জোট-সমঝোতার জটিল অঙ্কে পড়েছে বহুল আলোচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের ভোটের মাঠ। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এই আসনটি তাদের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে ছেড়ে দেয়ায় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। একই সাথে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের সিদ্ধান্ত ঘিরেও তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে খেজুরগাছ প্রতীকে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ জুনায়েদ আল হাবীব। অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১২ দলীয় সমঝোতার আওতায় এ আসনে এখনো চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। তবে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আমির ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা মোবারক হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী নেছার আহমাদ আন নাছিরী (হাতপাখা), জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির প্রার্থী আশরাফ উদ্দিন মাহদি (শাপলা কলি) এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী আবুল ফাতাহ মো: মাসুক (রিকশা)।
দীর্ঘ দিন ধরে মাঠে সক্রিয় থেকেও দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা এবং যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের মহাসচিব এস এন তরুণ দে।
একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। চারবারের সংসদ সদস্য উকিল আব্দুস সাত্তার এই আসনে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের সমঝোতায় ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী মুফতি ফজলুল হক আমিনী এমপি নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন।
২০১৮ সালের নির্বাচনে বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও ধানের শীষ প্রতীকে উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে সরকার পতনের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে পুনরায় এমপি হন। তার ইন্তেকালের পর নৌকা প্রতীকে শাহজাহান আলম সাজু এমপি নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতা মঈন উদ্দিন এমপি হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব নির্বাচন ছিল কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন।
বর্তমানে জোটের প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বিএনপির তৃণমূলে অসন্তোষ স্পষ্ট। সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলার অনেক নেতাকর্মী বিদ্রোহী প্রার্থী রুমিন ফারহানা ও তরুণ দে’র পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ দিন ধরে জোট ও মহাজোটের সমীকরণে আসনটি মূল দলের এমপি না পাওয়ায় কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হয়নি।
এ দিকে সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে এ আসনে। অতীতের কয়েকটি নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পেছনেও জামায়াতের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। জুলাই বিপ্লবের পর স্বাধীনভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ পাওয়ায় জামায়াতের অবস্থান আরো দৃঢ় হয়েছে। অধ্যক্ষ মাওলানা মোবারক হোসেন নিয়মিত উঠান বৈঠক, গণসংযোগ ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে এলাকায় উল্লেখযোগ্য সাড়া পাচ্ছেন। তিনি স্থানীয় সন্তান হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে তার প্রতি বাড়তি সহানুভূতি লক্ষ করা যায়।
বিএনপি জোটের প্রার্থী মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব এই আসনের বাসিন্দা নন। ১০ দলীয় সমঝোতার আওতাভুক্ত অন্য প্রার্থীরাও তেমন কোনো সাংগঠনিক শক্তি বা জনভিত্তি গড়ে তুলতে পারেননি। এনসিপির প্রার্থী আশরাফ উদ্দিন মাহদি ঢাকার বাসিন্দা হওয়ায় স্থানীয়ভাবে তিনি অপরিচিত। এনসিপির স্থানীয় নেতারাও স্বীকার করছেন, জামায়াতের শক্ত অবস্থানই তাদের প্রার্থীকে বিজয়ী করে তুলবে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি জোটের পর যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটও শরিকদের জন্য আসন ছেড়ে দেয়, তাহলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিজয়ের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। এ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৯৯ হাজার ৪৪৮ জন। এর মধ্যে সরাইল উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে দুই লাখ ৮৮ হাজার ৬০৯ জন, আশুগঞ্জ উপজেলার আটটি ইউনিয়নে এক লাখ ৫৩ হাজার ৯৯ জন এবং বিজয়নগর উপজেলার দু’টি ইউনিয়নে ৫৭ হাজার ৭৪০ জন।



