ছয় গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারিতে টালমাটাল অর্থনীতি

ব্যাংক খাতের ‘মহালুট’

দীর্ঘ দিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীরবতার সুযোগে একের পর এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব ঋণের বড় অংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশের ব্যাংক খাত ভয়াবহ তারল্যসঙ্কট, মূলধন ঘাটতি এবং আমানতকারীদের আস্থাহীনতায় ভুগছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশের ব্যাংক খাতে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের ঘটনা এখন দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সঙ্কট হিসেবে সামনে এসেছে। দীর্ঘ দিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীরবতার সুযোগে একের পর এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব ঋণের বড় অংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশের ব্যাংক খাত ভয়াবহ তারল্যসঙ্কট, মূলধন ঘাটতি এবং আমানতকারীদের আস্থাহীনতায় ভুগছে।

পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে বর্তমান সরকার একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে। টাস্কফোর্সের এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অন্তত ছয়টি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের কারণে দেশের ডজনখানেক ব্যাংক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব গ্রুপের বিদেশে পাচার করা সম্পদ শনাক্ত ও ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন ব্যাংক ইতোমধ্যে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সাথে এনডিএ (নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট) চুক্তি করেছে।

আরামিট গ্রুপ : ৯ ব্যাংকে বিপর্যয়

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আরামিট গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। এই গ্রুপের কারণে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইউসিবি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া এবং সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জানা গেছে, এসব ব্যাংক থেকে নেয়া প্রায় পুরো ঋণই এখন খেলাপি। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো তাদের অর্থ ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা দেখছে না। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, এখন ইসলামী ব্যাংক, ইউসিবি ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংককে আরামিট গ্রুপের বিদেশে থাকা সম্পদের খোঁজ ও উদ্ধারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বহুজাতিক কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ছাড়া এত বিপুল অঙ্কের ঋণ কোনো গ্রুপের পক্ষে পাওয়া সম্ভব নয়। দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকির অভাব এই সঙ্কটকে আরো গভীর করেছে।

এস আলম : ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় লুটেরা

ব্যাংক খাতের সবচেয়ে আলোচিত নাম এখন এস আলম গ্রুপ। টাস্কফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, এই গ্রুপের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঋণের পরিমাণ দুই লাখ ২৫ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এর বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) প্রমাণ পেয়েছে।

এস আলম গ্রুপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৩টি ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইউসিবি, সাউথইস্ট ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক এবং বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক।

বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক ও একীভূত পাঁচ ব্যাংক সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এস আলম গ্রুপ নিজেদের স্বার্থে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করিয়েছে। অধিকাংশ ঋণ দেয়া হয়েছে নিয়মবহির্ভূতভাবে, পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই।

এখন ইসলামী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও একীভূত পাঁচ ব্যাংককে এস আলম গ্রুপের বিদেশে পাচার করা সম্পদের খোঁজ ও উদ্ধারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি এনডিএ চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে এত বড় আকারের ঋণ কেলেঙ্কারি আগে কখনো ঘটেনি।

সালমান এফ রহমান ও বেক্সিমকো : রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের বড় ক্ষতি

ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের বিরুদ্ধেও বিপুল অঙ্কের ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। এই গ্রুপের কারণে ১৪টি ব্যাংক আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে- জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইউসিবি, পদ্মা ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক।

জানা গেছে, বেক্সিমকো গ্রুপের মোট ঋণের পরিমাণ ৫৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু জনতা ব্যাংক থেকেই নেয়া হয়েছে ২৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, যার পুরো অংশ এখন খেলাপি। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটি মারাত্মক আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে।

বেক্সিমকো গ্রুপের বিদেশে পাচার করা সম্পদের খোঁজে জনতা ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ৯টি আন্তর্জাতিক চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার কারণেই এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ এখন ঝুঁকির মুখে।

সিকদার গ্রুপ : নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকেই বিপর্যয়

সিকদার গ্রুপের কারণে ১১টি ব্যাংক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একীভূত পাঁচ ব্যাংক, এবি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক, যা দীর্ঘ সময় সিকদার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকের পরিচালনা ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থে বিপুল পরিমাণ ঋণ অনুমোদন করানো হয়।

বর্তমানে সিকদার গ্রুপের বিদেশে পাচার করা সম্পদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক, একীভূত পাঁচ ব্যাংক এবং অগ্রণী ব্যাংককে।

বিশ্লেষকদের মতে, একটি ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় দীর্ঘ দিন একই পরিবারের প্রভাব থাকলে সুশাসন নষ্ট হয় এবং আর্থিক অনিয়ম বাড়ে। ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘটনা তার বড় উদাহরণ।

নাসা গ্রুপ ও নজরুল ইসলাম মজুমদার

ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপের কারণেও ১১টি ব্যাংক সঙ্কটে পড়েছে।

এসব ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে- ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ইউসিবি, সাউথইস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, পূবালী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।

জানা গেছে, নাসা গ্রুপ ও এর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘ দিন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এসব ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি; কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর সব ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এখন ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংককে নাসা গ্রুপের পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সাথে কয়েকটি অনুসন্ধানী চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।

ওরিয়ন গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি

ওরিয়ন গ্রুপের কারণেও দেশের ১২টি ব্যাংক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ইউসিবি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও মেঘনা ব্যাংক।

জানা গেছে, ওরিয়ন গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ১২ কোটি টাকা। এসব ঋণের বড় অংশ ফেরত আসার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। ওরিয়ন গ্রুপের বিদেশে থাকা সম্পদের খোঁজ ও উদ্ধারের দায়িত্ব পেয়েছে অগ্রণী ব্যাংক ও ইউসিবি। ইতোমধ্যে একটি এনডিএ চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।

অর্থনীতি ও আমানতকারীদের জন্য বড় হুমকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতের এই লুটপাট শুধু কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্কট নয়; এটি পুরো অর্থনীতির জন্য একটি বড় হুমকি। ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ কমছে, শিল্প খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব অনিয়মের বড় অংশ ঘটেছে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক সহযোগিতার মাধ্যমে। ফলে শুধু অর্থ উদ্ধার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, জবাবদিহি ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সহজ হবে না। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই অর্থ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং জটিল করপোরেট কাঠামোর মাধ্যমে সম্পদ গোপন করা হয়েছে। তবু আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় কিছু অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হতে পারে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন এক ঐতিহাসিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে হলে শুধু দায়ীদের বিচারের আওতায় আনাই নয়; বরং ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।