নিজস্ব প্রতিবেদক
সাবেক পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গার বিরুদ্ধে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সুযোগ দিয়ে এক কোটি ৭০ লাখ টাকা ঘুষ হিসেবে গ্রহণের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কুড়িগ্রাম-২ আসনের সাবেক এমপি পনির উদ্দিন আহমেদের কাছ থেকে ওই টাকা ঘুষ হিসেবে নেন তিনি। এই অভিযোগে রাঙ্গা ও পনিরের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। গতকাল সোমবার দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে ওই মামলার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থার মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো: আক্তার হোসেন।
অনুসন্ধান প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা ব্যবসায়িক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সাবেক এমপি পনির উদ্দিন আহমেদকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়ে এক কোটি ৭০ লাখ টাকা ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
অনুসন্ধানকালে আরো দেখা যায়, আসামি পনির উদ্দিন আহমেদ মেসার্স জলিল বিড়ি ফ্যাক্টরি এবং হক স্পেশাল (পরিবহন ব্যবসা) নামীয় প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম শাখায় পরিচালিত আসামি পনির উদ্দিন আহমেদের মালিকানাধীন হক স্পেশাল নামীয় হিসাব থেকে ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর ওই ব্যাংকের রংপুর শাখায় পরিচালিত আসামি মো: মশিউর রহমান রাঙ্গার হিসাবে ২০ লাখ টাকা ট্রান্সফার করা হয়। সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের কুড়িগ্রাম শাখা থেকে পনির উদ্দিন আহমেদ রাঙ্গার সোনালী ব্যাংকের সংসদ ভবন শাখায় ২০১৮ সালের নভেম্বরে চার দফায় এক কোটি ৫০ লাখ টাকা জমা করেন। এভাবে মোট এক কোটি ৭০ লাখ টাকা ঘুষ হিসেবে দেয়া হয়েছে। ওই টাকা স্থানান্তর, হস্তান্তর, রূপান্তর, লেনদেনের মাধ্যমে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন, যা দণ্ডবিধির ১৬১/১৬৫/১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হয়েছে।
অন্য দিকে মশিউর রহমান রাঙ্গার বিরুদ্ধে সন্দেহভাজন সম্পদের তথ্য পাওয়ায় তা যাচাই-বাছাই করতে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(১) ধারায় তার নামে সম্পদ বিবরণী নোটিশ জারির সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
সাবেক এমপি শরীফের বিরুদ্ধে চার্জশিট : প্রায় চার কোটি ৫৫ লাখ টাকা মূল্যের অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ২৩ কোটি টাকার বেশি সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে ময়মনসিংহ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গতকাল সোমবার দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে ওই চার্জশিট অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মহাপরিচালক মো: আক্তার হোসেন। তার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি মামলা করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, আসামি শরীফ আহমেদের ২০১৪-১৫ করবর্ষের আগে সঞ্চয় ছিল মাত্র পাঁচ লাখ ৯০ হাজার টাকা। তবে ২০১৪-১৫ করবর্ষ থেকে ২০২৪-২৫ করবর্ষ পর্যন্ত তিনি মোট আয় দেখিয়েছেন ছয় কোটি ৯৩ লাখ ১৩ হাজার ১৮ টাকা। আগের সঞ্চয় যোগ করলে তার মোট প্রদর্শিত আয় দাঁড়ায় ছয় কোটি ৯৯ লাখ তিন হাজার ১৮ টাকা। এর মধ্যে তিনি মৎস্য খাত থেকে আয় দেখিয়েছেন চার কোটি ৪৩ লাখ ৮৩ হাজার ৪৫৩ টাকা। কিন্তু এই আয়ের পক্ষে কোনো বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। জব্দ করা আয়কর নথিতেও এর উৎসের কোনো প্রমাণ মেলেনি। এমনকি সরেজমিন পরিদর্শনে মৎস্য চাষের অস্তিত্বও পায়নি দুদক। মৎস্য খাতের আয় বাদ দিলে শরীফ আহমেদের বৈধ আয় দাঁড়ায় দুই কোটি ৫৫ লাখ ১৯ হাজার ৫৬৫ টাকা। একই সময়ে তার পারিবারিক ব্যয় ছিল এক কোটি ২৩ লাখ ৩৯ হাজার ৮৮১ টাকা। ব্যয় বাদ দিলে গ্রহণযোগ্য আয় থাকে মাত্র এক কোটি ৩১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮৪ টাকা। অথচ অনুসন্ধানে তার নামে চার কোটি ৫৫ লাখ ১৮ হাজার ৫৮১ টাকা মূল্যের অবৈধ সম্পদের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া শরীফ আহমেদের নামে থাকা ১২টি ব্যাংক হিসাবে মোট ২৩ কোটি আট লাখ ২৩ হাজার ৪০৯ টাকা জমা এবং ১৯ কোটি ৬০ লাখ ৫৮ হাজার ৪০৭ টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে, যা সন্দেহজনক লেনদেন হিসেবে চিহ্নিত করেছে দুদক। এসব লেনদেনের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের অভিযোগ আনা হয়েছে অনুমোদিত চার্জশিটে।


