চীন-ইরানের নতুন কৌশল

হরমুজেই ডুবতে পারে মার্কিন ডলারের আধিপত্য

ইরানি দূতাবাস এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানায়, বিশ্ব তেলের বাজারে ‘পেট্রো-ইউয়ান’ যুক্ত করার এখনই সময়

Printed Edition

আলজাজিরার বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সাথে ইরানের যুদ্ধ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অস্থির করে রেখেছে বিশ্ব অর্থনীতিকে। এর মধ্যেই মার্কিন ডলারের একক আধিপত্য শেষ করতে নতুন কৌশল হাতে নিয়েছে তেহরান ও বেইজিং। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণকে হাতিয়ার করে চীন ও ইরান এখন বিকল্প মুদ্রা হিসেবে ইউয়ানকে সামনে আনতে চাইছে।

তারা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের প্রাধান্যকে ব্যবহার করে ওয়াশিংটন প্রতিপক্ষ দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। বৈশ্বিক তেলবাজারে প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন ডলারে হওয়ায় এই প্রভাব আরো স্পষ্ট।

এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী এখন নতুন অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হয়। ইরান হরমুজ প্রণালীতে টোল ব্যবস্থা চালু করেছে এবং কিছু জাহাজের কাছ থেকে ইউয়ানে ফি আদায় করছে। এতে চীনের মুদ্রার ব্যবহার বাড়ছে এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরো গভীর হচ্ছে।

কতগুলো জাহাজ ইউয়ানে অর্থ প্রদান করেছে তা স্পষ্ট না হলেও, লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ মার্চ পর্যন্ত অন্তত দু’টি জাহাজ এভাবে টোল পরিশোধ করেছে। গত সপ্তাহে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের মাধ্যমে লয়েডস লিস্টের এই প্রতিবেদনের সত্যতা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছে।

শনিবার জিম্বাবুয়েতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানায়, বিশ্ব তেলের বাজারে ‘পেট্রো-ইউয়ান’ যুক্ত করার এখনই সময়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীনে হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দিলেও, এ বিষয়ে তেহরান বা বেইজিং কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং আইএমএফের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ বলেন, ‘একদিক থেকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের চোখে আঙুল দিয়ে অপমান করতে চাইছে। অন্যদিক থেকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং মিত্র দেশ চীনের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করতে ইরান ইউয়ানের বিষয়ে অত্যন্ত গম্ভীর। চীনও তার নিজের বাণিজ্য এবং ব্রিকস দেশগুলোর বাণিজ্য ইউয়ানে রূপান্তর করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ উভয় দেশের জন্য লাভজনক। এতে ডলারনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে তারা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পারছে এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সহজ হচ্ছে।

ব্রিটেনের কিল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক বুলেন্ত গোকে বলেন, ইরান খুব ভালো করেই বোঝে, মার্কিন আর্থিক আধিপত্যের জন্য এটি কত বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে চীনের জন্য এই পদক্ষেপটি একটি ‘বহু-মেরু আর্থিক বিশ্ব’ গড়ার লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চীন বর্তমানে ইরানের তেল রফতানির ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনে থাকে, যা ইউয়ানের মাধ্যমে এবং বিশেষ ছাড়ে কেনা হয় বলে ধারণা করা হয়। বিনিময়ে ইরান চীন থেকে প্রচুর পরিমাণে যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, রাসায়নিক এবং শিল্প উপাদান আমদানি করে।

গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে ইউয়ানের প্রভাব বাড়লেও, ডলারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ইউয়ানকে এখনো অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। ডলারের মতো ইউয়ান অবাধে রূপান্তরযোগ্য নয়। বেইজিংয়ের কঠোর ‘ক্যাপিটাল কন্ট্রোল’ বা পুঁজি নিয়ন্ত্রণের কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছামতো এই মুদ্রা অন্য মুদ্রায় পরিবর্তন করতে বা দেশের বাইরে পাঠাতে পারে না। এ ছাড়া চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ বাজারের স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় তৈরি করে।

আইএমএফের তথ্যমতে, গত বছর বিশ্বজুড়ে রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ডলারের অবস্থান ছিল ৫৭ শতাংশ, যেখানে ইউরোর ২০ শতাংশ এবং ইউয়ানের অবস্থান ছিল মাত্র দুই শতাংশ। এ ছাড়া ২০২৪ সালে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ ইউয়ানে নিষ্পত্তি হয়েছে। হংকংয়ের নাটিক্সিস-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, এটি এখনই বিশ্বকে ‘ডি-ডলারাইজ’ বা ডলারমুক্ত করবে না। তবে হরমুজ প্রণালীতে ইউয়ানের ব্যবহার জ্বালানি প্রবাহের ক্ষেত্রে একটি বিকল্প পথকে স্বাভাবিক করে তুলবে। তিনি মনে করেন, বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন, যারা ১৯৭০ সাল থেকে সৌদি আরবের এক চুক্তির মাধ্যমে ডলারে তেল বিক্রি করে আসছে।

ইউরোপীয় সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক হোসুক লি-মাকিয়ামা মনে করেন, ইউয়ান আন্তর্জাতিকীকরণে পিছিয়ে থাকলেও ইরানের তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ চীন ইরানের প্রায় সব তেল কেনে এবং ইরান তার প্রয়োজনীয় সব শিল্পপণ্য চীনের কাছে পায়। আগে ইউরোপ বা জাপানের মুদ্রা ডলারকে সরাতে পারেনি, কারণ তারা তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সব চাহিদা মেটাতে পারতো না। কিন্তু চীন এখন বিশ্বের বৃহত্তম ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’।

ডিফারেন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ড্যান স্টেইনবক বলেন, স্বল্পমেয়াদে ডলারের শ্রেষ্ঠত্ব পরিবর্তন না হলেও ইউয়ানের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার সময়ের সাথে সাথে নির্দিষ্ট খাতগুলোতে মার্কিন আধিপত্য ক্ষয় করতে পারে। এটি হবে একটি ধীরগতির ক্ষয়, হঠাৎ কোনো প্রতিস্থাপন নয়।

অধ্যাপক কেনেথ রোগফ বলেন, অনেক কিছু নির্ভর করছে চলমান যুদ্ধের পরিণতি এবং আগামী বছরগুলোর পরিস্থিতির ওপর। যদি ইরান ও চীন জয়ী হয়, তবে অনেক দেশ মার্কিন আর্থিক নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচতে ডলারের বিকল্প খুঁজবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে কোণঠাসা করতে সফল হয়, তবে ডলারের আধিপত্য আরো কিছুকাল স্থায়ী হতে পারে।