আপাতত সংঘর্ষহীন ক্যাম্পাস তবু নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন

ছাত্র সংসদের উপস্থিতি দেখাচ্ছে নতুন সমীকরণ

হারুন ইসলাম
Printed Edition

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতির চিত্রে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য দুই ধরনের পরিবর্তনই লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রকাশ্য সহিংসতা ও বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা আপাতত কম দেখা গেলেও ‘সফট কন্ট্রোল’ বা নরম প্রভাব বলয়ের প্রশ্নটি এখন আলোচনার কেন্দ্রে। সরাসরি হল দখল বা ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্ঘাত নয়, বরং সাংগঠনিক সমন্বয়, প্রশাসনে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে নিয়োগ, টেন্ডারবাণিজ্য কাদের দখলে তা এখন বেশি আলোচিত।

নেতৃত্ব পরিবর্তন ও সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস

সরকার পরিবর্তনের পর সাধারণত ক্যাম্পাস রাজনীতিতে প্রভাবের ভারসাম্য বদলায়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন নয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন সরকারের সূচনালগ্নে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দল-সমর্থিত ছাত্র সংগঠনগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা ইউনিটগুলো পুনর্গঠন, নতুন কমিটি ঘোষণা, হলভিত্তিক সংগঠন গুছিয়ে নেয়া এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের ক্যাম্পাস সফর প্রভৃতি কার্যক্রম বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে এই পর্যন্ত বিভিন্ন ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রমকে ইতিবাচক দেখছে শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মতো কোনো ছাত্র সংগঠন প্রভাব বিস্তার করতে চাইলে পরিণতি ভালো হবে।

এ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়- এসব বড় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। নতুন কমিটি প্রদান, পাশাপাশি নিজেদের মূল দল রাজনৈতিক কার্যক্রমকে অন্ধভাবে সর্মথন, ক্ষেত্র বিশেষে রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, আগের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে; তবে প্রভাবের রাজনীতি পুরোপুরি উধাও হয়নি, বরং রূপ বদলেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে ‘সফট কন্ট্রোল’ বলতে সাধারণত বোঝানো হয়, সরাসরি দখল বা শক্তিপ্রয়োগ নয়, বরং নীতিগত সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক বৈধতা, হল বণ্টন, কর্মসূচির অনুমতি এবং অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ ছাত্র সংগঠনগুলো এই নরম প্রভাব বলয়ের সুবিধা পায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন দলের একটি প্রভাব ঐতিহাসিকভাবে আছে। সরকার বদলালে প্রভাবের চরিত্র বদলায়, কিন্তু কাঠামো ভেঙে যায় না। এখন প্রকাশ্য সংঘর্ষ কম, কিন্তু সাংগঠনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা দেখা যায়।’ তার মতে, প্রশাসন যদি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে পারে, তবে এই সফট কন্ট্রোল দুর্বল হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি এলে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। যখন শিক্ষার্থীরা সরাসরি ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে না পারে, তখন সংগঠন ও রাজনৈতিক প্রভাবই প্রতিনিধিত্বের জায়গা দখল করে।’ তিনি মনে করেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত হলে নিয়ন্ত্রণ স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের হাতে চলে আসবে।

ছাত্র সংসদ : প্রতিনিধিত্ব না সংগঠননির্ভর রাজনীতি?

ছাত্র সংসদ নির্বাচন দীর্ঘদিন নিয়মিত না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি সংগঠনকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে এমন মত শিক্ষাবিদদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন দীর্ঘ বিরতির পর একবার হলেও তা নিয়মিত ধারায় পরিণত হয়নি। অন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রসংসদ কার্যত নিষ্ক্রিয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আবু আহনাফ বলেন, ‘আগের মতো হল দখল বা প্রকাশ্য সংঘর্ষ এখন চোখে পড়ে না। কিন্তু কোন সংগঠন কতটা সক্রিয় থাকবে, কে হলে সিট পাবে, কোন কর্মসূচি অনুমতি পাবে, এসব ক্ষেত্রে অদৃশ্য প্রভাব কাজ করছে বলে মনে হয়। একে হয়তো সফট কন্ট্রোল বলা যায়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের ছাত্রী জেরিন জানান, ‘আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত নই। তবু হলের পরিবেশ, কমিটি গঠন বা প্রোগ্রাম আয়োজনের ক্ষেত্রে কোন সংগঠন প্রভাবশালী তা বোঝা যায়। তবে আগের চেয়ে ভয় বা সহিংসতার আশঙ্কা কমেছে, এটি ইতিবাচক।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সালেহ শোয়েব বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পর সাংগঠনিক পুনর্গঠন হয়েছে। নতুন কমিটি হচ্ছে, কেন্দ্রীয় নেতারা আসছেন। এতে রাজনীতি সক্রিয় হয়েছে, কিন্তু আমরা চাই সেটি যেন সহিংসতায় না গড়ায়। ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে প্রতিযোগিতা আরো স্বচ্ছ হতো।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এক শিক্ষার্থী রাশিদুল বলেন, ‘প্রকাশ্যে মারামারি নেই, কিন্তু টান টান অবস্থা পুরোপুরি শেষ হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সংগঠনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলছে। ক্যাম্পাস শান্ত রাখতে প্রশাসনের আরো দৃঢ় ও নিরপেক্ষ ভূমিকা দরকার।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকি বলেন, ‘ছাত্র সংসদ না থাকলে সংগঠনই একমাত্র রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। তখন সফট কন্ট্রোলের সুযোগ তৈরি হয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা বাড়ে এবং কেন্দ্রীয় প্রভাব কমে।’

শিক্ষার্থীদের একটি অংশও বলছে, নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন না থাকায় হল ও বিভাগভিত্তিক ক্ষমতার ভারসাম্য রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর ওপর নির্ভর করে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ সীমিত থাকে।

সহিংসতা কমেছে, নাকি চাপা উত্তেজনা?

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের শুরুর সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা আপাতত কম দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলো দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছে। তবে শিক্ষার্থীদের একাংশের মতে, ‘প্রকাশ্য সংঘর্ষ কমেছে, কিন্তু উত্তেজনা পুরোপুরি নেই- এ কথা বলা যাবে না।’

কিছু ক্যাম্পাসে মিছিল-মিটিং শান্তিপূর্ণ হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংগঠনভিত্তিক তৎপরতায় প্রতিযোগিতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকাশ্য সহিংসতা কমে যাওয়া ইতিবাচক; কিন্তু টেকসই সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে পরিস্থিতি আবারো অস্থির হতে পারে।

প্রশাসনের ভূমিকা

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান এ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রশাসন বলছে, তারা শিক্ষার পরিবেশ অক্ষুণœ রাখতে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে সমালোচকরা বলছেন- প্রশাসন ও প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সমন্বয় থাকলে সেটিই সফট কন্ট্রোলের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

শিক্ষাবিদদের মতে, প্রশাসনের স্বচ্ছ আচরণবিধি, হল ব্যবস্থাপনায় নীতিমালা এবং কর্মসূচির অনুমতির ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করা জরুরি; অন্যথায় নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ থেকেই যাবে।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাত্র রাজনীতির ভবিষ্যৎনির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর; ১. নিয়মিত ও গ্রহণযোগ্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন, ২. প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা, ৩. দলীয় প্রভাব কমিয়ে ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা।

অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেনের ভাষায়, ‘যদি ছাত্র সংসদ সক্রিয় হয় এবং প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকে, তা হলে সফট কন্ট্রোল দুর্বল হবে; অন্যথায় প্রভাবের রাজনীতি রূপ বদলে টিকে থাকবে।’

সব মিলিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে ক্যাম্পাস রাজনীতি আপাতদৃষ্টিতে শান্ত ও পুনর্গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। তবে অদৃশ্য প্রভাব, সাংগঠনিক প্রতিযোগিতা এবং প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি, এ তিনটি প্রশ্নই নির্ধারণ করবে, নতুন বাস্তবতা কতটা টেকসই হবে। ছাত্র সংসদকে সক্রিয় ও কার্যকর করা গেলে নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র সংগঠন থেকে সরে শিক্ষার্থীদের হাতে যেতে পারে- এমনটাই মনে করছেন অধিকাংশ বিশ্লেষক।