নিত্যপণ্যের অগ্নিমূল্যে অস্বস্তিতে মানুষ

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নাভিশ্বাস সৃষ্টি করেছে। বিগত ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালেও এই সঙ্কট আরো ঘনীভূত হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (ইইঝ) এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (ঞঈই) তথ্যানুযায়ী, যদিও খাদ্য মূল্যস্ফীতি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সর্বোচ্চ ১৪.১০ শতাংশ থেকে কিছুটা কমে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৯.৩০ শতাংশে নেমেছে, তবুও এর ইতিবাচক প্রভাব খুচরা বাজারে অনুপস্থিত। বর্তমানে বাজার পরিস্থিতি সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দুই বছরের ব্যবধানে চাল, ডাল, তেল ও সবজির মতো মৌলিক পণ্যের দাম গড়ে ১০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে যে সরু চাল প্রতি কেজি ৭০-৮০ টাকায় পাওয়া যেত, ২০২৬ সালের বর্তমান বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৭৫-৯০ টাকায়।

সবজি ব্যবসায়ী সুমনের ভাষ্যমতে, বর্তমানে বাজারে মালের সরবরাহ ও দাম কিছুটা চড়া। আলুর দাম কম হলেও বেগুন ৭০ টাকা কেজি, মুলা ও শিম ৬০ টাকা কেজি, চিচিঙ্গা ১০০ টাকা, পটোল ও করলা ১০০ টাকা কেজি, ঢ্যাঁড়স ৮০ টাকা কেজি, লাউ ৬০-৭০ টাকা পিস। তিনি আরো জানান, মূলত চৈত্র মাস হওয়ার কারণেই সবজির দাম এখন কিছুটা বেশি। তবে আশা করা যাচ্ছে কিছুদিন পর পটোল ও চিচিঙ্গার মতো সবজিগুলোর দাম কমে আসবে।

দ্রব্যমূল্যের এই লাগামহীন দৌড়ে সবচেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে নি¤œ আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসী জনগোষ্ঠী। যেখানে একজন দিনমজুর বা রিকশাচালকের দৈনিক গড় আয় ৫০০-৭০০ টাকা, সেখানে আয়ের বেশির ভাগই চলে যাচ্ছে চাল ও সবজির পেছনে। খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যে পরিবারটি পাতে মাছ বা ডিম রাখতে পারত, ২০২৬ সালে তাদের পাতে এখন কেবল সবজি, ডাল আর আলুভর্তাই প্রধান খাদ্য।

গৃহপরিচারিকা ও শ্রমিক শ্রেণীর মানুষরা ঘরভাড়া ও খাবারের খরচ মেটাতে গিয়ে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের এক ঋণের দুষ্টচক্রে বন্দী করে ফেলছে।

সঙ্কটের নেপথ্যে

অর্থনীতিবিদ ও বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কাঠামোগত ও বৈশ্বিক কারণ দায়ী। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (ঈচউ)- প্রতিবেদন অনুযায়ী, সঙ্কটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য। জ্বালানি সঙ্কটের কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে প্রতিটি পণ্যের দাম ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, ডলারের উচ্চ বিনিময় হার আমদানি ব্যয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, টাকার অবমূল্যায়নের ফলে ভোজ্যতেল ও ডালের মতো আমদানিনির্ভর পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারদর কমলেও স্থানীয় বাজারে তার সুফল মিলছে না। এ ছাড়া সার, বীজ ও সেচের জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ গত দুই বছরে ১২-১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে বিআইডিএস (ইওউঝ)।

রিয়াজ পেশায় একজন ফার্নিচার শ্রমিক। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে এসে তিনি নিজের অসহায়ত্বের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘গত মাসে যে গ্যাস সিলিন্ডার ১৬৫০ টাকায় কিনেছিলাম, তা এখন ১৯৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। সবজির দামও আকাশছোঁয়া। প্রতি কেজি করলা ১০০ টাকা, বেগুন ৭০ টাকা এবং কাঁচামরিচ ১০০ টাকা। মাছের বাজারে গিয়ে ১৮০ টাকা দরে পাঙ্গাশ মাছ কিনতে হয়েছে। আয়ের তুলনায় ব্যয়ের এই লাগামহীন বৃদ্ধিতে সন্তানদের পড়াশোনা ও অন্যান্য খরচ মেটাতে আমি হিমশিম খাচ্ছি।’

বাজারে এক হাতে পুঁইশাকের ডাঁটা নিয়ে দাঁড়িয়ে চিংড়ি মাছের দামাদামি করছিলেন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন। দীর্ঘক্ষণ দরদামের পর ১০০০ টাকা কেজি দরে মাত্র ২৫০ গ্রাম চিংড়ি কেনেন তিনি। বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। ৬০০-৭০০ টাকার চিংড়ি এখন ১০০০ টাকা। আগে যে টাকায় দু’জনের সংসার স্বচ্ছন্দে চলে যেত, এখন সেই টাকায় একা চলাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রুই-কাতলের কেজি ৩০০ টাকার বেশি, চাষের পাবদা ৪০০, শোল ৮০০ টাকা কেজি। ঈদের পরও কমেনি ব্রয়লার মুরগির দাম।

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বাজার সিন্ডিকেট’ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এই কৃত্রিম সঙ্কটের অন্যতম কারণ। একটি পণ্য কৃষকের হাত থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে ৪-৫টি স্তর পার হয়, যেখানে প্রতিটি স্তরে অস্বাভাবিক মুনাফা লাভের চেষ্টা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।

স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির আশঙ্কা

এদিকে দেশের পুষ্টিবিদগণ মনে করেন, খাদ্যের তালিকা থেকে প্রোটিন বাদ পড়ার ফলে বস্তি এলাকার শিশু ও গর্ভবতী মায়েরা চরম অপুষ্টির শিকার হচ্ছেন। এটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে। অন্যদিকে, জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে না পেরে অনেক দরিদ্র পরিবার তাদের সন্তানদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে কাজে পাঠিয়ে দিচ্ছে, যা দেশে শিশুশ্রম বৃদ্ধির আশঙ্কাকে আরো জোরালো করছে।

বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি এখন চাহিদার চেয়ে সরবরাহব্যবস্থার ত্রুটির কারণে বেশি হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, কেবল শুল্ক ছাড় দিয়ে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাজার সিন্ডিকেট দমনে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সরবরাহ চেইনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

তিনি উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি কেবল একটি অর্থনৈতিক সঙ্কট নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকারের ওপর এক বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের সময়োচিত ও কঠোর পদক্ষেপই পারে সাধারণ মানুষের ঘরে দু’বেলা অন্নের নিশ্চয়তা ফিরিয়ে দিতে।