খেলাপি ঋণের অন্য ব্যাংকেও ‘হেয়ারকাট’ ও শেয়ারমূল্য শূন্যকরণ!

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি সঙ্কটগ্রস্ত ব্যাংকের একীভূতকরণ ও রেজোল্যুশন প্রক্রিয়ায় আমানতকারীদের মুনাফা স্থগিত, শেয়ারমূল্য কার্যত শূন্যে নামিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে ‘হেয়ারকাট’ নীতি প্রয়োগের ইঙ্গিত- এই সিদ্ধান্তগুলো ব্যাংক খাতে এক নতুন ও গভীর অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরেই খেলাপি ঋণ, স্বার্থান্বেষী পুনঃতফসিল, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ভারে নুয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি সঙ্কটগ্রস্ত ব্যাংকের একীভূতকরণ ও রেজোল্যুশন প্রক্রিয়ায় আমানতকারীদের মুনাফা স্থগিত, শেয়ারমূল্য কার্যত শূন্যে নামিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে ‘হেয়ারকাট’ নীতি প্রয়োগের ইঙ্গিত- এই সিদ্ধান্তগুলো ব্যাংক খাতে এক নতুন ও গভীর অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখন ঘুরপাক খাচ্ছে- এই নীতি কি কেবল কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যাংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি খেলাপি ঋণে জর্জরিত অন্য ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও পর্যায়ক্রমে একই নীতি প্রয়োগের পথে হাঁটছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক?

কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী বার্তা দিতে চাইছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত বা আলোচিত রেজোল্যুশন স্কিম অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক যদি প্রমাণিতভাবে দীর্ঘমেয়াদি লোকসানে থাকে এবং মূলধন ঘাটতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে স্বাভাবিক পুনরুদ্ধারের আর সুযোগ নেই, সে ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতির বোঝা বহন করবে। প্রয়োজনে শেয়ারমূল্য শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। পরবর্তী ধাপে নির্দিষ্ট শ্রেণীর দায়, বিশেষ করে বড় আমানত বা অনিরাপদ দায়ের ওপর ‘হেয়ারকাট’ আরোপের পথ খোলা থাকবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি স্পষ্ট- “ব্যাংক বাঁচাতে করদাতার অর্থই একমাত্র সমাধান হতে পারে না।” অর্থাৎ, রাষ্ট্র আর বারবার ব্যর্থ ব্যাংকের বোঝা বহন করবে না; ক্ষতির দায় বহন করতে হবে সংশ্লিষ্ট পক্ষদেরই।

কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই বার্তা যতটা না শৃঙ্খলা ফেরানোর, তার চেয়ে বেশি ব্যাংকিং খাতে ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে এমন একটি ব্যবস্থায়, যেখানে আমানতকারীরা দীর্ঘদিন ধরে ‘নিরাপদ সঞ্চয়’ ধারণার ওপর ভর করে ব্যাংকে টাকা রেখে এসেছেন।

এ নীতি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

ব্যাংকিং ও অর্থনীতির বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এই নীতি নিয়ে মতভেদ এখন স্পষ্ট বিভাজনে রূপ নিয়েছে। একপক্ষের অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, হেয়ারকাট ও শেয়ারমূল্য শূন্যকরণ নীতি নৈতিক ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হবে। দুর্বল ব্যাংকের মালিকদের জন্য এটি একটি পরিষ্কার বার্তা- “নো ফ্রি লাঞ্চ।” অর্থাৎ, রাজনৈতিক প্রভাব বা পুনঃতফসিলের আশ্রয়ে বারবার লুটপাটের সুযোগ আর থাকবে না।

তাদের যুক্তি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক রেজোল্যুশন কাঠামোতে ক্ষতির দায় বহনের একটি স্বীকৃত ক্রম রয়েছে- প্রথমে শেয়ারহোল্ডার, এরপর ঋণদাতা এবং সর্বশেষ পর্যায়ে বড় আমানতকারী। এই কাঠামো অনুসরণ না করলে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে না।

কিন্তু এই যুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে সমালোচকরা বলছেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ব্যাংক ব্যর্থতা কোনো বাজারগত দুর্ঘটনা নয়; এটি মূলত নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ফল। যেখানে ব্যাংক লুট হয়েছে অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট, প্রভাবশালী গ্রুপ এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ে, সেখানে ক্ষতির দায় আমানতকারীর ওপর চাপানো ন্যায্য হতে পারে না।

একজন সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যাদের চোখের সামনে বছরের পর বছর ব্যাংক লুট হয়েছে, যারা নিয়ম ভেঙে পুনঃতফসিল অনুমোদন দিয়েছে, তাদের দায় এড়িয়ে গিয়ে আমানতকারীর পকেটে হাত দেয়া হলে সেটাকে রেজোল্যুশন বলা যায় না- ওটা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি।”

আমানতকারীদের ক্ষোভ ও আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা : সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ সাধারণ আমানতকারীরা। বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে যারা নিরাপদ ও নৈতিক বিনিয়োগের আশায় অর্থ রেখেছিলেন। অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, প্রবাসী আয়নির্ভর পরিবার এবং ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছেন- কারণ তাদের বিকল্প আয়ের উৎস প্রায় নেই।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমানতকারীরা চাইলে হাইকোর্টে রিট আবেদন, সম্পত্তির সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং চুক্তিভঙ্গের মামলা করতে পারেন। তাদের মতে, যদি একাধিক ব্যাংকে একযোগে হেয়ারকাট আরোপ করা হয়, তাহলে তা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে নজিরবিহীন আইনি সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে।

একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর ভাষায়, “রাষ্ট্র যদি আমানতকে কার্যত অনিরাপদ করে তোলে, তাহলে তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সংবিধানিক প্রশ্নও হয়ে দাঁড়াবে।”

ব্যাংক লুটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন : সবচেয়ে বিতর্কিত ও অস্বস্তিকর প্রশ্নটি এখানেই- যেসব ব্যাংক আজ ‘খেলাপি আক্রান্ত’, তারা কি হঠাৎ করেই এই অবস্থায় পড়েছে? বাস্তবতা হলো, বছরের পর বছর বড় ঋণখেলাপিদের পুনঃতফসিল, একক গ্রুপে সীমাহীন ঋণ অনুমোদন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়া, সময়মতো অডিট না হওয়া এবং কার্যকর তদারকির ব্যর্থতা- সবকিছুই ঘটেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যক্ষ নজরদারির মধ্যেই।

সমালোচকদের বক্তব্য স্পষ্ট- “লুট হয়ে যাওয়ার পর হেয়ারকাট চাপানো সহজ, কিন্তু লুট ঠেকানোই ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আসল দায়িত্ব।”

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে- যারা ব্যাংক লুট করেছে, তারা কি আদৌ জবাবদিহির আওতায় এসেছে? নাকি শেষ পর্যন্ত দায় গিয়ে পড়ছে সেই আমানতকারীর ওপর, যিনি কোনো সিদ্ধান্তেই অংশ নেননি?

সামনে কী আশঙ্কা?

বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই নীতি একাধিক বড় ব্যাংকে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে কয়েকটি গুরুতর ঝুঁকি সামনে আসতে পারে। প্রথমত, ব্যাংকিং খাতে আস্থার বড় ধরনের সঙ্কট সৃষ্টি হবে। দ্বিতীয়ত. আমানত সরে গিয়ে নগদ ও অনানুষ্ঠানিক খাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। তৃতীয়ত. নির্বাচন-পূর্ব বা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ তীব্র হতে পারে।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা- এই নীতি যদি দৃষ্টান্তে পরিণত হয়, তাহলে সাধারণ আমানতকারীদের কাছে আর কোনো ব্যাংকই ‘নিরাপদ’ থাকবে না। প্রশ্ন উঠবে- আজ যে ব্যাংক, কাল কি আরেকটির পালা?

হেয়ারকাট ও শেয়ারমূল্য শূন্যকরণ নীতি কাগজে-কলমে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায়- যেখানে ব্যাংক লুট হয়েছে ক্ষমতার ছায়ায়, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে- সেখানে এই নীতির প্রয়োগ সংস্কারের চেয়ে শাস্তিতে রূপ নিচ্ছে আমানতকারীদের জন্য।

ব্যাংক খাত সত্যিকার অর্থে বাঁচাতে হলে শুধু রেজোল্যুশন নয়; প্রয়োজন প্রকৃত লুটেরাদের বিচারের আওতায় আনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা ও ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি, আমানতকারীর আস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া।

নচেৎ প্রশ্ন থেকেই যাবে- ব্যাংক বাঁচানো হচ্ছে নাকি ব্যাংক লুটের মূল্য শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করানো হচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই?