পরিচয় মিলেছে নিহত ২৬ জনের

পদ্মায় বাসডুবি

Printed Edition
দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে বাস দুর্ঘটনায় নিহতদের লাশ উদ্ধারের পর কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা (ইনসেটে) : নয়া দিগন্ত
দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে বাস দুর্ঘটনায় নিহতদের লাশ উদ্ধারের পর কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা (ইনসেটে) : নয়া দিগন্ত

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আটজন পুরুষ, ১১ জন নারী এবং সাতজন শিশু। নিহতদের মধ্যে ১৮ জনই রাজবাড়ী জেলার বাসিন্দা। বাকিরা কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, দিনাজপুর, গোপালগঞ্জ এবং ঢাকার বাসিন্দা। এ ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ছয়জন।

বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, বুধবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ফেরিতে ওঠার আগে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি সরাসরি পানিতে পড়ে ডুবে যায়।

প্রায় ৬০ ফুট গভীরে ডুবে যায় বাসটি। দীর্ঘ সময় অভিযান চালিয়ে রাত ১২টা ৩৮ মিনিটে বাসটি উদ্ধার করা হয়। বাসটিতে আনুমানিক ৪০ জন যাত্রী ছিলেন।

নিহতদের মধ্যে রাজবাড়ীর ১৮ জন হলেন- রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর লালমিয়া সড়কের মৃত ইসমাইল হোসেন খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১), ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫), সোহেল মোল্লার মেয়ে সোহা আক্তার (১১), সজ্জনকান্দার মৃত ডা: আবদুল আলিমের মেয়ে জহুরা অন্তি (২৭), কাজী মুকুলের মেয়ে কাজী সাইফ (৩০), কেবিএম মুসাব্বিরের ছেলে তাজবিদ (৭), দাদশী রামচন্দ্রপুরের সোবাহান মণ্ডলের মেয়ে লিমা আক্তার (২৬), আগমারাই গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে সাবিত হাসান (৮), মিজানপুর বড়চর বেনি নগরের মান্নান মণ্ডলের স্ত্রী জোসনা (৩৫), গোয়ালন্দ ছোট ভাকলার চর বারকিপাড়ার রেজাউল করিমের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার (৩২), মেয়ে সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), কালুখালী বোয়ালিয়ার ভবানীপুরের বিল্লাল হোসেনের মেয়ে ফাইজ শাহানুর (১১), রতনদিয়া মহেন্দ্রপুর বেলগাছির আব্দুল আজিজের স্ত্রী নাজমিরা জেসমিন (৩০), ছেলে আব্দুর রহমান (৬), ঝাউগ্রামের মজুন শেখের ছেলে উজ্জল শেখ (৪০), চরমদাপুরের আফসার মণ্ডলের ছেলে আশরাফুল, ছানাউল্লার ছেলে জাহাঙ্গীর এবং বালিয়াকান্দি পশ্চিম খালখোলার আরব খানের ছেলে (গাড়িচালক) আরমান খান (৩১)।

বাকি আটজন হলেন- কুষ্টিয়া মজমপুরের মো: আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), খাগড়বাড়িয়ার হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), খোকসা সমাজপুর ধুশুন্দুর এলাকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইসরাফিল (৩), সমসপুরের গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), ঝিনাইদহ শৈলকুপা থানার কাচেরকোল খন্দকবাড়িয়ার নুরুজ্জামানের মেয়ে আরমান (৭ মাস), গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার আমতলী নোয়াধা এলাকার মৃত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী মুক্তা খানম (৩৮), দিনাজপুরের পার্বতীপুর থানার পলাশবাড়ী মথুয়ারা মৃত নুর ইসলামের স্ত্রী নাছিমা (৪০) এবং ঢাকার আশুলিয়া থানার বাগধুনিয়া পালপাড়ার মো: নুরুজ্জামানের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সুমা (৩০)।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয়দের সহায়তায় আটজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও পাঁচজন নারী। তবে হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক দুই নারীকে মৃত ঘোষণা করেন।

উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ও ১০ জন ডুবুরি অংশ নেন। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিআইডব্লিউটিএ, কোস্টগার্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের সদস্যরাও যৌথভাবে উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণ করেন।

জাবি শিক্ষার্থী রাইয়ানের লাশ উদ্ধার

জাবি প্রতিনিধি জানান, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবির ঘটনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অর্থনীতি বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ানের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল সকালে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে তার লাশ শনাক্ত করা হয়। দুর্ঘটনার সময় একই বাসে রাইয়ানের মা, বড় বোন ও ভাগ্নেও যাত্রী ছিলেন। এর আগে বুধবার তার মায়ের লাশ উদ্ধার করা হয় এবং গুরুতর আহত অবস্থায় বড় বোন ডা: সাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

জানা যায়, দুর্ঘটনার পর থেকে রাইয়ান ও তার ভাগ্নে দীর্ঘ সময় নিখোঁজ ছিলেন। বুধবার দিনগত গভীর রাতে বাসটি উদ্ধার করা হলে তার ভেতর তাদের লাশ পাওয়া যায়।

রাইয়ানের মামা আওয়াল আনোয়ার জানান, বুধবার বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার সময় হুড়োহুড়ির মধ্যে কোনোভাবে ভেতর থেকে বের হতে পারেন ডা: সাবা। তবে রাইয়ান, তার মা এবং ছোট্ট ভাগ্নে বের হতে পারেননি।

সিআরপি থেরাপিস্ট মা ও ছেলের লাশ উদ্ধার

সাভার (ঢাকা) জানান, সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রের (সিআরপি) সিনিয়র অকুপেশনাল থেরাপিস্ট আয়েশা আক্তার সোমা এবং তার ৮ মাস বয়সের ছেলে আরসানের লাশ পদ্মা নদীর পৃথক স্থান থেকে ডুবুরী দল উদ্ধার করেছে। পরে গতকাল দুপুরে সাভারের গকুলনগরে মা-ছেলেকে নামাজে জানাজা শেষে দাফন করা হয়। এর আগে বুধবার দিনগত রাত ১২টার সময় মা ও বৃহস্পতিবার ভোর ৪টার সময় ছেলের লাশ উদ্ধার করা হয়।

কুষ্টিয়ার নিহত তিনজনের দাফন একজনের শেষকৃত্য সম্পন্ন

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী বাসডুবির ঘটনায় কুষ্টিয়ার নিহত চারজনের মধ্যে তিনজনের দাফন ও একজনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। পরিবারগুলোতে চলছে শোকের মাতম। এলাকাবাসী শোকে বিহ্বল। দুর্ঘটনায় কুষ্টিয়ার নিহতরা হলেন- কুষ্টিয়া পৌরসভার মজমপুর গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), খোকসা উপজেলার সমসপুর গ্রামের গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা বিনতে গিয়াস (১৩), ইউনিয়নের ধুশুন্ডি গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইসরাফিল (৩) এবং একই উপজেলার বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের খাগড়বাড়িয়ার হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮)। কুষ্টিয়া সদরের জুগিয়ায় নিজ গ্রামে মর্জিনার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টায় তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন করা হয়। খোকসায় সকাল সাড়ে ১০টায় উপজেলার সমসপুর গ্রামে আয়েশা বিনতে গিয়াসের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে একই এলাকার পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। বেলা ১১টায় সমসপুর ইউনিয়নের ধুশুন্ডি গ্রামে নিহত শিশু ইসরাফিলের নামাজে জানাজা শেষে দাফন করা হয়। অন্য দিকে বেলা দেড়টার দিকে বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের খাগড়বাড়িয়ার শৈলডাঙি মহাশ্মশানে রাজীব বিশ্বাসের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।