একটি কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য উচ্চাভিলাষী বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী। একে ‘কঠিন সময়’ বলার কারণ- সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি সূচক ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখন দুর্বলতার ছাপ স্পষ্ট। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি বেসরকারি খাত বর্তমানে নানা সঙ্কটে জর্জরিত। গত ১১ বছরের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা মাত্র ২২ শতাংশ। একই সাথে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও ইতিহাসের সর্বনি¤œ অবস্থানে পৌঁছেছে; মার্চ শেষে যা ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ।
রফতানি আয়েও শ্লথগতি দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের মে মাসে রফতানি কমেছে ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়ে মে মাসে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকিং খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। গত তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা। ফলে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অন্য দিকে বৈদেশিক ঋণ ছাড়ের ক্ষেত্রেও হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে। পুরো অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৪ শতাংশ ঋণ ছাড় হয়েছে। ৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ ছাড়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ পর্যন্ত ছাড় হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। রাজস্ব আহরণের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে।
তবে বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের দায় পুরোপুরি বর্তমান সরকারের কাঁধে চাপানো কঠিন। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল সুশাসন, আর্থিক খাতের অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাব অর্থনীতিকে বর্তমান অবস্থায় নিয়ে এসেছে। অর্থমন্ত্রী নিজেও বাজেট বক্তৃতায় অতীতের এসব দুর্বলতার কথা স্বীকার করেছেন। সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটকে অনেকেই উচ্চাভিলাষী হলেও সাহসী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
উত্তরাধিকার সূত্রে একটি দুর্বল অর্থনীতি পেয়েও অর্থমন্ত্রী বেশ কয়েকটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। বাজেটে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের স্বার্থ বিবেচনার চেষ্টাও লক্ষ করা যায়। যেমন-উচ্চ আয়ের শ্রেণীর বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়াতে শেষ মুহূর্তে সম্পদকর পুনর্বহাল করা হয়নি। একই সাথে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের ওপর নতুন কর আরোপ থেকেও বিরত থাকা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ‘আমাদের প্রস্তাবিত বাজেট হবে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল জীবন নিশ্চিতকরণে সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।’
জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চ লক্ষ্য
আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশের আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। ফলে এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধিকে ৬ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই লক্ষ্য অর্জনে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘদিন ধরে ঋণখেলাপি সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেয়া গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া। অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বলেছেন, ‘এদেশের কষ্টার্জিত অর্থসম্পদ দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় লুটেরাদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং বিদেশে পাচার হয়েছে।’ এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, তিনি সমস্যার উৎস সম্পর্কে অবগত।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ
বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে গত এক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রভাবও বাজারে পড়েছে। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতিকে ৮ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। তবে এর জন্য প্রয়োজন কঠোর মুদ্রানীতি, বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন।
বাজেটের কৌশলগত দর্শন ও বড় ঘাটতি
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে শুধু আকারের দিক থেকে বড় বাজেট বললে ভুল হবে। নাগরিক বাজেটে সরকারের তিন ধাপের একটি বিশেষ কৌশলগত দর্শন তুলে ধরা হয়েছে- পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা, পুনঃস্থাপন এবং পুনর্গঠন। অর্থাৎ তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখা দেয়া হয়েছে এই বাজেটে।
তবে এই রূপরেখা বাস্তবায়নে প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে মূল বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ছিল দুই লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা পরে সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে দুই লাখ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।
এই ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংকিং খাতের পরিবর্তে বৈদেশিক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে চায়। আগামী অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ থেকে ১,৫৫,৮৫০ কোটি পাওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। কিন্তু চলতি অর্থবছরেও বৈদেশিক সহায়তার উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়- প্রতিশ্রুত ঋণ সময়মতো পাওয়া যাবে কি না। বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফের সহায়তা প্রবাহের ওপর এ ক্ষেত্রে অনেক কিছু নির্ভর করবে।
ব্যাংকঋণের চাপ কি বাড়বে?
বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা, যা পরে বাড়িয়ে এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। বৈদেশিক ঋণ প্রত্যাশা অনুযায়ী না এলে ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা আরো বাড়তে পারে। এর ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা আলটিমেটলি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে চাপে ফেলতে পারে।
এই বাজেটের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বার্তা এবং বৈশিষ্ট্য হলো- এতদিনের প্রথাগত অবকাঠামোকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেল থেকে মানবসম্পদকেন্দ্রিক উন্নয়ন কৌশলে আংশিক স্থানান্তর। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক অবকাঠামো খাতে ব্যয়ের অংশ ও বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সাথে ডিজিটাল অর্থনীতি, স্টার্টআপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কৃষি আধুনিকায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে এখানে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, অর্থনীতির নড়বড়ে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এটি একটি উচ্চাভিলাষী ও রূপান্তরমূলক বাজেট। বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব ঘাটতির মতো বাস্তব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সরকার যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছে, তা অর্জিত হলে অর্থনীতি নিশ্চিতভাবেই পুনরুদ্ধারের পথে এগোবে।
তবে এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য শেষ পর্যন্ত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে- রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা, বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত করার দক্ষতা এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের কঠোর সংস্কার বাস্তবায়ন। এই তিন ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ না হলে, কাগজ-কলমের এই চমৎকার ও উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়ন করাই আগামী দিনে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হবে।



