ইরানের সাথে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চলমান ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে পড়ে মধ্যেপ্রাচ্যের সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে এখন পর্যন্ত মোট সাতজন বাংলাদেশী কর্মী নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে চারজনের লাশ কূটনৈতিক তৎপরতায় দেশে আনা হলেও বাকিদের লাশ এখনো ওই সব দেশের হাসপাতাল মর্গের মরচুয়ারিতে পড়ে আছে। এসব ঘটনায় (মিসাইল ও ড্রোন হামলায়) যেসব বাংলাদেশী কর্মী আহত হয়েছেন, তাদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে তাদের সার্বক্ষণিক খোঁজখবরও নেয়া হচ্ছে।
সর্বশেষ গতকাল সোমবার সকাল ৯টায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অগ্নিদদ্ধ হয়ে সৌদি আরবে নিহত বাংলাদেশী কর্মী আব্দুল্লাহ আল মামুনের লাশ সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী উপস্থিত থেকে তার লাশ গ্রহণ করেন। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সদ্য যোগদান করা সচিব মো: মোখতার আহমেদ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব আসাদ আলম সিয়াম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (কনস্যুলার ও ওয়েলফেয়ার) দেওয়ান আলী আশরাফ এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. এ টি এম মাহবুব উল করিম।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সাতজন প্রবাসী কর্মীর মারা যাওয়ার খবর আমাদের কাছে এসেছে। এর মধ্যে চারজনের লাশ গ্রহণ করেছি। আর একজনের লাশ পরিবারের সম্মতিতে সৌদি আরবেই দাফন করা হয়েছে। নিহতদের পরিবারকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পক্ষ থেকে দাফনকার্যের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং ৫০ হাজার টাকা তাৎক্ষণিকভাবে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আর্থিক সহায়তা হিসেবে তিন লাখ টাকা নিয়ম অনুযায়ী প্রদান করা হবে।
বিমানবন্দর ও মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে একজন বৈধ প্রবাসী বাংলাদেশী কর্মী মৃত্যুবরণ করলে তার দাফন ও লাশ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ড থেকে বিমান বন্দরেই ৩৫ হাজার টাকা নগদ দেয়া হয়। পরে তার ওয়ারিশদের চেকের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ বাবদ তিন লাখ টাকা প্রদান করার নিয়ম চালু আছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর প্রবাসী বাংলাদেশী মারা যাওয়ায় ওই সব কর্মীর ক্ষেত্রে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ একজন কর্মীর স্বজনের কাছে বিমানবন্দরে অতিরিক্ত আরো ৫০ হাজার টাকা নগদ দেয়া হচ্ছে। এই টাকা দেয়ার বিষয়ে নিহতের স্বজন, সহকর্মী ও ভুক্তভোগীরা বলছেন যুদ্ধে নিহত একজন কর্মীর লাশের দাম কি মাত্র ৫০ হাজার টাকা? আমাদের তো সব শেষ হয়েই গেলো। সরকারের এ বিষয়ে আরো কিছু করা উচিত বলে তারা মনে করছেন।
গতকাল কুয়েত থেকে একজন প্রবাসী বাংলাদেশী নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার নিহত প্রবাসীর পরিবারকে যে ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত সহায়তা দিচ্ছেন সেটা দিয়ে তার পরিবারের তো কিচ্ছুই হবে না। রাষ্ট্রীয়ভাবে তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো উচিত বলে আমি মনে করি। হয় তাদের একটা ব্যবসা করে দেয়া নয়তো কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয়া। নতুবা এই পরিবারটি ধ্বংস হয়ে যাবে। যদিও এটা একটা আপদকালীন মৃত্যু।
গতকাল বিকেলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. এ টি এম মাহবুব উল করিমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, বিদেশে একজন কর্মী মারা গেলে তার দাফন বাবদ ৩৫ হাজার টাকা বিমানবন্দরেই দেয়া হয়। বৈধ হলে (ডকুমেন্টেড) তার পরিবারকে তিন লাখ টাকা দেয়া হয়। এটাই নিয়ম। যুদ্ধে নিহত কর্মীকে এবার ওই টাকার সাথে আরো অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা দেয়া হচ্ছে। এই টাকা (৫০ হাজার) আগে দেয়া হতো না। তিনি বলেন, যুদ্ধকালীন ২০২৩ সালের আমাদের বিধিতে বলা আছে, যুদ্ধ, মহামারী, কোম্পানি লে-অফ হলে সে ক্ষেত্রে ডকুমেন্টটেড হোক আর আন ডকুমেনটেড হোক, আমরা যুদ্ধকালীন এলাকা থেকে আমাদের খরচে লাশ দেশে নিয়ে আসব। পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব থেকে টাকাটা আমাদেকে ফেরত দেবে। আমাদের এই টাকাটা হচ্ছে, যে সব প্রবাসী সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সদস্য হন, এটা তাদের টাকা। রাজস্বের কোনো টাকা এখানে নেই। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সরকার যেটা করতে পারে, রাজস্ব থেকে বা অর্থ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বা অন্য কোনোভাবে সহায়তা আরো করতে পারেন কিনা।
যুদ্ধকালীন সময়ে শ্রমিকরা যে মারা যাচ্ছেন তার জন্য ওই দেশের সরকার কি আইনিভাবে কোনো ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক নয়া দিগন্তকে বলেন, মিডলইস্টে আমাদের ১০টি দেশে ২২টি ল’ ফার্ম আছে। আমরা যেটা করি যিনি মারা যান তার মৃত্যুর পর আমরা সেই ল’ফার্মের মাধ্যমে চুক্তি অনুযায়ী যেমন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে এটা পাবে, কর্মীর অঙ্গহানি হলে এটা পাবে বা যুদ্ধকালীন সময়ে মারা গেলে এমনটা ক্ষতিপূরণ পাবে, এরকম যদি কোনো আইনের কাভারেজ থাকে, ইন্স্যুরেন্স থাকে সেটা আমরা আদায় করে তার পরিবারের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করি। যারা ইতোমধ্যে যুদ্ধে মারা গেলেন সেখানে যদি এই ধরনের কোনো অপশন থাকে এই ব্যবস্থাটা আমরা নেবো। ওই দেশের আইন অনুযায়ী তার কোনো পাওনা হলে এটা আমরা তার পরিবারকে পৌঁছে দেবো। এটা আমরা সবসময় করি। এদের ক্ষেত্রে করবেন কিনা জানতে চাইলে ডিজি বলেন, এই মুহূর্তে নরমাল যোগাযোগ বা মুভমেন্টটা নাই। নরমাল হলে প্রত্যেকটা দেশে আমাদের যে লেবার উইং আছে সেখানে আমরা চিঠি দিয়ে বলব, তিনি যে যুদ্ধে মারা গেলেন ওই দেশের সরকারের পক্ষ থেকে, ইন্স্যুরেন্স বা ওই কর্মীর কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো সুযোগ-সুবিধা থাকলে তখন আমরা আদায় করার ব্যবস্থা করব।
গতকাল কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর এস এম সাইফুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমি গত ২ তারিখে চার্জ হ্যান্ডওভার করে দেশে চলে এসেছি। তাই এ ব্যাপারে আমার পক্ষে এ নিয়ে কথা বলার সুযোগ নাই।
লেবাননের বাংলাদেশ দূতাবাসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, লেবাননে তীব্র হামলার ঘটনা ঘটছে। আমার বাসা থেকেই হামলার ঘটনা দেখছি। ইতোমধ্যে ওইসব এলাকায় থাকা শ্রমিকদের আমরা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছি। এখন পর্যন্ত এখানে কোনো নিহতের ঘটনা ঘটেনি। তাই যুদ্ধকালীন মৃত্যুর বিষয়ে আমাদের পক্ষে কিছু বলারও সুযোগ নাই।
এবারের যুদ্ধে মিসাইল হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের ঝলমলে দেশ আরব আমিরাতে বাংলাদেশী শ্রমিক নিহত হয়েছেন। তার লাশ ইতোমধ্যে দেশেও এসেছে। এ বিষয়ে জানতে গতকাল দুবাই কনসাল জেনারেল অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আব্দুস সালামের সাথে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বিদেশগামী কর্মীদের নামে জমা হওয়া টাকার পরিমাণ ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। নতুন নিয়ম অনুযায়ী এই টাকা সরকারি ব্যাংক ও ট্রেজারি বন্ডে রয়েছে। এখান থেকে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক কয়েক দিন আগে ৫০০ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। এখন আবার তারা এক হাজার কোটি টাকার তহবিল জোগান দিতে চিঠি দিয়েছে। সব টাকা যদি তারাই নিয়ে যায় তাহলে আমরা আমাদের কার্যক্রম চালাব কিভাবে?
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে ৩৭ দিনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বেশির ভাগ কর্মীর দিন কাটছে আতঙ্কে। ইতোমধ্যে অনেকে দেশে ফিরে এসেছেন ভয়ে। আবার অনেকে ফ্লাইট না থাকায় আটকে আছেন বলে ওই দেশে আটকেপড়া প্রবাসীরা জানিয়েছেন।



