প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বদলে যাচ্ছে ঢাকা। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে ধীরে ধীরে তার প্রভাব পড়েছে নগর সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং পরিবেশে। এতে করে শহরের উন্নয়নের সাথে বাড়ছে দূষণ, যানজট, জনসংখ্যার চাপ। অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, জলাশয় ভরাট ও সবুজায়ন ধ্বংসের প্রভাবে আবহাওয়ায় পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, পানির স্তর নিচে নামার সাথে পরিবর্তিত হয়েছে ঢাকার মানচিত্র।
একাধিক সংস্থার সমীক্ষা বলছে, বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা তিন কোটি ৬০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে শহরের ভেতরে যেমন চাপ বাড়ছে, তেমনি প্রান্তিক অঞ্চলের কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক সম্পদও হারিয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন ঢাকার মানচিত্র অনেকটা বদলে গেছে। ১৯৯৫ সাল থেকে ঢাকার সবুজ ও ফাঁকা জায়গা ৫২ দশমিক ৪৮ বর্গ কিলোমিটার থেকে কমতে কমতে এখন ২৯ দশমিক ৮৫ বর্গ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ গত আড়াই যুগে সবুজ ও ফাঁকা জায়গা কমেছে ২২ দশমিক ৬৩ বর্গ কিলোমিটার। প্রয়োজনের চেয়ে সবুজায়ন কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। অপরিকল্পিত নগরায়ন, গাছপালা উজাড়ে অনেকটা মৃত নগরীতে পরিণত হচ্ছে। স্থান পেয়েছে বিশ্বের দূষিত নগরীর তালিকার শীর্ষে। নগরীর আয়তনের ২০ শতাংশ বনায়ন থাকার কথা থাকলেও ঢাকায় রয়েছে ৬ শতাংশের কম। এভাবে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে রাজধানী।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ রক্ষায় ঢাকায় ২০ শতাংশ সবুজ এলাকার প্রয়োজন; কিন্তু বর্তমান তা প্রায় ১৪ শতাংশ কমে প্রায় ৬ শতাংশে এসে ঠেকেছে। এতে গ্রামাঞ্চলের চেয়ে ঢাকায় লাফিয়ে লাফিয়ে তাপমাত্রার সাথে পরিবেশ দূষণও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নগর সবুজায়ন নীতিমালা ও কৌশলপত্র প্রণয়নের দাবি জানিয়ে পরিবেশবিদরা দেশব্যাপী বৃক্ষ সংরক্ষণে আইন ও ‘মাস্টারপ্ল্যানের’ দাবি তুলেছেন।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ২০২৩ সালের সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার যেসব এলাকায় একসময় নিচু ভূমি ও জলাশয় ছিল, দ্রুত সেখানে তোলা হয়েছে নানা অবকাঠামো। রাখা হয়নি জলাশয়, উন্মুক্ত স্থান ও বৃক্ষরাজি। দিনে যে পরিমাণ সূর্যের আলো আসে, তা ভবনের গায়ে, ছাদে, পাশের রাস্তায় জমে থাকে। সূর্য ডোবার পর জমে থাকা তাপ অল্প অল্প করে ছড়ায়। ফলে ঘরে-বাইরে সমান গরম অনুভূত হচ্ছে।
অন্য দিকে একই বছরে প্রকাশিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) এক গবেষণায় বলা হয়, ২০১৫ সালে ঢাকা শহরে সবুজ এলাকা ও ফাঁকা জায়গা ছিল ৫৩ দশমিক ১১ বর্গ কিলোমিটার। ২৩ সালে তা কমে হয়েছে ২৯ দশমিক ৮৫ বর্গ কিলোমিটার। অর্থাৎ সাত বছরে ফাঁকা জায়গা কমেছে প্রায় ২৪ বর্গমিটার, যা বছরে তিন বর্গ কিলোমিটারের বেশি।
অপর দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ইনস্টিটিউট অব রিমোট সেন্সিং অ্যান্ড জিআইএসের এক সমীক্ষায় বলা হয়, ঢাকা শহরে ১৯৮৯ থেকে ২০২০ সাল অর্থাৎ ৩১ বছরে ৫৬ শতাংশ গাছপালা কমেছে। বর্তমানে শহরের মাত্র ২ শতাংশ এলাকায় সমৃদ্ধ ও পরিবেশবান্ধব প্রজাতির গাছপালা এবং লতাগুল্ম টিকে আছে। মোট বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা মাত্র ৮ শতাংশ।
এ দিকে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা গত মাসে তাদের সমীক্ষায় জানায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিগত ৯ বছরে ঢাকার মানচিত্র অনেকটা বদলে গেছে। সংস্থাটি কোপার্নিকাস সেন্টিনেল-২ অভিযান থেকে বেশ কিছু ছবি প্রকাশ করে। স্যাটেলাইটের দু’টি ছবিতে ঢাকার চার পাশের ভূপ্রকৃতির বিশাল পরিবর্তন তুলে ধরা হয়। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তোলা এই ছবি দু’টির তুলনা করলে দেখা যায়, গত ৯ বছরে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা বেশ বদলে গেছে। এতে ঢাকার চার পাশের জনবসতি নাটকীয়ভাবে বাড়ার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, কৃষিজমি ও জলাভূমি গ্রাস করে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন ভবন ও রাস্তা।
ইএসএ জানিয়েছে, বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা তিন কোটি ৬০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুতবর্ধনশীল মহানগরীর মধ্যে ঢাকা অন্যতম। বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের মতো ঢাকাও এখন অপরিকল্পিত নগরায়নের চ্যালেঞ্জের মুখে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে শহরের ভেতরে যেমন চাপ বাড়ছে, তেমনি প্রান্তিক অঞ্চলের কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক সম্পদও হারিয়ে যাচ্ছে।
ঢাকার জনসংখ্যা নিয়ে ম্যাক্রোট্রেন্ডসের তথ্য বলছে, বিগত পাঁচ বছরে এই শহরে লোকসংখ্যা বেড়েছে প্রায় দেড় কোটি। সংস্থাটির ভাষ্য, ২০২০ সালে ঢাকা শহরে জনসংখ্যা ছিল দুই কোটি ১০ লাখ ছয় হাজার। ২০২১ সালে সেটি ৩.৫ শতাংশ বেড়ে হয় দুই কোটি ১৭ লাখ ৪১ হাজার। ২০২২ সালে আরো ৩.৩৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় দুই কোটি ২৪ লাখ ৭৪ হাজার। সবশেষ ২০২৩ সালে জনসংখ্যা আরো ৩.২৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় দুই কোটি ৩২ লাখ ১০ হাজার। তবে বর্তমানে তিন কোটি ৬০ লাখ থেকে চার কোটি ৪২ লাখ লোক বসবাস করছে।
বিরাজমান পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবসৃষ্ট এসব সমস্যার সমাধান না হলে আর কয়েক বছর পর ঢাকা পরিত্যক্ত নগরীতে পরিণত হবে। অন্য দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পরিসংখ্যান বলছে, রাজধানীর সড়কে দৈনিক দুই লাখ গাড়ি চলাচলের সক্ষমতা আছে; কিন্তু চলাচল করছে ১২ লাখ, যা ধারণক্ষমতার চেয়েও প্রায় ছয়গুণ বেশি। ফলে রাস্তায় তীব্র যানজট ও পরিবেশ দূষণ হচ্ছে।
পরিবেশবিজ্ঞানী ও মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রব নয়া দিগন্তকে বলেন, ঢাকা নগরী অনেক বদলে গেছে। ৩০০ স্কয়ায় বর্গ কিলোমিটার নগরীতে ২০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ বসবাস করতে পারে; কিন্তু বর্তমানে এই শহরে সাড়ে তিন কোটির বেশি মানুষ বসবাস করছে। তাতে করে জলাশয়সহ নগরীর প্রকৃতির ওপর চাপ বাড়ছে। খাল-নালা ভরাট করে ভবন তৈরি করায় ঢাকার মানচিত্র পাল্টে যাচ্ছে। এতে করে পরিবেশ শব্দদূষণ, পয়ঃনিষ্কাশন থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে ঢাকা একটা বিস্ফোরোন্মোণমুখ পরিস্থিতিতে পড়েছে। ফলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ঢাকায় একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।
পরিবেশবিজ্ঞানী ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার নয়া দিগন্তকে জানান, সময়ের সাথে নানান বিপর্যয়ে ঢাকাও পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত বায়ুদূষণের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, ইটভাটা, যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়ার কারণে নগরের বায়ু প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে এবং পরিবেশ দিন দিন বসবাসের জন্য অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। অথচ বায়ুদূষণ কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সমন্বিত কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। ফলে দেশের পরিবেশ দূষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিভিন্ন শহর ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। আইন না মেনে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। এতে করে ধীরে ধীরে আমরা এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো: খালিদ হাসান নয়া দিগন্তকে বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণেই এমনটা হয়েছে। যেকোনো পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে কেউ নিয়ম মানছে না। রাস্তায় প্রচুর পরিমাণ ফিটনেসবিহীন গাড়ি কালো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক নেই। আসল কথা হলো এখানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধার এখন আর কিছুই আর নেই। এর প্রধান কারণ এ শহরের ধারণক্ষমতা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। ফলে অতিরিক্ত লোকের চাপে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।



