বড় পতনের পরদিনই ইউটার্ন পুঁজিবাজারের

লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে বেক্সিমকো ফার্মার তালিকাচ্যুতির ঝুঁকি কমলো

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

পতন সামলে নিয়েছে পুঁজিবাজার। সোমবার বড় ধরনের পতনের পরদিনই গতকাল ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। তবে এদিনও শুরুতে বড় ধরনের বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজারগুলো। ঢাকা বাজারে লেনদেন শুরুর দশ মিনিটের মাথায় ৩০ পয়েন্ট হারায় প্রধান সূচকটি। এর পরই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। দিনের বাকি সময় নতুন করে বিক্রয়চাপ তৈরি না হলে উভয় বাজারই সূচকের বড় উন্নতি দিয়ে লেনদেন শেষ করে।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্ধ ও দুর্বল দুই ধরনের কোম্পানি নিয়ে ডিএসইর প্রকাশ করা দুই তালিকা নিয়ে বিভিন্ন ব্রোকার হাউজে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়লে হঠাৎ বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। বেড়ে যায় বিক্রয়চাপ। তা ছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থায় নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বাজারের শৃঙ্খলা ফেরানো নিয়ে কঠোর মনোভাব বিনিয়োগকারীদের একটি অংশের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করে। এ দু’টি কারণেই পরশু বড় ধরনের বিক্রয়চাপের শিকার হয় বাজারগুলো। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায় ডিএসইর পক্ষ থেকে ব্রোকার হাউজগুলোর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বার্তা দেয়া হয়েছে যে বাজারে কোন ধরনের অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ করা হবে না। বাজার তার স্বাভাবিক গতিতেই চলবে। শুধুমাত্র বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করার লক্ষ্যেই তালিকা দু’টি প্রকাশ করা হয়েছে। এটাই গতকাল পুঁজিবাজারের ফের ঘুরে দাঁড়ানোর কারণ বলে মনে করেন তারা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৫১ দশমিক ০৭ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। ৫ হাজার ৫৫৪ দশমিক ১৭ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৬০৫ দশমিক ২৫ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৭ দশমিক ২৫ ও ১০ দশমিক ১৬ পয়েন্ট। অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৫৩ দশমিক ১৩ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে গতকাল। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৬৫ দশমিক ৩৮ ও ১৫ দশমিক ৫০ পয়েন্ট।

সূচকের উন্নতির মধ্যেও গতকাল লেনদেনে দুই পুঁজিবাজারের দুই ধরনের চিত্র দেখা যায়। ঢাকা বাজারে গতকাল লেনদেন কিছুটা হ্রাস পেলেও বেড়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। ডিএসইতে গতকাল ৮২৮ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিনের চেয়ে ৪৮ কোটি টাকা কম। সোমবার লেনদেন ছিল ৮৭৬ কোটি টাকা। চট্টগ্রামে লেনদেন হয় ৯৮ কোটি টাকা, যা আগের দিন অপেক্ষা ২৪ কোটি টাকা বেশি। তবে এখানে এককভাবে ব্র্যাক ব্যাংকের ৬৮ কোটি টাকার শেয়ার বেচাকেনা হয়েছে।

এ দিকে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেট (এআইএম) থেকে তালিকাচ্যুতির ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিচালনা পর্ষদ সভা আয়োজনের জন্য বিশেষ অনুমোদন দিয়েছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এর ফলে কোম্পানিটি দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটিয়ে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করার সুযোগ পাচ্ছে।

বিএসইসি থেকে বিশেষ অনুমোদন পাওয়ার পর গতকাল বিকেলে পরিচালনা পর্ষদের সভা আহ্বান করেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। এ সভায় কোম্পানিটি ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনার পাশাপাশি চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিক অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ের আর্থিক প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করা হবে। এসব আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদনের পর পরিচালনা পর্ষদ ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে না পারায় লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানিটির তালিকাভুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ইতোমধ্যে গত ২ জানুয়ারি থেকে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অলটারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেট এ বেক্সিমকো ফার্মার গ্লোবাল ডিপোজিটরি রিসিপ্টস (জিডিআর) লেনদেন স্থগিত রয়েছে।

এআইএমের প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, কোনো সিকিউরিটিজের লেনদেন টানা ছয় মাস বন্ধ থাকলে সেটির তালিকাভুক্তি বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ অবস্থায় বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের লন্ডন-তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগকারী ছয়টি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সম্প্রতি বিএসইসির চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ সভা আয়োজন এবং বকেয়া আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদনের সুযোগ দেয়ার অনুরোধ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে কোম্পানিটিকে বিশেষ অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

এর আগে গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক ঘোষণায় বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস জানিয়েছিল, এআইএম রুলস-১৯ অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব নির্ধারিত সময়সীমা অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে বিধি অনুযায়ী গত ২ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে লন্ডনের বাজারে কোম্পানিটির জিডিআর লেনদেন স্থগিত করা হয়।

সেই ঘোষণার পর থেকে এখনো লন্ডনের শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির জিডিআর লেনদেন বন্ধ রয়েছে। এআইএম রুলস ফর কোম্পানিজের ১৯ ধারা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানিকে অর্থবছর শেষ হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন ও হিসাব প্রকাশ করতে হয়। অন্য দিকে ৪১ ধারা অনুযায়ী কোনো সিকিউরিটিজ টানা ছয় মাস স্থগিত অবস্থায় থাকলে এবং স্থগিতাদেশের কারণ দূর না হলে সাধারণত লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটিজের লেনদেনের অনুমোদন বাতিল করে দেয়।

আগামী ২ জুলাই এই ছয় মাসের সময়সীমা শেষ হবে। তবে সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই বিএসইসির কাছ থেকে পরিচালনা পর্ষদ সভা আয়োজনের অনুমতি পাওয়ায় এবং কোম্পানির পক্ষ থেকে সভার তারিখ ঘোষণা করায় তালিকাচ্যুতির আশঙ্কা অনেকটাই কমেছে। এখন কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে গতকাল মঙ্গলবার কোম্পানিটির পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে এবং সেখানে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করা হতে পারে।