নয়া দিগন্ত ডেস্ক
একসময় মোদির বিজেপি ভারতে গণমাধ্যমের ভাষ্য নিয়ন্ত্রণ করত, কিন্তু ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের উত্থানে পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে। ভারতের রাজনীতি ও বিজেপির কৌশলের ওপর ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির আন্দোলনের প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভারতের রাজনীতিতে বিজেপির দীর্ঘদিনের একক আধিপত্য, সামাজিক মাধ্যমে তৈরি করা আখ্যান এবং রাজনৈতিক কৌশলের সামনে তেলাপোকা আন্দোলন এক নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
অতীতে বিজেপি স্বতঃস্ফূর্ত জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে বার্তা ছড়াতো। কিন্তু এই আন্দোলনের সময় ইনস্টাগ্রাম রিল বা জেন জি স্ল্যাং ব্যবহার করে তরুণদের আকৃষ্ট করার দলীয় প্রচেষ্টাগুলো কৃত্রিম ও উপহাসের পাত্র হিসেবে দেখা গেছে।
পূর্ববর্তী প্রতিবাদগুলোর মতো এই আন্দোলনকে কোনো একক ধর্ম, গোষ্ঠী বা ‘দেশবিরোধী’ ট্যাগ দিয়ে আলাদা করা যায়নি। আন্দোলনটি বর্ণ-নিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী হওয়ায় এতে বিজেপির নিজস্ব সমর্থক ভিত্তি উচ্চ-বর্ণের তরুণদেরও বড় অংশ যোগ দিয়েছিল।
এই বিক্ষোভ নরেন্দ্র মোদির তরুণদের ওপর স্বতঃস্ফূর্ত কর্তৃত্বের ধারণাকে কিছুটা দুর্বল করেছে এবং রাজনীতিতে তার সময়োপযোগী নেতৃত্বের বিপরীত একটি ভাবমর্যাদা গড়ে তুলেছে।
আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং পাটনার বাঙ্কিপুরের মতো বিজেপির তিন দশকের শক্ত ঘাঁটিতে নির্বাচনে পরাজয় দলটির ভেতরে রাজনৈতিক অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিজেপির অবস্থান : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেলাপোকা আন্দোলনের কারণে বিজেপি তার মূল হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক আদর্শ থেকে পিছু হটবে না; বরং নির্বাচনে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে তারা ধর্মীয় মেরুকরণ আরো জোরদার করতে পারে। তবে তেলাপোকা আন্দোলন সরাসরি নির্বাচনী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ না করলেও একটি শক্তিশালী ‘চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী’ হিসেবে রূপ নিয়েছে।
গত ৪ আগস্ট রাতে দিল্লি থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরে পূর্ব ভারতীয় শহর পাটনার একটি গণনা কেন্দ্রে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) গত ১২ বছরের মধ্যে অন্যতম এক বিস্ময়কর রাজনৈতিক ধাক্কা খায়। বিহার রাজ্য বিধানসভার একটি নির্বাচনী এলাকা বাঙ্কিপুর তিন দশক ধরে বিজেপির দখলে ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক কৌশলবিদ থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া প্রশান্ত কিশোরের নেতৃত্বাধীন নবগঠিত জন সুরজ পার্টি সেই আধিপত্যের অবসান ঘটায় এবং এমন একটি আসনে জয়লাভ করে, যা মাত্র কয়েক মাস আগেও বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের দখলে ছিল। সাত সপ্তাহ ধরে চলা ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এই পরাজয়টি আসে।
বিজেপি প্রধান নবীন বাঙ্কিপুর নির্বাচনী প্রচারণায় দেশের জেন জি প্রজন্মের বিক্ষোভকারীদের ‘একটি ভাইরাস এবং দেশকে ভাঙতে উদ্যত একটি তেলাপোকার দল’ বলে নিন্দা করেছিলেন। কিন্তু এর পরিবর্তে এই নির্বাচনী এলাকায় বিজেপির একচ্ছত্র আধিপত্যই ভেঙে যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অপ্রত্যাশিত নির্বাচনী রায় ভারতের সামনে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন তুলে ধরেছে- ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি বিজেপি কি পরিবর্তিত হতে বাধ্য হবে?
বিজেপি যে জেন জি’র উত্থানকে নিছক একটি ক্ষণস্থায়ী উপদ্রবের চেয়ে বেশি কিছু মনে করছে, তার সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ হলো দলটির প্রতিক্রিয়ার চরম অস্বস্তি। বিক্ষোভের তুঙ্গে থাকাকালে, মোদি ইনস্টাগ্রামে একের পর এক সেলফি-ধাঁচের ভিডিও প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি বিক্ষোভের কারণ হওয়া পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে কথা বলেন। তিনি মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের বলেছিলেন যেসব তরুণ ‘শুধুই ইনস্টাগ্রামে আছে’ এবং মন্ত্রীদের মিডিয়া ব্রিফিংয়ের পরিবর্তে রিল ভিডিওর মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মে তাদের মন জয় করার জন্য অনুরোধ করেন।
ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তরপ্রদেশে, দলটি জেন জি-দের কাছে পৌঁছানোর জন্য একটি উদ্যোগ চালু করেছে, যেখানে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেশনের জন্য বেসামরিক প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের স্কুলগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। বিজেপি একটি জিমের ভিডিওও প্রকাশ করেছে, যেখানে তরুণরা একজন বয়স্ক প্রশিক্ষকের সাথে ইন্টারনেট স্ল্যাং ব্যবহার করে কথা বলছে, যিনি আলোচনাকে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। স্ল্যাং এতটাই বেশি ব্যবহার করা হয়েছিল যে অনেক ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী দলটিকে উপহাস করে মজা করে বলেছেন যে, দলটি সম্ভবত তরুণদের টাকা দিয়ে তাদের নিজেদের প্রজন্মের উদ্দেশ্যেই প্রচারণামূলক লেখা লিখিয়েছে।
নয়াদিল্লির বিশ্লেষক আসিম আলী বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার এই আকস্মিক প্রচেষ্টা দলটি সম্পর্কেই অনেক কিছু প্রকাশ করে। বিজেপি একসময় এমন আখ্যান তৈরি করত, যা তাদের সমর্থকরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রচার করত। তিনি বলেন, আজ তাদের বেশির ভাগ বার্তাই ‘অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত এবং অর্থের বিনিময়ে পাঠানো বলে মনে হয়’, যা এমন একটি বিকেন্দ্রীভূত পরিসরের সাথে বেমানান, যেখানে শীর্ষ থেকে চাপিয়ে দেয়া শৃঙ্খলাকে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো ততটা পুরস্কৃত করা হয় না। মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে বিজেপির যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো শক্তিশালী। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ করে ইনস্টাগ্রামে, এটি সেই ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগঘন সংযোগ তৈরি করতে পারছে না, যা ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের দিকে পারত।
প্যারিসের সায়েন্সেস পো’র সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (ঈঊজও)-এর গবেষক জিল ভার্নিয়ার্স বিজেপির এই প্রচারকে নীতিগত পরিবর্তনের পরিবর্তে ‘ধারণা তৈরির লড়াই’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এমন কোনো প্রস্তাব আসেনি যা মৌলিকভাবে কোনো কিছু পরিবর্তন করে, শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে একজন নতুন মন্ত্রী এসেছেন, কিন্তু তিনিও একই প্রেক্ষাপট থেকে এসেছেন, আরএসএসের একজন প্রবীণ ব্যক্তি।
ভার্নিয়ার্স যুক্তি দেন, যা সত্যিই ভেঙে পড়েছে তা হলো ভিন্নমতের বিরুদ্ধে বিজেপির চিরাচরিত কৌশল : বিক্ষোভকারীদের দেশবিরোধী, বিদেশী অর্থায়নে চালিত বা সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা, যেমনটা তারা ২০১৯-২০ সালে বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময় করেছিল। এই পরিবর্তিত নাগরিকত্ব আইনে প্রথমবারের মতো স্বাভাবিক নাগরিকত্বের জন্য একটি ধর্মীয় পরীক্ষা চালু করা হয়েছিল : ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসা অমুসলিম আশ্রয়প্রার্থীদের নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে দ্রুততর পথ করে দেয়া হয়।
বিক্ষোভের প্রতি অতীতের সেই পন্থা এবার ব্যর্থ হয়েছে, কারণ এক দিকে আন্দোলনটি রাষ্ট্রের উপহাস করার আগেই নিজেকে উপহাস করেছিল এবং অন্য দিকে এটি ছিল বহুত্ববাদী। কৃষকদের বিক্ষোভের মতো এটিকে কোনো একটি ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায়নি এবং এটি বিজেপির নিজস্ব তথাকথিত ‘উচ্চ বর্ণের’ হিন্দু ঘাঁটি থেকেও তরুণদের আকৃষ্ট করেছিল। ভার্নিয়ার্স বলেন, এটি ছিল একটি ‘সত্যিকার অর্থেই বর্ণ-নিরপেক্ষ আন্দোলন’। ঘটনাটি বিজেপির প্রচারিত এ ধারণাকেও চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে যে, তরুণদের ওপর মোদির একটি স্বাভাবিক কর্তৃত্ব রয়েছে। ৭৫ বছর বয়সী মোদিকে নিয়ে ভার্নিয়ার্স বলেন, এই প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীকে তার বয়সের মতোই দেখাচ্ছে। এ আন্দোলনটি যা করেছে তা হলো, জনগণের কল্পনায় তাকে সত্যিই একজন ‘বুমার’-এ পরিণত করেছে এবং এটি নিশ্চয়ই তাকে ভীষণভাবে আঘাত করেছে।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত তিনটি উপনির্বাচনের মধ্যে বিজেপি দু’টিতেই হেরেছে, যেসব রাজ্য তারাই শাসন করে- বিহারের বাঙ্কিপুর ও মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া। বিরোধী নেতারা এই পরাজয়ের সাথে ছাত্র বিক্ষোভকে সরাসরি যুক্ত করেছেন, কিন্তু বিশ্লেষকরা ছিলেন আরো সতর্ক। আলি বাঙ্কিপুরের ভোটকে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দেয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। ভার্নিয়ার্স আরো বলেন, উপনির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত হয় নির্বাচকমণ্ডলীর একটি ক্ষুদ্র অংশের ভোটে, যা ‘জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের সামান্য বেশি’ এবং বিজেপির ক্ষমতার ব্যবস্থা ‘বিপর্যয় সামলে নেয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্থিতিস্থাপক প্রমাণিত হয়েছে’।
ভার্নিয়ার্স হরিয়ানার উদাহরণ টেনে বলেন, যেখানে তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইনের বিরোধিতা করে উত্তরের এই রাজ্যের কৃষকরা এক বছরব্যাপী আন্দোলনে যোগ দেয়ার কয়েক বছর পর বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। তিনি বলেন, এটি ছিল এমন একটি নির্বাচন যা ‘কৃষকদের নিয়ে নয়, বরং জাতপাতের ভিত্তিতে’ লড়া হয়েছিল; যা বদলে গেছে তা ভোটের সংখ্যা নয়, বরং এর চার পাশের একটি ঘটনা যা এখন ‘বিজেপির জন্য চ্যালেঞ্জের এক বৃহত্তর আখ্যানে’ পরিণত হচ্ছে।
সমাজবাদী পার্টির সাংসদ পুষ্পেন্দ্র সরোজ বলেন, জেন জি’র ভিড়টি তার ছাত্র ভিত্তি ছাড়িয়ে সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য এবং এমনকি কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছিল। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ কেবল তখনই এসেছে যখন ‘সরাসরি মোদির দিকে আঙুল তোলা হয়েছিল’। একটি সাধারণ সহানুভূতিও সাহায্য করেছিল। সরোজ বলেন, ‘বাচ্চাদের মার খেতে দেখতে কেউ পছন্দ করে না’।



