নিজস্ব প্রতিবেদক ও ঢাকা জেলা প্রতিনিধি
- ৪০০ লিটার রাসায়নিক ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার
- স্ত্রীসহ তিন নারী আটক
- তিন বছর আগে মাদরাসাটির মালিক ভাড়া নিয়েছেন
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে একটি মাদরাসা ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ভবনটিতে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক ও ককটেল সদৃশ বস্তু উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত শুক্রবার দুপুরে হাসনাবাদ এলাকায় এ বিস্ফোরণের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ভবনটি। তবে ভয়াবহ এই ঘটনায় কেউ নিহত না হলেও চারজন আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রধান সন্দেহভাজন আসামি আলামিন পালিয়ে গেছেন। পুলিশ সূত্র জানায়, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিন নারীকে আটক করে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
এদিকে একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সন্দেহভাজন আলামিন ওই মাদরাসায় পরিবার নিয়ে থাকলেও তিনি নামাজে বিশ্বাসী ছিলেন না। নামাজের জন্য স্বামীকে চাপ দিলে স্ত্রী আসিয়াকে নির্যাতন চালাতেন। স্ত্রীকে বলতেন, আলামিন নামাজ বিশ্বাস না করে মুখে সবসময় ক্লিনসেইভ রাখতেন। একাধিক নারীর সাথেও তার অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। প্রতিবাদ করলেই স্ত্রীকে বেদম মারধর করতেন। গোয়েন্দাদের ধারণা, তিনি কোনো গোষ্ঠীর হয়ে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন।
গোয়েন্দা সূত্র আরো জানায়, জামিনে বেরিয়ে চলতি বছর আলামিন গুম কমিশনে অভিযোগ দাখিল করেন। তার তথ্য গোপন করে গুম কমিশনে যারা অভিযোগ করেছিলেন তাদের কাছ থেকে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করেন। তবে নব্য জেএমবি ও হিন্দাল শ্বারক্বীয়া নামে দু’টি উগ্রগোষ্ঠীর সাথে আঁতাতের অভিযোগে তিনি চারবার গ্রেফতার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত শুক্রবার যেখানে বসে রাসায়নিক দিয়ে বিস্ফোরকদ্রব্য তৈরি করছিলেন তা ইউটিউব দেখে বানানোর সময় বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে।
জানা গেছে, আলামিনের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের মোল্লার হাটের সারুলিয়া বারইগাতীতে। তিনি গ্রামে মাঝে মধ্যে গেলেও দিনে এসে আবার দিনে ফিরে যেতেন।
এদিকে বিস্ফোরণের পেছনে রাসায়নিক বিক্রিয়া বা বিস্ফোরক ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার মো: মিজানুর রহমান বলেন, গত শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় উম্মুল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসার একটি একতলা ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত চারজন আহত হন।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, ‘বিস্ফোরণের পরপরই আমরা এন্টি টেরোরিজম ইউনিটকে অবহিত করি। পাশাপাশি সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থলকে ক্রাইম সিন হিসেবে চিহ্নিত করে।’
তিনি জানান, তল্লাশি চালিয়ে একটি মনিটর, বিভিন্ন ধরনের লিকুইড রাসায়নিক এবং চারটি ককটেলসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে মাদরাসাটি শেখ আলামিন ও তার স্ত্রী আসিয়া পরিচালনা করে আসছিলেন। ভবনের চারটি কক্ষের মধ্যে দু’টি মাদরাসার কাজে ব্যবহৃত হতো এবং বাকি দু’টি কক্ষে তারা পরিবারসহ বসবাস করতেন।
বিস্ফোরণের সময় আসিয়া ও তাদের তিন সন্তান ভবনে ছিলেন। আহতদের মধ্যে আছেন আসিয়া এবং তার তিন সন্তান যাদের বয়স যথাক্রমে ১০ বছর, দুই বছর ও ছয় মাস।
পুলিশ সুপার বলেন, ‘বিস্ফোরণের পর আলামিন তার স্ত্রী ও সন্তানদের স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। কিন্তু সেখানে স্ত্রী ও সন্তানদের রেখে তিনি আত্মগোপনে চলে যান।’ ঘটনার পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে একাধিক টিম অভিযান শুরু করে। ঢাকা জেলা ডিবির টিমও অভিযানে যুক্ত ছিল।
পুলিশ জানায়, আলামিনের স্ত্রী আসিয়া ও তার বড় ভাইয়ের স্ত্রী ইয়াসমিন আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরে গত শুক্রবার রাতে ঢাকার বাসাবো এলাকা থেকে আসমানি খাতুন নামে আরেক নারীকে গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে তিনজনকেই গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
আলামিনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, শেখ আলামিনের নামে ঢাকার আশপাশের কয়েকটি জেলায় মামলা রয়েছে। তিনি অতীতে গ্রেফতার হওয়ার পর কারাগারেও ছিলেন।
পুলিশ সুপার বলেন, ২০২৩ সালে জামিনে মুক্তির পর তিনি প্রথমে অটোরিকশা ও পরে উবার চালক হিসেবে কাজ করতেন। গ্রেফতারের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে মামলার কাগজপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে পুলিশ সুপার বলেন, ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে, তবে এখনো লিখিত মতামত দেয়নি। ঘটনাস্থলে ব্যাপক রাসায়নিক মজুদ এবং ককটেলসদৃশ বিস্ফোরক পাওয়া গেছে।
সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ও এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের প্রাথমিক ধারণা, রাসায়নিক বিক্রিয়া অথবা বিস্ফোরকজাত দ্রব্যের কোনো প্রতিক্রিয়ার কারণেই বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলে বিভিন্ন কনটেইনারে আনুমানিক ৪০০ লিটারের মতো লিকুইড রাসায়নিক পাওয়া গেছে। কিছু কনটেইনারে ‘হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড’ লেখা ছিল। ধ্বংসস্তূপের কারণে এখনো পুরো সিজার লিস্ট চূড়ান্ত করা যায়নি।
জঙ্গি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। ঘটনাস্থলে হ্যান্ডকাফ, পুরনো বেল্টসহ কিছু সন্দেহজনক সামগ্রী পাওয়া গেছে। এগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে।
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নাশকতার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, এমন বিষয়কে সামনে রেখে তদন্তে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তবে এখনো পর্যন্ত বলার মতো কিছু নেই।
পুলিশের তথ্যমতে, মুফতি হারুন নামে একজন ব্যক্তি মাদরাসার অন্যতম পরিচালক ছিলেন এবং বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তিনি বর্তমানে সৌদি আরবে ওমরা করতে গেছেন।
পুলিশ সুপার আরো বলেন, প্রাথমিকভাবে বোঝা যাচ্ছে, তারা কোনো ধরনের বিস্ফোরকজাতদ্রব্য নিয়ে কিছু একটা করছিল। তবে এটিকে এখনই নাশকতা বলা যাচ্ছে না। মামলা দায়েরের পর বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট, রাসায়নিকের উৎস, প্রশিক্ষণ বা ডায়াগ্রামের কোনো আলামত আছে কি না সব কিছু খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ রাজধানীর একেবারে কাছে ও জনবহুল এলাকা। সৌভাগ্যক্রমে সময় ও দিনের কারণে বড় প্রাণহানি হয়নি।’ নাগরিকদের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান, আশপাশের ভাড়াটিয়া বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড নজরে এলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে।
আহতদের মধ্যে আলামিনের বড় ছেলে উম্মায়ের তুলনামূলকভাবে বেশি আহত হলেও কারো বড় ধরনের বার্ন ইনজুরি নেই। অধিকাংশ আঘাত ধ্বংসাবশেষ ধসে পড়ার কারণে হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।



