গোয়েন্দা বিশ্লেষণ প্রতিবেদনেও তীব্র লড়াইয়ের আভাস

জামায়াত জোট পেতে পারে ১৩৬ আসন

জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। বড় দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন, ক্ষমতার পালাবদলের প্রত্যাশা, ইসলামপন্থী রাজনীতির পুনরুত্থান এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠিত কাঠামোর কারণে জামায়াতে ইসলামী নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বলভিত্তিক আসনগুলোতে তাদের সাংগঠনিক শক্তি, ভোটার ম্যানেজমেন্ট এবং জোটকৌশল তাদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে রেখেছে।

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। বড় দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন, ক্ষমতার পালাবদলের প্রত্যাশা, ইসলামপন্থী রাজনীতির পুনরুত্থান এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠিত কাঠামোর কারণে জামায়াতে ইসলামী নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বলভিত্তিক আসনগুলোতে তাদের সাংগঠনিক শক্তি, ভোটার ম্যানেজমেন্ট এবং জোটকৌশল তাদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে রেখেছে।

একটি শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের আটটি বিভাগে মোট ১২৪টি আসনে জামায়াতের সরাসরি জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে এবং জোটভিত্তিক আরো ১২টি আসনে জয়লাভের সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ জামায়াত-এনসিপি জোটের সম্ভাব্য প্রভাববলয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৩৬টি আসন, যা জাতীয় সংসদের অর্ধেকের কাছাকাছি। তবে এই সংখ্যাগুলো সম্ভাব্যতা-চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও ভোটের দিনের বাস্তবতার ওপর।

বিভাগভিত্তিক সম্ভাবনার চিত্র

ঢাকা বিভাগে ১৫ আসন জামায়াত পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা জেলার আটটি এবং বিভাগের অন্যান্য এলাকায় আরো সাতটি আসনে জামায়াতের শক্তিশালী অবস্থান দেখা যাচ্ছে।

এখানে তাদের শক্তির মূল কারণ উল্লেখ করা হয়েছে : শহরতলি ও গ্রামীণ মসজিদভিত্তিক নেটওয়ার্ক; ছাত্রশিবিরের দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক উপস্থিতি এবং অন্য দলের সাথে সমন্বয়। তবে শহুরে ভোটারদের মধ্যে আদর্শগত দ্বিধা ও তরুণ ভোটের বিচ্ছুরণ ফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

ময়মনসিংহ বিভাগে জামায়াতের আট আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহ জেলায় পাঁচটি এবং আশপাশে তিনটি আসনে শক্ত ভিত্তি রয়েছে। এ অঞ্চলে : ঐতিহাসিকভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা বেশি এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থায়ী কর্মী কাঠামো রয়েছে।

খুলনা বিভাগে জামায়াত ২১ আসন পেতে পারে। এর মধ্যে খুলনা জেলার তিনটি ও বিভাগের অন্য জেলাগুলোতে ১৮টি আসনে সম্ভাবনা রয়েছে।

এখানে সাফল্যের উল্লেখযোগ্য কারণ হলো: উপকূলীয় ও গ্রামীণ ভোটে ধর্মীয় প্রভাব; স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ; আর বাম রাজনীতির দুর্বলতা। এই বিভাগ জামায়াতের জন্য অন্যতম কৌশলগত ঘাঁটি।

বরিশাল বিভাগে জামায়াত ৯ আসন পেতে পারে। বরিশাল জেলায় তিনটি এবং আশপাশে ছয়টি পাবে দলটি। এখানে ভোটব্যাংক ছোট হলেও: পরিবারভিত্তিক ভোটিং; প্রভাবশালী স্থানীয় নেতৃত্ব; কম প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে কম ব্যবধানে জয় সম্ভব।

রংপুর বিভাগে ২৪ আসন পেতে পারে জামায়াত। এর মধ্যে রংপুরে তিনটি বাকি ২১টি অন্য জেলায়। এ অঞ্চলকে বিশ্লেষকরা জামায়াতের ‘সারপ্রাইজ জোন’ বলছেন। কারণ, কৃষক ও নি¤œ-মধ্যবিত্ত ভোটারদের অসন্তোষ বিএনপি জোট শরিকদের ভোটের সম্মিলন; স্থানীয় প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতায় এখানে বড় সংখ্যক আসন জয়ের সম্ভাবনা বাস্তবসম্মত কারণ মনে করা হচ্ছে।

রাজশাহী বিভাগে ২৪ আসন পেতে পারে জামায়াত। এর মধ্যে রাজশাহীতে দু’টি আর অন্য জেলাগুলোতে ২২টি। রাজশাহী ঐতিহ্যগতভাবে ইসলামপন্থী রাজনীতির জন্য উর্বর।

বিশেষত মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব; সাংগঠনিক শৃঙ্খলা; শক্তিশালী মাঠকর্মী সংবলিত এ অঞ্চল জামায়াতের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিনিয়োগের ফল দিচ্ছে।

সিলেট বিভাগে জামায়াত সাত আসন পেতে পারে। এর মধ্যে সিলেটে দু’টি এবং অন্য জেলাগুলোতে পাঁচটি। প্রবাসী ভোট, ধর্মীয় পরিচিতি এবং স্থানীয় সামাজিক নেতৃত্ব এখানে বড় ফ্যাক্টর। তবে স্বতন্ত্র ও আঞ্চলিক প্রার্থীদের উপস্থিতি কিছু আসনে বিভাজন তৈরি করতে পারে।

চট্টগ্রাম বিভাগে জামায়াত ১৬ আসন পেতে পারে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ছয়টি বাকি জেলাগুলোতে ১০টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা। চট্টগ্রাম বন্দরনগরী ও পার্বত্য/গ্রামীণ মিশ্র অঞ্চলে : ছাত্রশিবিরের পুরনো শক্ত ঘাঁটি; মসজিদ-মাদরাসা কেন্দ্রিক সংগঠন; জোট সঙ্গীদের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকের সাথে সমন্বয়ে এই বিভাগেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।

জামায়াতের সম্ভাবনা কেন বাড়ছে- এ প্রশ্নের জবাবে বেশ ক’টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রথমত, সংগঠনভিত্তিক রাজনীতি : জামায়াতের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের ক্যাডারভিত্তিক কাঠামো। নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়, বরং সারা বছর মাঠে কাজ করার সংস্কৃতি তাদের ভোট ম্যানেজমেন্টে এগিয়ে রাখে।

দ্বিতীয়ত, জোট কৌশল : বিএনপি বা সমমনা দলের সাথে সমঝোতা হলে ভোটের বিভাজন কমে যায়। এতে ‘কম ভোটে জয়’ কৌশল কার্যকর হয়।

তৃতীয়ত, বিকল্প শক্তির শূন্যতা : অনেক আসনে আওয়ামী লীগের দুর্বলতা এবং তৃতীয় শক্তির অনুপস্থিতি জামায়াতকে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে রাখছে।

চতুর্থত, স্থানীয় নেতৃত্ব : জাতীয় ইমেজ বিতর্কিত হলেও স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব প্রার্থী হওয়ায় ভোটারদের দ্বিধা কমে।

বর্তমান হিসাব অনুযায়ী ১২৪টি সরাসরি + ১২টি জোটভিত্তিক = ১৩৬টি আসনে প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা জামায়াতে ইসলামীর জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। এটি শুধু একটি দলের শক্তি বৃদ্ধি নয়, বরং বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে ইসলামপন্থী ধারার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত।

তবে চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে- সংগঠন, জোট, প্রার্থী নির্বাচন, ভোটের দিনের পরিবেশ এবং জনমতের শেষ মুহূর্তের পরিবর্তনের ওপর। অর্থাৎ সম্ভাবনার মানচিত্র শক্তিশালী- কিন্তু নিশ্চয়তা এখনো দূরে।