বিশেষ সংবাদদাতা
২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক দখলের সময় এস আলমের বেনামী কোম্পানি জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে ছিলেন আজকের রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন। তিনি ওই সময় এস আলমের লুটের সহযোগী ছিলেন। এ কারণে আজকে তার থাকার কথা ছিল জেলে; কিন্তু আছেন বঙ্গভবনে। এ নিয়ে জাতি হিসেবে আমরা আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন হতে পারি কি না, মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারি কি না, সে প্রশ্ন রেখে গেলাম।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার গতকাল ভয়েস ফর রিফর্ম আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন। রাজধানীর কাওরান বাজারে বিডিবিএল ভবনে আয়োজিত ‘সংশোধিত ব্যাংক রেজুলেশন আইন-২০২৬ : আবারা ঝুঁকির মুখে ব্যাংকিং খাত’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর। বৈঠকে দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার কঠোর ভাষায় ব্যাংক খাতের অনিয়ম ও জবাবদিহিতার অভাবের সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে ব্যাংক দখল ও আর্থিক অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত না করে বরং তাদের বিভিন্নভাবে পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে, যা জাতির আত্মমর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তোলে। তিনি আরো বলেন, ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য পদ্ধতিগত সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে বেনামী ঋণ নিয়ে অর্থপাচার বন্ধে ক্যাশলেস লেনদেন বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংককে কার্যকরভাবে স্বাধীন করতে পারলে অনেক অনিয়ম প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো।
বৈঠকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, দেশে আইনের অভাব নেই; কিন্তু তার বাস্তবায়ন নেই। তার ভাষায়, ‘অনেকসময় নতুন আইন প্রণয়ন করা হয় অপরাধীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য নয়; বরং তাদের রক্ষার জন্য।’ তিনি অভিযোগ করেন, ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬-এও সেই প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তিনি আমানতকারীদের স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বলেন, প্রতিটি তফসিলি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত হওয়ায় আমানতকারীদের পুরো অর্থ ফেরত দেয়ার দায় রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। শুধু আমানত বীমার সীমা (বর্তমানে দুই লাখ টাকা) দিয়ে দায় শেষ করা যায় না। ‘গ্রাহকের সম্পূর্ণ আমানত ফেরত নিশ্চিত করা বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনি দায়িত্ব’Ñ এমন মন্তব্য করেন তিনি।
ড. তৌফিক চৌধুরী আরো বলেন, দেশে এখনো কার্যকর কোনো ‘এক্সিট পলিসি’ নেই, যার মাধ্যমে লোকসানি ব্যাংকগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে বাজার থেকে বের করে আনা যায়। উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের নীতিমালা থাকলেও বাংলাদেশে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে প্রায়ই রাষ্ট্রীয় অর্থসহায়তা দেয়া হয়, যার চাপ শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর পড়ে। খেলাপি ঋণের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের মধ্যে পার্থক্য না করে একই ধরনের সুবিধা দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বারবার ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়ায় ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। ‘অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত না হলে কোনো আইন কার্যকর হবে না’Ñ বলেন তিনি।
বৈঠকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮(ক) ধারা নিয়ে গুরুতর আইনি অসঙ্গতির অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, আইনটি ব্যাংক খাতের সংস্কারের লক্ষ্যকে দুর্বল করেছে। বিশেষ করে ১০ বছর আগে শেয়ার হারানো বিনিয়োগকারীদের পুনরায় মালিকানায় ফেরার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৭ সালে জোরপূর্বক শেয়ার হস্তান্তরের অভিযোগ থাকা ঘটনাগুলোরও কোনো প্রতিকার আইনে নেই। তার ভাষায়, এটি একটি ‘নিম্নমানের চালাকি’, যা বিতর্কিত শেয়ার দখলকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেয়। এতে ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের সোয়াস-এর অধ্যাপক ড. মুশতাক খান ব্যাংক খাতের আন্তঃসংযুক্তির বিষয়টি তুলে ধরে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, কোনো একটি ব্যাংক হঠাৎ বন্ধ করে দিলে তার প্রভাব অন্য ব্যাংকেও পড়তে পারে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ব্যাংক লুটেরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আবারো ‘ব্যাংক রান’-এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিক ও প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন মাসুম আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাংক খাত সংস্কারে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছেÑ কোথাও দুর্বল ব্যাংক বন্ধ করা হয়েছে, কোথাও একীভূত করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একাধিক দুর্বল ব্যাংককে একত্র করে সমস্যার সমাধান করা কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে যখন ঋণ নিয়ে পাচারের মতো জটিল সমস্যা বিদ্যমান।
বৈঠকে আরো বক্তব্য রাখেন, রাজনীতিবিদ সারোয়ার তুষার, সিএফএ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আসিফ খান এবং ব্যবসায়ী শামস মাহমুদ। তারা সবাই একমত হন যে, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; বরং তার কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।



