বিশেষ সংবাদদাতা
তুরস্কের শীর্ষস্থানীয় টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠান সানকো বাংলাদেশের মিরসরাই শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। সেখানে সানকো একটি সমন্বিত টেক্সটাইল মিল স্থাপনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে কাপড় উৎপাদন, ফ্যাব্রিক প্রসেসিং এবং উচ্চমূল্যের (ভ্যালু অ্যাডেড) টেক্সটাইল পণ্য তৈরির পরিকল্পনা করছে।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সাথে সানকোর প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এ বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। বৈঠকে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো: শরীফুল আলমও উপস্থিত ছিলেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বৈঠকে সানকোর প্রতিনিধিরা জানান, বাংলাদেশে তাদের বিদ্যমান ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে তুরস্ক থেকে টেক্সটাইল পণ্য সরবরাহ করা হলেও বাংলাদেশের দক্ষ শ্রমশক্তি, সম্ভাবনাময় বাজার এবং রফতানি সক্ষমতার কারণে এখানে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তারা বলেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কাপড় উৎপাদন, ফ্যাব্রিক প্রসেসিং এবং উচ্চমূল্যের টেক্সটাইল পণ্য তৈরি করা হবে। এতে দেশের তৈরী পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পে মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা আরো বাড়বে।
সানকোর প্রতিনিধিরা বলেন, বাংলাদেশে তাদের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ক্রেতা রয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন শুরু হলে নতুন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও বাংলাদেশে আনা সম্ভব হবে। একই সাথে দেশের বিদ্যমান টেক্সটাইল কারখানাগুলো প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে। তারা আরো বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সম্ভাব্য স্থান নির্বাচন এবং অংশীদারদের সাথে আলোচনা এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা হবে। নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে প্রকল্পটি উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৈঠকে সানকোর পক্ষ থেকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জ্বালানি সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন দ্রুত নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং টেকসই উৎপাদনব্যবস্থা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কয়লাবিহীন ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে।
প্রতিনিধিরা বলেন, আধুনিক এ টেক্সটাইল উৎপাদন কেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে শুধু বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানই বাড়বে না, বরং বাংলাদেশের বস্ত্র খাত উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের দিকে আরো এগিয়ে যাবে। একই সাথে স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে এবং নতুন বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বাংলাদেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তুলে ধরে সানকোকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
তিনি বলেন, সরকার শিল্পখাতে বিদেশী বিনিয়োগ উৎসাহিত করছে এবং বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
বাজার নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করবে সরকার : বাণিজ্যমন্ত্রী
দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক ডেটা বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ই-কমার্স বাস্তবায়নবিষয়ক সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ কথা বলেছেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: আতাউর রহমান খান। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এ লক্ষ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হবে। এই ব্যবস্থা ১০ বছরের বাজার তথ্য, উৎপাদন, আমদানি-রফতানি এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে এ ধরনের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সভা করতে হয় এবং সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু এআইভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণ পাওয়া সম্ভব হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘একসময় একটি তথ্য পেতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করতে হতো এবং আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত। এআই ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েক মিনিটের মধ্যে সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরতে পারবে।’
এআই ব্যবস্থা আগাম জানাতে পারবে কোন সময়ে কোন পণ্যের ঘাটতি তৈরি হতে পারে, কোন দেশ থেকে আমদানি করা সুবিধাজনক হবে, কোন দেশের রফতানি সক্ষমতা কতটুকু রয়েছে এবং কখন ক্রয় করলে বাজার সুবিধা পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা কৃষি, খাদ্য, শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের সংবেদনশীল পণ্য নিয়ে কাজ করছে। এসব পণ্যের মধ্যে কোনটি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত, কোনটি আমদানিনির্ভর এবং কোনটির ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানির সমন্বয় রয়েছে তা বিশ্লেষণ করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ অনেক সময় সরবরাহ সঙ্কট। কোনো পণ্যের উৎপাদন বা আমদানি উৎসে সমস্যা সৃষ্টি হলে যাতে হঠাৎ সরবরাহ ঘাটতি তৈরি না হয়, সে জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘কোনো পণ্যের দাম বাড়লে সরকার ভর্তুকি দিয়ে কমাবে কি না, সেটি ভিন্ন বিষয়। কিন্তু সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে যেন বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
তিনি আরো বলেন, ডাল, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদন, মৌসুমি ঘাটতি, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং রফতানিকারক দেশগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা নিয়মিত বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বাণিজ্যমন্ত্রী উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো বছর দেশে ডালের উৎপাদন কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে ফসল ঘরে ওঠার আগেই প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সাথে বিশ্বের যেসব দেশ থেকে পণ্য আমদানি করা হয়, সেসব দেশের উৎপাদন পরিস্থিতি ও রফতানি সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের জানতে হবে কোন সময়ে কোন পণ্যের ঘাটতি তৈরি হতে পারে, কোন দেশ থেকে কখন আমদানি করলে ভালো হবে এবং কোন বাজারে দাম তুলনামূলক সুবিধাজনক থাকবে।’ বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সারা বছর গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একা এই কার্যক্রম পরিচালনা করবে না। কৃষি, খাদ্যসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে সাথে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা হবে। যেসব সংস্থা এ কার্যক্রমে যুক্ত থাকবে, তারা প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
এআই প্রযুক্তির কার্যকারিতা বাড়াতে নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি তথ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ওপেন সোর্স ও সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক তথ্য উৎস ব্যবহার করে একটি সমৃদ্ধ ডেটাবেজ তৈরি করা হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, শুরুতে এ ব্যবস্থার উন্নয়নে সময় লাগলেও কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করার পর এটি মানুষের চেয়ে দ্রুত ও কার্যকরভাবে বিশ্লেষণ দিতে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, ‘দ্রুত ও সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা তৈরি করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে দেশের বাজার ব্যবস্থাপনা আরো শক্তিশালী হবে এবং ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে।’
সভায় ই-কমার্স খাতের উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর বাজার ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়।



