নির্বাচনকালীন বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ

শাহ আলম নূর
Printed Edition

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। রাজনৈতিক উত্তাপের পাশাপাশি এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের বাজারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে, এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি। নির্বাচন সামনে রেখে এই চাপ আরো বেড়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। চাল, ভোজ্যতেল ও সবজির দামে সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্রমেই সঙ্কুচিত করে তুলছে।

দেশের প্রধান খাদ্যপণ্য চালের বাজারে গত এক মাসে স্পষ্ট অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারি খাদ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩৯-৪০ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদন হয় এবং চলতি আমন মৌসুমে উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি হয়নি। তবুও খুচরা বাজারে মোটা চালের কেজি এখন বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৬ টাকায়, যা ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ছিল ৪৮ থেকে ৫০ টাকা। মাঝারি ও সরু চালের দাম একই সময়ে কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে চাল কিনতে আসা নি¤œ আয়ের মানুষ বলছেন, চালের দামে এই বাড়তি চাপ তাদের মাসিক ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে সরবরাহ প্রবাহ ধীর। মিল পর্যায়ে চালের মজুদ বাড়ছে। খাদ্য অধিদফতরের তথ্যে দেখা যায়, সরকারি গুদামে চালের মজুদ ১৫-১৬ লাখ টনের মধ্যে থাকলেও বেসরকারি পর্যায়ে মজুদের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় অনেক মিল মালিক ভবিষ্যৎ পরিবহন ব্যয় ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনায় বাজারে ধীরে ধীরে চাল ছাড়ছেন, যা সরবরাহে চাপ তৈরি করছে।

এদিকে ভোজ্যতেলের বাজারেও একই চিত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২২-২৩ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ভোজ্যতেল আমদানির ব্যয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২-১৫ শতাংশ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পাম ও সয়াবিন তেলের দামের ওঠানামা, ডলার সঙ্কট এবং এলসি খোলার জটিলতা এর প্রধান কারণ।

এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। সরকার নির্ধারিত দামে বোতলজাত সয়াবিন তেল অনেক বাজারেই মিলছে না। খোলা সয়াবিন তেলের দাম কেজিতে এক মাসের ব্যবধানে ৮ থেকে ১২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্বাচন সামনে রেখে আমদানিকারকরা ঝুঁকি কমাতে পণ্য ছাড়ছেন সীমিত পরিমাণে। এতে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকছে না। ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে।

সবজি বাজারে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভিন্ন হলেও চাপ কম নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, শীত মৌসুমে দেশে সবজি উৎপাদন সাধারণত বাড়ে ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত। চলতি মৌসুমেও উৎপাদন সন্তোষজনক বলে দাবি করা হলেও বাজারে দাম কমছে না। রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে বেগুন কেজি ৭০-৮০ টাকা, টমেটো ৫৫-৬০ টাকা, শিম ও করলা ৮০ টাকার নিচে নামছে না। এক মাস আগে এসব সবজির দাম গড়ে ১০-২০ টাকা কম ছিল।

সবজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদন পর্যায়ে সমস্যা না থাকলেও পরিবহনব্যয় বেড়েছে। ট্রাকভাড়া, শ্রমিক খরচ ও পথে পথে চাঁদা মিলিয়ে সবজির পাইকারি দাম বেড়ে যাচ্ছে। একজন বিক্রেতা জানান, আগে যে সবজি আড়ত থেকে কেজি প্রতি ৩০-৩৫ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা ৪৫-৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা দামে এর প্রভাব পড়ছে।

এ দিকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের বক্তব্যে ভিন্ন বাস্তবতা উঠে আসছে। ব্যবসায়ীরা নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ঝুঁকি, প্রশাসনিক তৎপরতা ও পরিবহন অনিশ্চয়তার কথা বললেও ক্রেতারা বলছেন, নির্বাচন এলেই একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নেয়। ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচনকালে বাজার তদারকি দুর্বল হয়ে পড়ে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি জানুয়ারিতে বাজার তদারকি কার্যক্রম প্রায় ২০ শতাংশ কম হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘মনস্তাত্ত্বিক মূল্যস্ফীতি’ বড় ভূমিকা রাখছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচনকালীন সময়ে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই দাম বাড়িয়ে দেন। একই সাথে ভোক্তারাও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনে মজুদ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নির্বাচনকালীন সময়ে নগদ অর্থের লেনদেন ও ভোগ ব্যয় সাধারণত ৮-১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়, যা বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তিনি আরো বলেন, ডলার সঙ্কট ও আমদানি ব্যয়ের প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ, যা আমদানিনির্ভর পণ্যের দামে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। এই পটভূমিতে নির্বাচন একটি বাড়তি চাপ হিসেবে কাজ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকালীন মূল্যস্ফীতির প্রভাব যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে তা স্বল্পমেয়াদে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হবে না। তারা বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচন-পরবর্তী তিন থেকে ছয় মাসে নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক হতে সময় লাগে, যদি না আগেভাগে বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা দেখানো হয়।

এই মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে নি¤œ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, একটি শহুরে পরিবারের মোট ব্যয়ের প্রায় ৫৫-৬০ শতাংশই খাদ্য খাতে ব্যয় হয়। খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে তাদের সঞ্চয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মারাত্মকভাবে কমে যায়। রাজধানীর এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, আগে মাস শেষে কিছু টাকা হাতে থাকত, এখন পুরো বেতনই বাজারে চলে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারকে আরো সক্রিয় হতে হবে। খাদ্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করা, আমদানিতে গতি আনা, পরিবহনব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং পাইকারি পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা জরুরি। একই সাথে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে, নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে যেন বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘœ না ঘটে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলেও, এই সময়ে যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে সেই গণতন্ত্রের অর্থ অনেকের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা তাই এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।