বিশেষ সংবাদদাতা
- মামলার আসামি এখন নগদের এমডি
- নগদের নিয়ন্ত্রণে দুষ্কৃৃতকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংক
মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’ নিয়ে আবারো অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই অস্থিরতার মূল কারণ এই প্রতিষ্ঠানকে এমন একজনকে প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে যার বিরুদ্ধে অর্থ তসরুফ ও দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হয়েছে। আর এসব নিয়ে আলোচনার জন্য আজ বিকেলে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে একটি জরুরি সভা আহবান করা হয়েছে। এ সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকতে পারেন।
জানা গেছে, বর্তমানে নগদে অচলাবস্থা নিরসনে এই সভা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নগদ আবারো নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা। ফলে পুনরায় অবৈধ টাকা বা ই-মানি তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি আদালতের রায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এই সুযোগে নতুন করে নগদের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ অন্য কর্মীদের বিভাগ পরিবর্তন করা শুরু করেছে তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন্সিক অডিটের সহায়তা করার অপরাধে ২৩ জন কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
গতকাল এই অভিযোগ আনেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান তিনি।
জানা গেছে, গত ১৫ মে ‘নগদ’এ প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নগদ পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে প্রশাসক দল নগদে কাজ করছিল, তারা দায়িত্ব হারিয়েছেন। ফলে নগদের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংক ও ডাক বিভাগ দুই প্রতিষ্ঠানই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।
সূত্র জানায়, আগামী ১৯ মে সোমবার বিষয়টি সম্পর্কে আদালতে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের একটি শুনানি রয়েছে। তারপরেই নগদের পরবর্তী করণীয় এবং নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানা যাবে। তবে এর আগে প্রতিষ্ঠানটিতে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানা গেছে, নগদের অর্থ তসরুপের জন্য যাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক, তাদের মধ্যে একজনকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ করা হয়েছে। তিনি হলেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরিচালক মো: সাফায়েত আলম। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নিয়ে তিনি নতুন মানবসম্পদ কর্মকর্তা নিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে শুরু করেছেন। গত দুই দিনে শীর্ষপর্যায়ের ২৩ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়ের করা মামলার আরো দুই আসামিকে নতুন করে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এতে নগদ পরিচালনায় নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার নগদে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। প্রশাসক বসানোর পর নিরীক্ষায় উঠে আসে, নগদ লিমিটেডে বড় ধরনের জালিয়াতি সংঘটিত হয়েছে। ভুয়া পরিবেশক ও এজেন্ট দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে আর্থিক জালিয়াতি এবং অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক অর্থ বা ই-মানি তৈরি করা হয়েছে। এর পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সরকারের আমলে নিয়মের বাইরে গিয়ে গ্রাহক বানানো ও সরকারি ভাতা বিতরণসহ একচেটিয়া সুবিধা পায় নগদ। এ সুবিধা নেয়ার পেছনে নগদ সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (বর্তমানে বিদেশে পলাতক) তানভির মিশুক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটিতে যখন এসব অনিয়ম সংঘটিত হয় তখন এর পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগের একাধিক সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। এ ঘটনায় সরকারের ডাক বিভাগের আটজন সাবেক ও বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি), নগদের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (সিইও) ২৪ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়ের করা মামলার আসামিদের পুলিশ কেন খুঁজে পাচ্ছে না সে প্রশ্নও রাখেন মুখপাত্র। বাংলাদেশ ব্যাংক ডাক বিভাগকে নগদ পরিচালনার লাইসেন্স দিয়েছে, কিন্তু ডাক বিভাগ কেন দ্বিতীয় পক্ষের হাতে প্রতিষ্ঠানটিকে তুলে দিলো এ বিষয়ে উদ্বেগের কথা জানান মুখপাত্র।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, জনগণের টাকার নিরাপত্তা দেয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব। আগে প্রতিষ্ঠানটি যেনতেনভাবে চলেছে। এ জন্য সরকার পরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক দায়িত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছিল। এখন আদালতের আদেশের কারণে সেই দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হয়েছে। আমরা সেই আদেশ প্রত্যাহার চেয়ে আবেদন করেছি। আশা করি, জনগণের টাকার নিরাপত্তা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক আবার দায়িত্ব ফিরে পাবে।



