অধীনে, গ্রামীণ কল্যাণ দেশের ৬৪টি জেলায় ৩০০টি উন্নত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং মডেল সেকেন্ডারি কেয়ার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছে, যার লক্ষ্য হলো বার্ষিক এক কোটি ৫৬ লাখ বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে বছরে ১৫ লাখ মানুষকে সরাসরি চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা।



