বৃষ্টির ক্ষত নিয়ে আজ শেষ হচ্ছে বইমেলা

গ্রন্থমেলায় প্রাণের উৎসব

আবুল কালাম
Printed Edition
বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত বইমেলা প্রাঙ্গণ  : নয়া দিগন্ত
বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত বইমেলা প্রাঙ্গণ : নয়া দিগন্ত

বৃষ্টির ক্ষত নিয়ে আজ শেষ হচ্ছে বইমেলা। ১৮ দিনের মেলা শেষে রাত ৯টায় বিদায় ঘণ্টার মাধ্যমে এক বছরের জন্য শেষ হবে প্রাণের এই মেলা। এর আগে শুক্রবার রাতে হঠাৎ ঝড় বৃষ্টি শুরু হলে মেলায় স্টল ও বইয়ের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। রাত ৮টার দিকে শুরু হওয়া হঠাৎ ঝড় বৃষ্টির সাথে ছিল শিলাবৃষ্টিও। এতে বিপাকে পড়েন আগত ক্রেতা, প্রকাশক ও বিক্রেতারা। বৃষ্টির পানি স্টলগুলোর ভেতরে ঢুকে পড়লে অনেক বই ভিজে যায়। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

গতকাল মেলায় গিয়ে দেখা যায় অনেক স্টলের সামনে বই শুকাচ্ছেন প্রকাশকরা। আবার ক্ষতিগ্রস্ত স্টলগুলো মেরামতও করছিলেন অনেকে। বিক্রেতারা জানান, এবার এমনিতেই বিক্রি নেই। তার মধ্যে বৃষ্টি ক্ষতির পরিমাণটা বাড়িয়ে দিলো। তাদের ভাষ্য- বাতাসের মুখে থাকায় স্টল বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যারা বাতাসের মুখে ছিল না তাদের ক্ষতি কম হয়েছে। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে তারা কোনো ধারণা দিতে পারেননি। কারণ আচমকা বৃষ্টিতে তড়িঘড়ি করে স্টল বন্ধ করে দিতে হয়।

মেলায় এবার পাঁচ শতাধিক প্রকাশনা সংস্থা স্টলগুলোতে বইয়ের পসরা সাজিয়েছিল। গল্প, কবিতা, উপন্যাসের পাশাপাশি মেলায় এসেছে বিভিন্ন প্রবন্ধের বই। এবারের বইমেলায় ইসলামিক বই ছিল অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তবে সব মিলিয়ে বইমেলায় নতুন বইয়ের সংখ্যা কম। আর বেচা-বিক্রির অবস্থাও এতটা খারাপ যে স্টল খারচ উঠবে না, এমনকি বিক্রয় কর্মীদের বেতন দিতে হবে পকেট থেকে। এমনটাই জানিয়েছেন প্রকাশকরা।

বাংলা একাডেমির তথ্য মতে, ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় মোট তিন হাজার ২৯৯টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছিল। এবার গত বছরের তুলনায় অনেক কম।

নানা প্রতিবন্ধকতা নিয়ে অনেকটা জোর করেই এবার মেলা শুরু করেছে বাংলা একাডেমি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট থাকায় অন্তর্বতী সরকার যথাসময়ে বইমেলা শুরু না করে অসময়ে বইমেলা শুরুর উদ্যোগ নেয়। বাংলা একাডেমি প্রকাশকদের অসন্তোষের মুখে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা শুরুর ঘোষণা দেয়। তবে প্রকাশকরা এই সময় বইমেলা করার বিপক্ষে মত জানান। তাদের দাবি ছিল, ঈদের পর বইমেলা করতে হবে। বাংলা একাডেমি তা মানেনি। শেষে ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সাথে বৈঠকের পর বাংলা একাডেমি বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানায়। বৈঠকের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আমার একুশে বইমেলা শুরুর কথা বলা হয়।

শুক্রবার মেলায় ছিল শিশুপ্রহর। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় জন্মশতবর্ষ : মুসলিম সাহিত্য সমাজ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোরশেদ শফিউল হাসান। আলোচনায় অংশ নেন মমতাজ জাহান। সভাপতিত্ব করেন আবুল আহসান চৌধুরী। বিকেল ৪টায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

মেলায় এসেছে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের নির্বাচিত ছোটগল্পের সঙ্কলন ‘ভুলে থাকা গল্প’ পাঠক সমাবেশ থেকে প্রকাশিত একটি বিশিষ্ট বই। এই সঙ্কলনে লেখকের পূর্ববর্তী গ্রন্থ ‘কাচ-ভাঙা রাতের গল্প’ এবং ‘অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প’ থেকে বাছাই করা ১৫টি গল্প স্থান পেয়েছে। জাদুবাস্তবতা ও সামাজিক সঙ্কটের মিশেলে রচিত গল্পগুলো নতুন করে সম্পাদনা ও পরিমার্জনা করা হয়েছে। বইয়ের গল্পগুলোতে মানুষের অস্তিত্বের সঙ্কট, সমাজের অন্ধকার দিক, যুদ্ধ ও দারিদ্র্যের ছায়া এবং জাদুবাস্তব উপাদানের দক্ষ ব্যবহার রয়েছে। এটি কেবল পুরনো গল্পের সঙ্কলন নয়, বরং ১৫টি গল্পের নতুন রূপ বা পুনর্লিখন। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে ভিন্নধর্মী শৈলী ও উত্তরাধুনিক ধারার গল্পের জন্য সুপরিচিত, যার প্রতিফলন এই সঙ্কলনেও পাওয়া যায়।

লুণ্ঠিত ভবিষ্যৎ বইটি প্রখ্যাত বাংলাদেশী-মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং অধ্যাপক আলী রীয়াজের লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ। প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এই বইটি মূলত বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের বিভিন্ন দিক নিয়ে রচিত। বইটির মূল আলোচিত বিষয়গুলো হলো বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব এবং অবাধ লুণ্ঠনের চিত্র। বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি এবং অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্পের কারণে বিপুল অর্থের অপচয়। বিদেশী ঋণ এবং এর সুদ পরিশোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ঝুঁকি। দেশ থেকে অর্থ পাচারের পদ্ধতি এবং এর পেছনের রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা। ১২৮ পৃষ্ঠার এই বইটিতে লেখক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে সুশাসনের অভাব একটি দেশের ভবিষ্যৎকে সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। বইটি রকমারি বা বাতিঘর-এর মতো অনলাইন বুকশপগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে।

লেখক ও সাংবাদিক আবিদ আজমের সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছড়া’ শীর্ষক সঙ্কলন। দেশের তিন শতাধিক ছড়াকারের ছড়া নিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন ও ছড়াপাঠ অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে গ্রন্থভুক্ত বিশিষ্ট ও প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ ছড়াশিল্পীরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বিষয়ক ছড়া পাঠে অংশ নেন।

গ্রন্থের সম্পাদক ছড়াকবি আবিদ আজম জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা এবং সময়ের রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতাকে ছড়ার ভাষায় ধারণ করতেই এই সঙ্কলন প্রকাশ করা হয়েছে। দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া প্রায় চার হাজার ছড়ার মধ্য থেকে বাছাই করে সঙ্কলনের ছড়াগুলো নির্বাচন করা হয়েছে বলে জানান।

৩৬০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে তিন শতাধিক ছড়াকারের লেখা স্থান পেয়েছে। সঙ্কলনে অগ্রজ ও তরুণ ছড়াকারদের মধ্যে রয়েছেন আবু সালেহ, রেজাউদ্দিন স্টালিন, ফারুক হোসেন, আবদুল হাই শিকদার, শাহীন রেজা, হাসান হাফিজ, এনায়েত রসুল, মাহমুদউল্লাহ, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, শাহাবুদ্দীন নাগরী, জুলফিকার শাহাদাত, টোকন ঠাকুর, জগলুল হায়দার, নয়ন আহমেদ, আল হাফিজ, শান্তা মারিয়া, আতিক হেলাল, আমির খসরু সেলিম, আরিফ বখতিয়ার, সৈয়দ আহসান কবীর, আহমদ সাইফ, আহমাদ স্বাধীন, এমরান কবির, কামাল হোসাইন খান, জব্বার আল নাঈম, পলিয়ার ওয়াহিদ, মঈন মুনতাসীর, মামুন সারওয়ার, মনসুর আজিজ, মুহিম মাহফুজ, আবু হাসান তাহের, রবিউল কমল, রহমান মল্লিক, শিকদার মোস্তফা, শাকিল মাহমুদ, সাম্য শাহ, সুমন রায়হানসহ আরো অনেক ছড়াকার ও কবি। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন দেবাশিস চক্রবর্তী এবং অলঙ্করণ করেছেন আনিসুজ্জামান সোহেল। বইটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০০ টাকা।

প্রফেসর মুহাম্মাদ হামীদুর রহমান (রহ:) সঙ্কলিত ‘কুরআন ও বিজ্ঞান’ বইটি পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্যে চমৎকার সামঞ্জস্য তুলে ধরে। মাকতাবাতুল ফুরকান থেকে প্রকাশিত এই বইটিতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, ভ্রƒণতত্ত্ব এবং প্রাকৃতিক নিদর্শনের মতো বিষয়ে বৈজ্ঞানিক সত্যের সাথে কুরআনের তথ্যের যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখক/সঙ্কলক : হযরত প্রফেসর মুহাম্মাদ হামীদুর রহমান (রহ:)। সঙ্কলন ও সম্পাদনা: মুহাম্মাদ আদম আলী। বইটিতে ১৪০০ বছর আগে নাজিল হওয়া কুরআনে বর্ণিত অনেক তথ্য আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা সমর্থিত। মহাবিশ্বের সৃষ্টি, ভ্রƒণ উন্নয়ন, সমুদ্রের বৈশিষ্ট্য এবং পাহাড়ের গঠন ইত্যাদি বিষয়ে কুরআনের আয়াতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য কুরআন কোনো বিজ্ঞানের বই নয়, কিন্তু এটি বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, বরং পরিপূরক, এই বার্তাটি তুলে ধরা। বইটি মুসলিমদের ঈমান ও বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। প্রফেসর মুহাম্মাদ হামীদুর রহমান (রহ:) একজন বিশিষ্ট আলেম এবং শিক্ষাবিদ ছিলেন, যিনি কুরআন ও সিরাত চর্চায় বিশেষ অবদান রেখে গেছেন মাসিক আলকাউসার।