নিজস্ব প্রতিবেদক
কাঠগড়া কিংবা হাজতখানায় নয়, ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে শুয়েই কাটল সাবেক এক আইনপ্রণেতার হাজিরার পুরো সময়। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা ফজলে করিম চৌধুরীর এমন এক ব্যতিক্রমী হাজিরার দৃশ্য দেখা গেছে। গুরুতর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সশরীরে এজলাসে উপস্থিত না হলেও ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে তার এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে আদালতপাড়ায় দিনভর চলেছে নানা আলোচনা। তবে মূল অভিযুক্ত কাঠগড়ায় অনুপস্থিত থাকলেও আইনি কোনো বাধা না থাকায় তার আইনজীবীর উপস্থিতিতেই গতকাল মামলার ডিসচার্জ (অব্যাহতি) আবেদনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আদালত ও প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী গতকাল সকালে কড়া নিরাপত্তায় এই মামলার চার অভিযুক্তকে প্রিজনভ্যানে করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। তবে ফজলে করিম চৌধুরীকে কারা পুলিশের বিশেষ প্রহরায় নিয়ে আসা হয় একটি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে। সরেজমিনে দেখা যায়, অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে ফজলে করিম শুয়ে আছেন এবং তার গলায় একটি ‘সার্ভাইকাল কলার’ (ঘাড় ব্যথার বেল্ট) জড়ানো রয়েছে; পাশাপাশি সুরক্ষায় নিয়োজিত আছেন দুজন কারা পুলিশ সদস্য। ট্রাইব্যুনালে আনা হলেও চিকিৎসার স্বার্থে পুরো সময় তাকে অ্যাম্বুলেন্সেই রাখা হয় এবং কোনো কাঠগড়ায় হাজির করা হয়নি।
শুনানি চলাকালে ফজলে করিমের পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী আবদুল কাইয়ুম দাঁড়ালে ট্রাইব্যুনাল তার মক্কেলের অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা জানতে চান। আইনজীবী জানান, তার মক্কেল বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি হাসপাতাল) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ সময় প্রসিকিউশন পক্ষ আদালতকে অবহিত করে বলেন, ফজলে করিমকে অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে এবং তিনি গাড়িটির ভেতরেই অবস্থান করছেন। তখন ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেন তাকে এজলাসের কাঠগড়ায় হাজির করার জন্য। তবে প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে আদালতকে আশ্বস্ত করে জানানো হয় যে, ডিসচার্জ আবেদনের শুনানির সময় অভিযুক্তের সশরীরে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়; শুধু যেদিন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠন করা হবে, সেদিনই কেবল গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে এজলাসে উপস্থিত থাকতে হয়। ফলে তার অনুপস্থিতিতে শুনানি করতে কোনো আইনি বাধা নেই।
প্রসিকিউশনের এই আইনি ব্যাখ্যায় সায় দিয়ে ট্রাইব্যুনাল শুনানি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন। এরপর আইনজীবী আবদুল কাইয়ুম তার মক্কেল ফজলে করিমের বিরুদ্ধে আনা প্রসিকিউশনের অভিযোগগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরে অব্যাহতির সপক্ষে আইনি যুক্তি উপস্থাপন করেন। তবে তার শুনানি অসমাপ্ত রেখেই আদালত আগামী ২৮ জুন পর্যন্ত মামলার কার্যক্রম মুলতবি ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, ফারুক আহাম্মদ, জহিরুল আমিন, মঈনুল করিম, মামুনুর রশিদ ও মার্জিনা রায়হানসহ অন্য কর্মকর্তারা।
উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে চট্টগ্রামে ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরামসহ শিশুকে হত্যার ঘটনায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করে এই মামলাটি করা হয়। মামলার ২২ জন অভিযুক্তের মধ্যে ফজলে করিম চৌধুরীসহ পাঁচজন বর্তমানে গ্রেফতার আছেন।



