যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি কার্যকরে বছরে ১৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হবে ষ বাজেট প্রণয়নে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা থেকে সরে আসা উচিত
বিশেষ সংবাদদাতা
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এমন একটা সময় প্রণীত হচ্ছে যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই পরিস্থিতি সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত করার ওপর জোর দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা খাত শক্তিশালী করা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলা এবং কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে বছরে সরকারের প্রায় এক হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাব উপস্থাপনায় এই কথাগুলো বলেন ড. ফাহমিদা খাতুন। এতে উপস্থিত ছিলেন, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রমুখ।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের ধীরগতি, বাজেট বাস্তবায়নে দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, নি¤œ বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, আর্থিক খাতের সমস্যা এবং রফতানি প্রবৃদ্ধির শ্লথগতির মতো বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি। পাশাপাশি আগামী দিনে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণের বিষয়টিও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে রয়েছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সামষ্টিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা। এ জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় রাখা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নের সময় দরিদ্র, প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরুক্ষা নিশ্চিত করা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে ত্বরান্বিত করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অর্থনীতি নানা ঝুঁকিতে
বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতি তুলে ধরে ড. ফাহমিদা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতসহ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারকদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এর জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় রাখা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে লক্ষ্যভিত্তিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করে সিপিডি। তিনি বলেন, নতুন সরকারের জন্য এই বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এর মাধ্যমে তারা নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সূচনা করতে পারে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতার ক্ষেত্রে কার্যকর নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে পারে। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরো স্থিতিশীল, টেকসই ও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।
জ্বালানি তেলের মূল্য
সিপিডি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ইরানের যুদ্ধের মধ্যে তেল-গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বিঘিœত হচ্ছে। তাতে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তবে দেশের জ্বালানি তেলের নিয়ন্ত্রণে সরকারের হাতে কিছু সুযোগ আছে।
বৈদেশিক বাণিজ্য চুক্তি
উপস্থাপনায় ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ শীর্ষক একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। এ ছাড়া আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরো দুই হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ার কথা রয়েছে। তিনি বলেন, এসব পণ্য থেকে সরকারের বছরে প্রায় এক হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব আসে। চুক্তি কার্যকর হলে সরকার এই রাজস্ব আয় হারাতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেয়া ডব্লিউটিও নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এর ফলে ডব্লিউটিওর আওতাভুক্ত অন্যান্য সদস্য দেশকেও একই সুবিধা দেয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
ড. ফাহমিদা খাতুন আরো বলেন, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কেনার শর্ত থাকায় সরকারের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এ কারণে চুক্তিটির রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের ওপর প্রভাব সরকারকে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করা দরকার।
এ বিষয়ে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, এই চুক্তির বিষয়বস্তু উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। কারণ এতে বেশ কিছু আর্থিক ঝুঁকির বিষয় রয়েছে। তিনি বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের বড় অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বেসরকারি খাতকে যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে উৎসাহিত করতে হয়, তা হলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে। না হলে তারা কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই পণ্য আমদানি করবে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। এ ছাড়া তৃতীয় কোনো দেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, কোথা থেকে পণ্য কেনা যাবে বা যাবে না, এ ধরনের বিষয়ও এতে জড়িত, যা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও প্রভাব ফেলতে পারে।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পর এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ চাইলে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে।
বাজেট প্রণয়নে সরকারের করণীয়
বাজেট প্রণয়ন নিয়ে ড. ফাহমিদা বলেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ থেকে সরকারের সরে আসা উচিত। কারণ চলতি অর্থবছরেও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে চলতি অর্থবছরে এই অনুপাত প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশে রয়েছে। ফলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সংস্কার প্রয়োজন।
এডিপিতে রাজনৈতিক প্রকল্প বাদ
তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমাতে হবে এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন না দেয়া উচিত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এডিপি থেকে অনুৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড অপসারণের অনুশীলন শুরু করে। বর্তমান সরকারের এটি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। সরকারকে সব বিদেশী অর্থায়নে পরিচালিত এডিপি প্রকল্প বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিবেচনায় নিয়ে প্রায় সমাপ্ত প্রকল্পগুলো অর্থাৎ ৮৫ শতাংশ বা তার বেশি বাস্তবায়ন হার প্রকল্পগুলো দ্রুত সমাপ্ত করা।
যেসব প্রকল্প ২৬ জুনে ১০% শতাংশ বা তার কম বাস্তবায়ন হারে শেষ হবে তাদের অগ্রাধিকার বঞ্চিত করতে হবে। সরকারকে সব বড় প্রকল্পের জন্য ব্যয়-লাভ বিশ্লেষণ, সংসদীয় তদারকি এবং স্বচ্ছ নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুসরণ করতে হবে।
চলতি বাজেটের পর্যালোচনা
চলতি বাজেটের পর্যালোচনায় ড. ফাহমিদা বলেন, রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ১৪.৯ শতাংশ। এখানে রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকা। কর আদয়ের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা হলো ৩৪.৫ শতাংশ। ফলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ৫৯.৪ শতাংশ আদায়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, যা অসম্ভব ব্যাপার। তিনি বলেন, এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটা ধীরগতি। সরকারের খরচে একটা সংযত আচরণ দেখা গেছে। জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপির বাস্তবায়ন হার মাত্র ২০.৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। তুলনামূলকভাবে গত অর্থবছর এই হার ছিল ২০.৮ শতাংশ। তিনি বলেন, দুর্বল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা, অতিরিক্ত মূলধন নির্ভর উন্নয়ন প্রকল্পের কারণেই এডিপি বাস্তবায়নের এই ধীরগতি।
ফাহমিদা বলছেন, বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে সরকারের ব্যাংক নির্ভরশীলতা বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে সরকার ঘাটতি অর্থায়নের জন্য ব্যাংক থেকে ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। আর গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকার উল্টো ব্যাংকগুলোকে ১০ হাজার কোটি টাকা ফেরত দিয়েছিল। আবার ব্যাংকবহির্ভূত খাত ও বৈদেশিক খাত থেকে ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ব্যাংক ব্যবস্থাপনা থেকে এই ঋণ গ্রহণের প্রবণতা একটা ঝুঁকি সৃষ্টি করে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকেও সঙ্কুচিত করে। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপ ক্রমান্বয়ে চলছেই। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ৯ শতাংশের নিচে ছিল। এখন মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সঙ্কট বাড়তে থাকে তা হলে জ্বালানি সরবরাহে বিঘœ ঘটলে মূল্যস্ফীতির উপর চাপ সৃষ্টি হবে। কারণ আমরা জ্বালানি আমদানি করে থাকি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের কথা বলা হয়েছে, যা রাখা কঠিন হবে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে রফতানি আয় ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে, বিপরীতে জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।



