সোহেল রানা রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ)
সিরাজগঞ্জের ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের পাঁচলিয়া এলাকায় ৫৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক ট্রাক টার্মিনাল ও চালক বিশ্রামাগার পাঁচ বছরেও চালু হয়নি। রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার অভাবে ইতোমধ্যে স্থাপনাটির অধিকাংশ মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও আসবাব চুরি হয়ে গেছে। বর্তমানে ভবনগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় সেখানে মাদকসেবী ও অসামাজিক কার্যকলাপের বিস্তার ঘটছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সলঙ্গার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের পাঁচলিয়ায় নির্মিত এই প্রকল্পটি দূরপাল্লার পণ্যবাহী ট্রাকচালকদের নিরাপদ বিশ্রামের জন্য নেয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অজ্ঞাত কারণে এখনো ট্রাক টারমিনালটির উদ্বোধন ও কার্যক্রম শুরু হয়নি।
সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, টার্মিনালজুড়ে ভাঙা কাচ, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নির্মাণসামগ্রী এবং অবহেলার চিহ্ন স্পষ্ট। আধুনিক সুযোগ-সুবিধার জন্য নির্মিত স্থাপনাটি এখন নীরব ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর এলাকাটি আরো অনিরাপদ হয়ে ওঠে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৯ সালে দেশের চারটি মহাসড়কে চালকদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ)। এর অংশ হিসেবে ২০২০ সালের ২১ মে পাঁচলিয়ায় প্রায় ১৩ দশমিক ৫৬ একর জমিতে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। একই বছরের ১৫ অক্টোবর তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪২ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং কাজ শেষের সময়সীমা ছিল ২০২২ সালের নভেম্বরে। পরে অতিরিক্ত কাজ সংযোজন করে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৫৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা এবং সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।
সওজ সূত্রে জানা যায়, এখানে একসঙ্গে ১০০টি ট্রাক পার্কিং, চালকদের শয়নকক্ষ, গোসলখানা, শৌচাগার, ক্যান্টিন, নামাজঘর, প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র, ওয়ার্কশপ ও ওয়াশ জোনসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছিল। বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটরও স্থাপন করা হয়েছিল। তবে এসব সুবিধা কখনোই চালু হয়নি; বরং অবহেলায় পড়ে থেকে অধিকাংশ যন্ত্রপাতি চুরি হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে অব্যবহৃত কমপ্লেক্সটি গবাদিপশু রাখার স্থান হিসেবে অনেকেই ব্যবহার করছে, যা প্রকল্পটির দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে।
প্রকল্পটির এমন অবস্থায় পড়ে থাকতে এবং নষ্ট হয়ে যেতে দেখে ট্রাকচালকদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। টাঙ্গাইলের চালক আব্দুল জলিল বলেন, এতবড় প্রকল্প উদ্বোধনের আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এটা খুবই দুঃখজনক। বগুড়ার চালক হানিফ উদ্দিন বলেন, রাতে রাস্তার পাশে গাড়ি রেখে ঘুমাতে হয়, এতে চুরি-ডাকাতির ঝুঁকি থাকে। টার্মিনাল চালু থাকলে এই ঝুঁকিটা থাকত না।
সিরাজগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমরান ফারহান সুমেল বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এটি হস্তান্তর করেনি। ফলে চুরির দায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপরই বর্তায়।
জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, কিছু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে এবং একাধিকবার আলোচনাও হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এটি চালু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদের অপচয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে অনেকের মনে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে অবশিষ্ট স্থাপনাও নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সবাই।



