সরকারি দলের মুলতবি প্রস্তাবে প্রাণবন্ত আলোচনা

বিতর্ক ছাড়াই গণভোট মেনে নেবার আহ্বান বিরোধীদের

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমধর্মী দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। প্রথমবারের মতো সরকারি দলের পক্ষ থেকে উত্থাপিত একটি মুলতবি প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের অংশগ্রহণে বিস্তৃত ও প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংসদীয় চর্চায় এটি একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

গতকাল রোববার নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদিন ফারুক ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নির্ধারণের লক্ষ্যে মুলতবি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় সরকারি দলের সদস্যরা জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই এই সনদকে আইনি কাঠামোয় রূপ দেয়া হবে।

অন্য দিকে, বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানসহ অন্য সদস্যরা সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশে ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি পরিহারের আহ্বান জানান তারা। এই বিতর্ককে সংসদীয় গণতন্ত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদ যেন পারস্পরিক চরিত্রহননের ক্ষেত্র না হয়ে ওঠে। বরং এটি হবে জাতির জন্য দিকনির্দেশনা প্রদানের জায়গা। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে যুবসমাজ, নারী, শিশু সবার জন্য থাকবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ।” তিনি রাজনৈতিক বিভাজন ও ‘দালাল’ আখ্যা দেয়ার সংস্কৃতি পরিহারের আহ্বান জানান।

গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ যে গণভোটের পক্ষে আমরা সবাই একসাথে কাজ করেছি, আসুন কোনো বিতর্ক ছাড়াই সেই গণভোট মেনে নিই। গণভোটের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার কাঠামো গড়ে তোলা হোক।” একই সাথে তিনি সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী একটি প্রস্তাব পেন্ডিং থাকা অবস্থায় নতুন মুলতবি প্রস্তাব আনার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭-এর পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলনÑ সবই একে অপরের পরিপূরক। অতীতের কোনো অধ্যায়কে অস্বীকার করে ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারি দলের এক সদস্যের ‘কিলিং কালচার’ মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, যেই দলটির ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য অত্যাচার করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অপবাদ দেয়া এই সংসদের জন্য লজ্জার। আমাদের ১১ জন শীর্ষ নেতাকে ঠাণ্ডা মাথায় জুডিশিয়াল কিলিংয়ের শিকার বানানো হয়েছে। হাজারো কর্মীকে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় করা হয়েছে, আয়নাঘরে পাঠানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জুলাই বিপ্লবকে ব্যর্থ করতে দলকে নিষিদ্ধও করা হয়েছিল। ফ্যাসিবাদের জন্ম ইতিহাস টেনে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়েছিল ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর। সেদিন লগি-বৈঠার তাণ্ডবে পল্টন মোড়ে আমাদের ছয় কর্মীকে সাপের মতো পিটিয়ে হত্যা করে লাশের ওপর নর্তন-কুর্দন করা হয়েছিল। সেই দৃশ্য দেখে গোটা বিশ্ব স্তম্ভিত হয়েছিল।

বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে ফ্লোর দেন স্পিকার। এ সময় স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জামায়াত দলীয় সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, অতীতে দেখে আসছি, বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন। কিন্তু এখন মন্ত্রীর নাম ঘোষণা। এটা সংসদীয় রীতিনীতির ব্যত্যয় কি না? এ পর্যায়ে স্পিকার বলেন, এটা তো তিনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বক্তব্য দিচ্ছেন।

সংসদে দেয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিসমূহ পরে পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাতিল করা হয়েছিল। তিনি এগুলো পুনর্বহালের পক্ষে মত দেন এবং বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকলে আরো শক্তিশালী হতো।

তিনি সংবিধান পুনর্লিখনের ধারণার বিরোধিতা করে বলেন, সংশোধনীর মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব। তিনি প্রস্তাব করেন, সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে।

আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানও একই সুরে বলেন, “সংবিধান সংস্কার নয়, সংশোধনের মাধ্যমেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে।” তিনি জুলাই সনদের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

সরকারদলীয় সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, আজ জুলাই বিপ্লবের যে মুলতবি প্রস্তাবটা আমি এনেছি সেটা আমরা আমাদের দল, আমাদের সংসদীয় দল আমরা ঠিক করেছিÑ একটা অক্ষরও বাদ যাবে না। দেখেন বইতে কী লেখা আছে- এক হতে ৩৬ পর্যন্ত প্রত্যেক জায়গায় নোট অব ডিসেন্ট লেখা আছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি জোটের ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই আজকের এই সংসদ। তাই জুলাইযোদ্ধাদের দাবির বিষয়ে সরকারকে আরো ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। একই সাথে সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো ‘সংস্কার পরিষদ’ নয়, বরং সংবিধানের রীতিনীতি মেনেই প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে। আমাদের জুলাইযোদ্ধাদের সাথে ডিল করার জন্য আরো অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। তারা আহত হয়েছেন, অনেকে নিহত হয়েছেন। তারা মূল্য দিয়েছেন বলেই আমরা আজ এখানে আছি। তাই আমাদের সহ্যক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে।

৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশে একটি কোয়াজাই কনস্টিটিউশনাল (আধা-সাংবিধানিক) পরিস্থিতি ছিল। কারণ আমাদের সংবিধানে বলা নেই যে প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে গেলে কী করতে হবে। সংবিধানে গ্যাপ ছিল বলেই অনেক কিছু করতে হয়েছে।

মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, গত ৫৪ বছরে সংবিধানের কিছু ধারা বারবার ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে। সেসব ধারা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা সংবিধান বাতিল করতে চাই না; আমরা চাই ফ্যাসিবাদের উৎসগুলো দূর করতে।” তিনি আরো অভিযোগ করেন, অতীতে তার দলের নেতাকর্মীরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন। তবে বর্তমান সংসদে তিনি সংঘাত নয় বরং সহযোগিতার রাজনীতি দেখতে চান বলে জানান।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ সংক্রান্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন সংসদের সামনে উপস্থাপন করা উচিত। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ আইন প্রণয়নে সক্রিয় অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।

সবশেষে তিনি সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, “কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ি, যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং কোনো অপরাধীই পার পাবে না।”

এই আলোচনার মধ্য দিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা ও সহযোগিতার একটি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য ছাড়াই একটি বিশেষ ‘নোট’ বা ‘ডট’ অন্তর্ভুক্ত করে জাতির সাথে প্রতারণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য আকতার হোসেন। তিনি এই জালিয়াতির নেপথ্যে কারা ছিল, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একইসাথে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথরেখা নিয়ে সরকারি দলের (বিএনপি) বর্তমান অবস্থানকে ‘শঠতা’ ও ‘স্মৃতিবিস্মৃতি’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি।

আকতার হোসেন বলেন, ‘১৭ অক্টোবর জুলাই সনদ স্বাক্ষরের আগে ঐকমত্য কমিটি আমাদের যে খসড়া দিয়েছিল, তাতে কোনো ডট বা বিশেষ নোট ছিল না। কিন্তু এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী একটি নোটের কথা বারবার বলছেন। নোটটি হলোÑ কোনো দল ম্যান্ডেট লাভ করলে তারা সেই মতো ব্যবস্থা নিতে পারবে।

এই নোট নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে কোনো আলোচনা হয়নি। কোনো এক ব্যক্তি বা দল সংসদ প্লাজার সামনে এসে নিজেদের মতো করে এটি অন্তর্ভুক্ত করেছে যাতে জাতির সাথে প্রতারণা করা যায়। আমি তদন্ত দাবি করছি, এই ডটটি কারা অন্তর্ভুক্ত করেছিল।’

বিরোধীদলীয় এই এমপি বলেন, ‘৩১ জুলাই ঐকমত্য কমিশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সব ধাপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষ হয়েছে। সেদিন বিএনপিও সেখানে ছিল। অথচ আজকে তারা ব্যাকস্পেসে গিয়ে পেছনের দিকে ফিরে যেতে চায়। সংস্কারের ঘোড়া অনেক দূর এগিয়ে গেছে, এখন সরকারি দল তাকে লাগাম পরানোর চেষ্টা করছে।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির এই নেতা আরো স্মরণ করিয়ে দেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের আইডিয়া গণপরিষদ ও সংসদের বিকল্প হিসেবে ঐকমত্য কমিশনে সব দলের সম্মতিতে এসেছিল। প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি ও নুরুল হক নুরও এর পক্ষে ছিলেন।

সবশেষে তিনি জয়নুল আবদিন ফারুকের আনা মুলতবি প্রস্তাবটি গ্রহণ না করার জন্য স্পিকারের কাছে বিনীত আহ্বান জানান।

আলোচনা শেষে স্পিকার বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জানতে চেয়েছেন, আগের মুলতবি প্রস্তাবের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে এ বিষয়ে বলব, আগের এবং আজকের মুলতবি প্রস্তাব ‘টকডাউন’ হিসেবে গণ্য হয়েছে।