আহমেদ ইফতেখার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট ও বিভিন্ন পরিচালনাগত ত্রুটির কারণে ভারত সরকারের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ। প্ল্যাটফর্মে বেআইনি শিশু যৌন নিপীড়নমূলক ও বিভ্রান্তিকর ডিপফেইক কনটেন্ট এবং মেটার প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত বিভিন্ন ত্রুটির কথা উল্লেখ করে জাকারবার্গ দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য নিজেদের আইন-কানুন কঠোর করেছে ভারত সরকার। এতে করে ব্যবহারকারীদের পোস্ট করা কনটেন্টের আইনি সুরক্ষা বলয় সীমিত হয়ে এসেছে এবং প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারী নির্বাহীদের আইনি দায়বদ্ধতা বহুগুণ বেড়েছে। চলতি বছর থেকে ভারতের নতুন নিয়ম অনুসারে, আদালত বা সরকারের চিহ্নিত করা কোনো বেআইনি কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম থেকে সরানোর সময়সীমা ৩৬ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে কেবল তিন ঘণ্টা হয়েছে।
নির্দিষ্ট সময়ে ব্যর্থ হলে বিভিন্ন সামাজিক প্ল্যাটফর্ম তাদের আইনি সুরক্ষার অধিকার হারাতে পারে।
জুলাই মাসে ইনস্টাগ্রামে শিশু যৌন নিপীড়নমূলক বিজ্ঞাপনের উপস্থিতি নিয়ে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে ভারতের ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। পরে মেটাকে এমন সব বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট অবিলম্বে সরিয়ে নেয়া নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। একই সাথে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত কনটেন্ট ও বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্মে স্থান পেল তার যথাযথ ব্যাখ্যা সাত দিনের মধ্যে জমা দেয়ার জন্য মেটাকে আল্টিমেটাম দিয়েছিল ভারত সরকার।
মেটা বলেছিল, শিশু যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্টের ক্ষেত্রে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান রয়েছে। পাশাপাশি তাদের নিজস্ব শনাক্তকরণ ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার কাজ অব্যাহত রয়েছে বলেও দাবি করেছিল মার্কিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্টটি।
গত মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি পোস্ট ফেসবুক সাময়িকভাবে মুছে ফেলার পর মেটার কর্মকর্তাদের তলব করে দেশটির তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। ঘটনাটিকে পরিচালনাগত ভুলের কারণে অনিচ্ছাকৃত ঘটনা বলে দাবি করে ক্ষমা চেয়েছিল মেটা।
ভারতের এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার তথ্য অনুসারে, ফেসবুকে প্রকাশিত কিছু ভিডিওতে নরেন্দ্র মোদিকে ‘অপমানজনকভাবে’ উপস্থাপন করার অভিযোগে ‘মেটা ইন্ডিয়া’র প্রধান অরুন শ্রীনিবাসের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে হায়দ্রাবাদ পুলিশ। বিবিসির অনুসন্ধানী দলের ‘বিবিসি আই’ এক তদন্তে উঠে এসেছে, ভারতে অর্থের বিনিময়ে এমন কিছু বিজ্ঞাপনের প্রচার চালাচ্ছে ইনস্টাগ্রাম, যা সরাসরি শিশু যৌন নিপীড়নমূলক উপাদানের বিস্তার ঘটাচ্ছে। এ তথ্য সামনে আসার পরপরই নড়েচড়ে বসেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটাকে নোটিশ পাঠিয়েছে ভারত সরকার। নোটিশে সরকার জানতে চেয়েছে, কীভাবে ও কোন নজরদারির অভাবে ইনস্টাগ্রামের মতো জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের স্পর্শকাতর ও আপত্তিকর বিজ্ঞাপন প্রচারের অনুমতি মিলল।
অনুসন্ধানের খাতিরে বিবিসি ভারতে ইনস্টাগ্রামে ছদ্মনামে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলে। কারণ, ব্যবহারকারীরা নিজে থেকে না খুঁজলেও প্ল্যাটফর্মটি নিজে থেকেই যৌন উদ্দীপক কনটেন্ট ব্যবহারকারীদের সামনে নিয়ে আসছিল।
বিবিসির সেই নতুন অ্যাকাউন্টটি এ ধরনের ১০টি প্রোফাইল অনুসরণ বা ফলো করার পর এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ইনস্টাগ্রাম সেই ছদ্মনামের অ্যাকাউন্টে প্রাপ্তবয়স্কদের পর্নোগ্রাফি-সম্বলিত পেইড বিজ্ঞাপন দেখাতে শুরু করে। এর কয়েক দিন পর সেখানে শিশু যৌন নিপীড়নমূলক উপাদান প্রচারকারী বিজ্ঞাপনও দেখানো হয়, যার মধ্যে কিছু বিজ্ঞাপনের লিংক ব্যবহারকারীদের সরাসরি টেলিগ্রাম চ্যানেলে নিয়ে যাচ্ছিল এবং সেখানে সেসব আপত্তিকর উপাদান বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল।
অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বিকৃত ও অবমাননাকর’ ভিডিও এবং ছবি ছড়ানোর অভিযোগে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি মেটার ভারতপ্রধান অরুন শ্রীনিবাস এবং বেশ কয়েকটি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সম্প্রতি দেশটিতে ককরোচ জনতা পার্টি-সিজিপির আন্দোলন চলাকালে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো বেশ কিছু পোস্টের জেরে হায়দরাবাদ সাইবার ক্রাইম পুলিশ এই মামলা নথিভুক্ত করে।



