ভূমিকম্প ঝুঁঁকি কমাতে ত্রুটিপূর্ণ ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে : রাজউক চেয়ারম্যান

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভূমিকম্পের ঝুঁঁকি কমাতে রাজধানীর ভবনগুলোর ত্রুটি চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো: রিয়াজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ভূমিকম্পে ভবন ধসে পড়ার প্রধান কারণ শুধু ভবনের উচ্চতা নয়, বরং ত্রুটিপূর্ণ নকশা, মাটির অবস্থা ও নির্মাণে অনিয়ম। তাই ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা, মাটি পরীক্ষা এবং প্রকৌশলগত মান নিশ্চিত করা জরুরি।

গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) আয়োজিত ‘ভূমিকম্প ঝুঁঁকিতে দেশ : আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী হাসান আনসারী।

রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক ভবন রয়েছে। এসব ভবনের ঝুঁঁকি একসাথে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। তাই ধাপে ধাপে র‌্যাপিড ভিজ্যুয়াল অ্যাসেসমেন্ট, প্রিলিমিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট এবং ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ভূমিকম্প মোকাবেলায় রাজউকের সক্ষমতা বাড়াতে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ভূমিকম্পের আগে ঝুঁঁকি নিরূপণ ও সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় গবেষণাও করা হবে।

তিনি আরো বলেন, ‘ভূমিকম্পের ঝুঁঁকি কমাতে শুধু রাজউককে দায়ী করলে হবে না। সিটি করপোরেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’ একটি কার্যকর সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা থাকলে নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কাজ আরো সহজ ও সমন্বিতভাবে করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভবন নির্মাণে অনিয়ম প্রসঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, অনুমোদিত ছয়তলা ভবনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১০ তলা করা কিংবা নকশা পরিবর্তন করে নির্মাণের সুযোগ দেয়া হবে না। এ ধরনের ভবনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আইনি যাচাই ছাড়া অনুমোদন দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।

তিনি আরো বলেন, ভবনের নকশা প্রণয়নকারী স্থপতি ও প্রকৌশলীদেরও তাদের দায়িত্ব নিতে হবে। নকশায় স্বাক্ষর করার পাশাপাশি নির্মাণকাজের বাস্তবায়ন ও তদারকিতেও তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। অনিয়ম হলে তাদেরও আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মো: আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ভবন নির্মাণের ঝুঁঁকি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে নিয়মিত ভূমিকা রাখতে হবে। প্রকৌশলী ও তদারকি সংস্থাগুলোকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে সততা ও দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের স্বার্থ ও জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ডেভেলপারদের সহযোগিতা করতে হবে। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ভবনের নকশা ও নির্মাণ নিশ্চিত করা গেলে টেকসই ও নিরাপদ ভবন নির্মাণ সম্ভব।

আব্দুর রাজ্জাক আরো বলেন, ব্যবসায়িক স্বার্থের পাশাপাশি রাষ্ট্র, সমাজ ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে ভবন নির্মাণ খাতকে আরো নিরাপদ ও জনবান্ধব করার আহ্বান জানান তিনি।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁঁকি শুধু ভবনের নকশা বা নির্মাণ মানের ওপর নির্ভর করে না; ভবনটি কোথায় এবং কী ধরনের মাটির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল ও জলাভূমি এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প ভূমিকম্পের ঝুঁঁকি আরো বাড়িয়ে দেয়।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ঢাকায় অনুমোদিত ভবনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণের বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁঁকিপূর্ণ। রাজউকের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কোথাও কোথাও ছয়তলা অনুমোদন নিয়ে ১০ তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এসব ভবন চিহ্নিত করে দ্রুত পরিদর্শনের জন্য রাজউক চেয়ারম্যানের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক সালেহ উদ্দিন বলেন, ভূমিকম্প মোকাবেলায় কোনো একক সংস্থার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়; সমন্বিতভাবে সব স্টেকহোল্ডারকে প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, ভূমিকম্পের পর উদ্ধার কার্যক্রম দ্রুত পরিচালনায় ফায়ার সার্ভিসের কিছু প্রস্তুতি রয়েছে। ঢাকার আশপাশের ৪১টি ফায়ার স্টেশনকে এয়ারমার্ক করা হয়েছে এবং বিশেষ রেসপন্স টিমও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে এসব প্রস্তুতি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান।

সালেহ উদ্দিন আরও বলেন, ভূমিকম্পে মানুষ সরাসরি মারা যায় না, বরং ভবন ও স্থাপনা ধসে পড়েই প্রাণহানি ঘটে। তাই ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও সংশ্লিষ্ট আইন মেনে চলার পাশাপাশি ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, কমিউনিটি ও জাতীয় পর্যায়ে আগাম প্রস্তুতি নেয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন, ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডুরা) সভাপতি শাহজাহান মোল্লা। অনুষ্ঠানে সঞ্চালনায় ছিলেন ডুরার সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ডুরার সহ-সভাপতি জিলানী মিলটন, যুগ্ম সম্পাদক একলাছ হকসহ অন্যান্য নেতা।