সংশোধনের পুঁজিবাজারে কমেছে লেনদেন

রেকর্ড লভ্যাংশ দিয়েও দর হারাল বার্জার

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সূচকের টানা উন্নতির পর প্রকৃত সংশোধন ঘটেছে পুঁজিবাজারে। সোমবার বাজারগুলো সংশোধনের ইঙ্গিত দিলেও হাল্কাভাবেই তা শেষ হয়েছিল। প্রকৃত সংশোধন ঘটেছে গতকাল। এতে দেশের দুই পুঁজিবাজারই সব সূচকের বড় ধরনের অবনতি ঘটে। দরপতনের শিকার ছিল উভয় বাজারেই লেনদেন হওয়া কোম্পানি ও ফান্ডের বেশিরভাগ। সূচকের এ অবনতির প্রতিফলন ঘটেছে বাজারগুলোর লেনদেনেও। এদিন দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনের অবনতি ঘটে। পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা বাজারের এ সংশোধনকে স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন।

গতকাল লেনদেনের প্রথম দু’ঘন্টা কাটে সূচকের ব্যাপক ওঠানামার মধ্য দিয়ে। তবে শেষদিকে বিক্রয়চাপ তীব্রতা পেলে তা আর সামলে উঠতে পারেনি বাজারগুলো। প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৫ দশমিক ১৮ পয়েন্ট হারায়। সকালে পাঁচ হাজার ৬৪০ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৬০৫ দশমিক ৫৭ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ যথাক্রমে ১৭ দশমিক ৮৩ ও ৫ দশমিক ৩৮ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ১১৪ দশমিক ২৯ পয়েন্ট হারায়। ১৫ হাজার ৩৯৫ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট থেকে সূচকটি দিনশেষে স্থির হয় ১৫ হাজার ২৮১ দশমিক ৩৪ পয়েন্টে। সিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১২৬ দশমিক ৭৭ ও ৭৬ দশমিক ২৭ পয়েন্ট।

সূচকের অবনতির প্রভাব ছিল গতকাল দুই পুঁজিবাজারের লেনদেনে। ঢাকা শেয়ারবাজার এক হাজার ১৯৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ২৬০ কোটি টাকা কম। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা। লেনদেন হ্রাস পেয়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারেও। গতকাল বাজারটি ৩০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ১২ কোটি টাকা কম।

গতকাল ঢাকা স্টকে লেনদেনের শুরুতেই প্রধান সূচকটির পতন ঘটে ২১ পয়েন্ট। পরক্ষণেই আবার তা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ১০ পয়েন্টের বেশি উন্নতি ঘটে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার পতন ঘটতে থাকে সূচকটির। ১৫ পয়েন্ট অবনতি ঘটার পর ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়ে বেলা ১১টার দিকে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৬৪৮ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকটির উন্নতি ঘটে ৮ পয়েন্ট। এভাবে সূচকের ব্যাপক ওঠানামার মধ্য দিয়ে সূচকটি বেলা ১২টায় ঠিক আগের দিনের অবস্থানে স্থির হয়। এর পরই বিক্রয়চাপ তীব্র হয়ে উঠলে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বাজার। দুপুর সোয়া ১টায় সূচকটি নেমে আসে পাঁচ হাজার ৬০০ পয়েন্টে। তবে দিনের শেষ কয়েক মিনিটে হারানো সূচকের কিছুটা ফিরে পায় ডিএসই।

বিশ্লেষকদের মতে, গতকাল বাজারে মুনাফা তুলে নেয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষ করে সকালে বিক্রয়চাপ তৈরি হলে তা বিনিয়োগকারীদের বেশ প্রভাবিত করে। কয়েকটির টানা বৃদ্ধির পর যেসব খাতে মূল্যস্তরে বেশ উন্নতি ঘটেছিল এসব খাতেই এ চাপ বেশি সক্রিয় ছিল। এর ফলে সূচকের তুলনামূলক বেশি ওঠানামা করতে দেখা যায়। আর একই কারণে দিনশেষে পতন ঘটে সূচকের।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ প্রধান প্রধান সব খাতই গতকাল দরপতনের শিকার ছিল। তবে আগের দিনের মতো এদিনও বিমা খাতে অপেক্ষাকৃত বেশি দরপতন ঘটে। কিছুটা ভালো অবস্থানে ছিল টেক্সটাইল খাত। এ খাতের প্রায় ৭০ শতাংশ কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। এ ছাড়া আগের তিনদিন টানা সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ দরে লেনদেন হওয়া ইসলামী ব্যাংকও কিছুটা দর হারায় গতকাল। ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৯৬টি কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে ১০৯টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারিয়েছে ২৪০টি। অপরিবর্তিত ছিল ৪৭টির শেয়ারদর। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ২৩৫টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৯১টির দাম বাড়ে, ১২১টির কমে এবং ২৩টির দর অপরিবর্তিত থাকে।

এ দিকে পুুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানি বার্জার পেইন্টস রেকর্ড পরিমাণ লভ্যাংশ দিয়েও নেতিবাচক বাজার আচরণের কারণে দরপতনের শিকার হয়েছে গতকাল। কোম্পানিটি ৩১ মার্চ শেষ হওয়া অর্থবছরের জন্য ৫২৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। দু’বছর টানা একই হারে লভ্যাংশ দিলো কোম্পানিটি। এটি ২০১৭ সালের পর কোম্পানিটির সর্বোচ্চ নগদ লভ্যাংশ। এর আগে ২০২৫ সালে ৫২৫ শতাংশ ও ২০২৪ সালে ৫০০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয় বার্জার। ২০০৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ভালো লভ্যাংশ দিয়ে আসছে কোম্পানিটি; কিন্তু গতকাল লভ্যাংশ ঘোষণার পর কোম্পানিটি ১৭ টাকা দর হারায়। আগের দিন এক হাজার ৪৩২ টাকায় লেনদেন হওয়া কোম্পানিটির শেয়ারদর নেমে আসে এক হাজার ৪১৫ টাকায়। ডিএসই থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে কোম্পানিটির বিগত অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৭৬ দশমিক ৮৩ টাকা এবং কোম্পানির শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ৪০০ দশমিক ২৪ টাকা। মোট চার কোটি ৯১ লাখ পাঁচ হাজার ৯৯১টি শেয়ারের মধ্যে ৮৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ শেয়ার স্পন্সরদের হাতে, ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ শেয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে এবং ২ দশমিক ০৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীর হাতে।

গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল সেবা খাতের কোম্পানি সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট। ৬৩ কোটি ২০ লাখ টাকায় গতকাল এক কোটি ৯ লাখ ১৫ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় কোম্পানিটির। ৫২ কোটি ২৯ লাখ টাকায় তিন কোটি আট লাখ ৬৩ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে ব্যাংকিং কোম্পানি এনসিসিবি ছিল দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইপিডিসি, ফাইন ফুডস, বেক্সিমকো ফার্মা, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম, ইভিন্স টেক্সটাইলস, বিডি থাই ফুডস, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স ও ন্যাশনাল ফিড মিলস।