তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন দেখছেন বিশ্লেষকরা

‘ট্যাগিং রাজনীতি’ সঙ্ঘাত ও অনিশ্চয়তার মুখে ক্যাম্পাস

ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনে যে অভূতপূর্ব সঙ্ঘাতহীন ঐক্য দেখা গিয়েছিল, মাত্র অল্প দিনের ব্যবধানে তা রূপ নিয়েছে চরম অস্থিরতা ও সহিংসতায়। রাজশাহীতে হামলার অভিযোগ এবং চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে ‘গ্রাফিতি’ মুছে ফেলা বা শব্দ পরিবর্তনের মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে শুরু হওয়া এই সঙ্ঘাতের উত্তাপ এখন ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীসহ দেশের বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে।

Printed Edition
চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে মুছে ফেলা ও শব্দ পরিবর্তন করা গ্রাফিতি
চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে মুছে ফেলা ও শব্দ পরিবর্তন করা গ্রাফিতি

হাবিবুল বাশার

ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনে যে অভূতপূর্ব সঙ্ঘাতহীন ঐক্য দেখা গিয়েছিল, মাত্র অল্প দিনের ব্যবধানে তা রূপ নিয়েছে চরম অস্থিরতা ও সহিংসতায়। রাজশাহীতে হামলার অভিযোগ এবং চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে ‘গ্রাফিতি’ মুছে ফেলা বা শব্দ পরিবর্তনের মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে শুরু হওয়া এই সঙ্ঘাতের উত্তাপ এখন ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীসহ দেশের বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ছাত্ররাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে নির্দিষ্ট বিশেষণে বিশেষায়িত বা ‘ট্যাগিং’ করার পুরনো সংস্কৃতি আবার ফিরে আসছে। অতীতে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীদের ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে হত্যার বৈধতা দেয়ার যে সংস্কৃতি ছিল, বর্তমান অস্থিরতা তারই পুনরাবৃত্তি কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি বাজেট ও ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ একচ্ছত্রভাবে নিজেদের দখলে নেয়ার মানসিকতা থেকেই এই সঙ্ঘাতের সূত্রপাত।

গুজব ও সাইবার প্রোপাগান্ডা : গুজব ও সাইবার প্রোপাগান্ডার ওপর ভর করে ছাত্র সংগঠনগুলো একে অপরের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যাওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। একদিকে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ, অন্য দিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণের দাবি- সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসগুলোতে এখন উত্তপ্ত আবহাওয়া।

তথ্য যাচাইকারী (ঋধপঃ ঈযবপশ) সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে যে, গত বৃহস্পতিবার রাতে ছড়িয়ে পড়া একটি ফটোকার্ড সম্পূর্ণ ভুয়া ছিল। অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন পেজ থেকে এই গুজবটি পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হয়। এই ভুয়া তথ্যের জের ধরে ছাত্র সংগঠনগুলো মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ : ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক অভিযোগ করেছেন, ‘নোংরা ফটো এডিট করে প্রচার এবং ভুক্তভোগীকে হত্যার হুমকি দিয়েও তারা থামেনি; বরং শাহবাগ থানায় গিয়ে নতুন করে সঙ্ঘাত তৈরি করার অপচেষ্টা চালিয়েছে।’ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি মন্তব্য করেন যে, বর্তমান ছাত্রদল যেন তাদের আচরণের মাধ্যমে গত আমলের ছাত্রলীগকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি আরো অভিযোগ করেন, এখনকার পুলিশি তৎপরতা ‘ফ্যাসিবাদী পুলিশি প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি’ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকাও রহস্যজনক।

অন্য দিকে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব জানিয়েছেন, ছাত্রদল অত্যন্ত ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। তিনি বলেন, ‘বিগত প্রায় দুই বছর ধরে আমরা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রতিবাদ জানিয়ে আসছি। স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ছাত্রশিবিরসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করছি।’ তিনি অভিযোগ করেন, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে পরিবেশ ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের উদ্বেগ ও ‘তৃতীয় পক্ষ’ : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মামুন মাহফুজ মনে করেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যে ভ্রাতৃত্ববোধ দেখা গিয়েছিল, তা স্বার্থের দ্বন্দ্বে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মিডিয়া এবং স্বার্থান্বেষী মহল সুকৌশলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে এই ঐক্য নষ্ট করার চেষ্টা করছে। ফলে একটি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে যারা নিজেদের মধ্যে সঙ্ঘাতে লিপ্ত হচ্ছে।’

তিনি আরো যোগ করেন, এই অস্থিতিশীলতার পেছনে একটি ‘তৃতীয় পক্ষ’ সক্রিয়। তবে এই বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। বিভিন্ন সূত্র মতে, এতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ইন্ধন থাকতে পারে। তবে কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, ছাত্রদল তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অনেক ক্ষেত্রে কৌশলগত অবস্থান নিচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করছে। ক্যাম্পাসের এই অস্থিরতা কেবল ছাত্র সংগঠনগুলোর আদর্শিক লড়াই নয়, বরং আধিপত্য বিস্তার, ট্যাগিং কালচার এবং তৃতীয় পক্ষের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের ফলাফল বলে মনে করছেন সচেতন মহল। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।