দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো হলো রাষ্ট্রের জন্য বিষফোঁড়া এবং বাস্তবায়নকারীদের জন্য আশীর্বাদ। কোনো প্রকল্পই নির্ধারিত মেয়াদ ও খরচে শেষ না হওয়াই হলো বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের চরিত্র। এরই একটি প্রকল্প মাগুরা-শ্রীপুর মহাসড়ক দুই বছরের মধ্যে এই মহাসড়ক বাঁক সরলীকরণসহ সম্প্রসারণ প্রকল্পটি এখন আট বছরে উন্নীত হয়েছে। ২০২০ সালে প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হলেও ভূমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে কাজের অগ্রগতি কাক্সিক্ষত মাত্রায় পৌঁছায়নি মহাসড়কের বাঁক সোজা করা সাত বছরেও সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে খরচ বেড়েছে ৩১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। সাত বছরে কাজের অগ্রগতি মাত্র ৮৫ শতাংশ বা ২০৯ কোটি ৮৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা গেছে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পশ্চিমাঞ্চলের কর্মকর্তার তথ্য- মাগুরা-শ্রীপুর জেলা মহাসড়ক বাঁক সরলীকরণসহ সম্প্রসারণ (প্রথম সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পটি মোট ২১৫ কোটি ৯ লাখ আট হাজার টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ে অনুমোদন পায় ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক)। মেয়াদ ধরা হয় এপ্রিল ২০১৯ থেকে জুন ২০২১ পর্যন্ত। এরপর প্রকল্পটির মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধিসহ প্রথম সংশোধন ও ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতীত দু’বার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ তিন দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। বর্তমানে প্রকল্পটির ব্যয় ২৪৬ কোটি ৭৩ লাখ ৯ হাজার টাকা। বাস্তবায়ন মেয়াদ জুন ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারিত আছে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ২০৯ কোটি ৮৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ভৌত অগ্রগতি ৮৫.০৫ শতাংশ।
প্রকল্পের কাজ : প্রকল্প পরিচালক জানান, প্রকল্পের প্রধান প্রধান কার্যক্রমগুলো হলো-ভূমি অধিগ্রহণ (ক্ষতিপূরণসহ) ১৫.৯৫ হেক্টর, সড়ক বাঁধে মাটির কাজ ২.২৭ লাখ ঘন মিটার, নতুন পেভমেন্ট নির্মাণ ৭.৪১৮ কিলোমিটার, সার্ফেসিং (ডিবিএস) (৫.৫০ মিটার) ৭.৪৩০ কিলোমিটার, ইন্টারসেকশন নির্মাণ তিনটি, পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ ২০২.৪৫ মিটার, আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ ১৮ মিটার, সসার ড্রেন নির্মাণ ৩৫০ মিটার, রক্ষাপ্রদ কাজ (আরসিসি প্লেট প্যালাসাইডিং) ৩০ হাজার মিটার।
কাজের অবস্থা : ডিপিপিতে ইউটিলিটি শিফটিং বাবদ ২০ লাখ টাকার বিপরীতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি মাগুরা কর্তৃক ১২.৬২ লাখ টাকা ও ওজোপাডিকো লিমিটেড কর্তৃক ২৭.৭৩ লাখ টাকার অর্থাৎ মোট ৪০.৩৫ লাখ টাকার প্রাক্কলন এই দফতরে প্রেরণ করে। প্রেরণকৃত প্রাক্কলিত মূল্য ডিপিপির সংস্থানের অতিরিক্ত হওয়ায় আবার পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি ও ওজোপাডিকো লিমিটেড, মাগুরাকে প্রাক্কলন দাখিলের জন্য চিঠি পাঠানো হয়। পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি, মাগুরা ১১.৬২ লাখ টাকার পরিবর্তে ৪.২৩ লাখ টাকার প্রাক্কলন দাখিল করে। আর ওজোপাডিকোর প্রাক্কলনের প্রক্রিয়াকরণ চলমান রয়েছে।
৬.৫ বছর পর দরপত্র নিয়ে আলোচনা : জানা গেছে প্রথম প্যাকেজের অবশিষ্ট ও ডিপিপির বাকি অঙ্গের পূর্তকাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রধান প্রকৌশলী, সওজ দু’টির পরিবর্তে তিনটি প্যাকেজ অনুমোদন দেন। সেই অনুযায়ী ১ নম্বর প্যাকেজের অবশিষ্ট কাজের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলে মন্ত্রণালয় থেকে পুনঃদরপত্র আহবান করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। সে মোতাবেক চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি পুনঃদরপত্র আহবান করা হয়েছে। ওই প্যাকেজের দরপত্র সমাপ্তীকরণপূর্বক কাজ বাস্তবায়ন এবং ইউটিলিটি শিফটিংয়ের কাজ সম্পাদনে অতিরিক্ত দুই বছর সময় বাড়ানো প্রয়োজন।
সরেজমিন প্রতিবেদন ও ডিসির বক্তব্য : সরেজমিন পরিদর্শন শেষে কমিটি প্রতিবেদনে বলছে, এলএ কেসের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণ সম্ভব নয় বিধায় ২ নম্বর প্যাকেজের পূর্তকাজ বাদ দিয়ে প্রকল্প শেষ করা যেতে পারে। আর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাগুরা সম্প্রতি এক পর্যালোচনা সভায় মন্তব্য করেন, প্রস্তাবিত সড়কের অ্যালাইনমেন্ট কিছুটা পরিবর্তন করা হলে সড়কটি নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা সম্ভব হবে। তবে এক্ষেত্রে প্রকল্প থেকে জেলা প্রশাসন বরাবর সংশোধিত প্রস্তাব পাঠাতে হবে। সড়কটির গুরুত্ব বিবেচনায় প্রস্তাবিত সড়কের অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তন করার বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জেলা প্রশাসনকে জানানোর জন্য প্রকল্প পরিচালককে নির্দেশনা দেয়া হয় ওই সভা থেকে।
প্রকল্পের অগ্রগতির ব্যাপারে সওজ মাগুরা অফিসে গতকাল মুঠোফোনে যোগাযোগ করে নির্বাহী প্রকৌশলী মো: রাসেলের মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ওই অফিসে অন্যরা জানান, বিষয়টি নির্বাহী প্রকৌশলীর দফতরের বিষয়। উনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে বলতে পারবেন।
পরিকল্পনা কমিশনের আইএমইডি বলছে, প্রকল্পের অবশিষ্ট কার্যক্রম সম্পন্নে প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ জুন ২০২৭ পর্যন্ত এক বছর বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। ওই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে। যেখানে প্রকল্প পরিচালক দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন।



