সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে পার্বত্য চট্টগ্রামে হাজার হাজার মানুষ যখন চরম মানবিক সঙ্কটে দিন কাটাচ্ছে, তখন ত্রাণ নিয়ে মাঠে সবচেয়ে সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। কাগজে-কলমে এই বাহিনীর জন্য বরাদ্দ মাত্র চার হাজার মেট্রিক টন চাল; অথচ ভারত-প্রত্যাগত শরণার্থী পুনর্বাসন, গুচ্ছগ্রাম কর্মসূচি ও জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) তালিকাভুক্ত সদস্যদের পুনর্বাসনে বরাদ্দ রয়েছে হাজার হাজার মেট্রিক টন চাল আর কোটি কোটি টাকা।
এই বৈপরীত্য থেকেই জন্ম নিয়েছে একটি সহজ অথচ কঠিন প্রশ্ন; প্রতি বছর পার্বত্য চট্টগ্রামের নামে যে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হয়, দুর্যোগের সময় সেই অর্থ আসলে যায় কোথায়?
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একটি সরকারি নথি অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় বিভিন্ন খাতে মোট ৫৬ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন চাল এবং আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারত-প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ প্রায় ৭৪ হাজার ৮৮৮ মেট্রিক টন চাল ও ৬৫ লাখ টাকা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের জন্য প্রতি বছর বরাদ্দ হয় এক হাজার ৩৭৫ মেট্রিক টন চাল ও ৫০ লাখ টাকা। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলছেন, এই বরাদ্দের ব্যয়ের হিসাব জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত কি না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের জনসংযোগ কর্মকর্তা বিমল কান্তি চাকমার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত চাল ও অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় হয়েছে তার বিস্তারিত হিসাব আমার কাছে নেই। এটি যারা বণ্টন করেন তারা জানবেন। তবে সবকিছু নিয়ম মেনেই বণ্টন করা হয়।
একইভাবে জেএসএস তালিকাভুক্ত সদস্যদের খাদ্য পুনর্বাসন কর্মসূচির নামে প্রতি বছর বরাদ্দ হয় ২ হাজার ৩৫৯ দশমিক ৮ মেট্রিক টন চাল। অভিযোগ উঠেছে, জেলা প্রশাসন, পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের কিছু কর্মকর্তার দুর্নীতির কারণে সরকারের বরাদ্দ প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। খাদ্যশস্য উত্তোলনের সময় টনপ্রতি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও শোনা যায়। পাশাপাশি একাধিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর্থিক বা খাদ্যশস্য সহায়তার জন্য আবেদন করেও কাক্সিক্ষত সাড়া পায়নি।
গত জুন মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল কফি ও কাজুবাদাম চাষ প্রকল্পে অনিয়ম নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
স্থানীয় পর্যায়ে অনেকের পরামর্শ, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের নামে খাদ্যশস্য বা অর্থ বরাদ্দ সরাসরি না দিয়ে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে প্রদান করা হলে অনিয়ম অনেকাংশে কমতে পারে। ব্যক্তিবিশেষের নামে প্রকল্প বরাদ্দ বন্ধ রাখার প্রস্তাবও এসেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ কারো বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নয়, চাইছেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি; কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ প্রকৃতপক্ষে কাদের কাছে পৌঁছায়, আর দুর্যোগের সময় তা কাদের ভাগ্যে জোটে, সে হিসাব জানার অধিকার তাদের আছে। এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পেতে হলে পূর্ববর্তী বরাদ্দগুলোর একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি এখন জোরালো হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান নয়া দিগন্তকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারি বরাদ্দ নয়-ছয় করার অভিযোগ অত্যন্ত পুরনো। আমরা জানি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে জনকলাণমূলক কাজ করে আসছে। সেনাবাহিনী অত্যন্ত সুশৃঙ্খল সংস্থা। এই বাহিনীর মাধ্যমে ত্রাণ ও পুনর্বাসন খাতে বরাদ্দ দেয়া হলে তা সুষম বণ্টন হবে।



