সঙ্কটে ইসলামী ব্যাংক

এস আলমের অফশোর ব্যাংকিং কেলেঙ্কারি

বাধ্যতামূলক ঋণ সৃষ্টি করায় বেড়েছে খেলাপি ঋণের চাপ

অফশোর ব্যাংকিং সুবিধা ব্যবহার করে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে। এসব অর্থ পরিশোধ না করায় ইসলামী ব্যাংক বাধ্যতামূলক ঋণ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের চাপ আরো বেড়ে গেছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ব্যাংক খাতের মাফিয়া এস আলমকে ঘিরে অফশোর ব্যাংকিং কেলেঙ্কারি। বিভিন্ন সময়ে দেশের প্রভাবশালী মহলের প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের ঘটনা এখন প্রকাশ্যে এসেছে। বিশেষত ইসলামী ব্যাংক ও অন্যান্য বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে অফশোর ব্যাংকিং সুবিধা ব্যবহার করে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে। এসব অর্থ পরিশোধ না করায় ইসলামী ব্যাংক বাধ্যতামূলক ঋণ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের চাপ আরো বেড়ে গেছে।

অফশোর ব্যাংকিংয়ের অপব্যবহার : অফশোর ব্যাংকিং মূলত এমন একটি পদ্ধতি যেখানে স্থানীয় ব্যাংক বিদেশী ব্যাংকের সাথে লেনদেনে গ্যারান্টার হিসেবে কাজ করে। ক্রেতা বা সরবরাহকারীর নামে ঋণ খোলা হয়, পণ্য আমদানির কথা বলে টাকা তোলা হয় এবং নির্ধারিত সময়ে তা পরিশোধের কথা থাকে। কিন্তু এস আলম গ্রুপসহ কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এই সুযোগের অপব্যবহার করেছে। তারা বিদেশ থেকে ঋণ নিলেও দেশে যথাযথভাবে পণ্য আনা হয়নি বা আনা হলেও বিক্রির অর্থ ব্যাংককে ফেরত দেয়া হয়নি। ফলে দায়ভার গিয়ে পড়েছে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর ওপর।

ইসলামী ব্যাংকের ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থা : এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক থেকেই প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়। শর্ত ছিল, পণ্য দেশে এনে বিক্রি করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংকের অর্থ ফেরত দেয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এস আলম গ্রুপ ঋণের অর্থ আত্মসাৎ করে এবং ইসলামী ব্যাংক বাধ্য হয় বিদেশী ব্যাংকের কাছে ডলার মুদ্রায় অর্থ ফেরত দিতে। এর ফলে ইসলামী ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে যায় এবং ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এখন এসব ঋণ ‘ফোর্স লোন’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যা ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে।

অন্যান্য গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা : শুধু এস আলম নয়, আরো কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গ্রুপ একইভাবে ব্যাংক থেকে অফশোর ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে অর্থ পাচার করেছে। এর মধ্যে নাসা গ্রুপ, শিকদার গ্রুপ, বেক্সিমকো, দেশবন্ধু গ্রুপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ, দেশবন্ধু গ্রুপ সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলে বিদেশী ঋণ নেয়। পণ্য দেশে এসেছে, বিক্রিও হয়েছে, কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ব্যাংকের কাছে অর্থ ফেরত দেয়া হয়নি। ফলে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার ফোর্স লোন সৃষ্টি করে বিদেশী ব্যাংকের কাছে দায় মেটাতে হয়েছে।

পাচারের কৌশল : ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, পাচারের কৌশল ছিল বেশ সুপরিকল্পিত। প্রথমে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সাথে এলসি খোলা হতো। তারপর বিদেশী ব্যাংক এস আলম বা অন্য গ্রুপের নামে ঋণ সৃষ্টি করত। ইসলামী ব্যাংক বা স্থানীয় ব্যাংকগুলো গ্যারান্টার থাকত। পণ্য আনার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে পণ্য আসেনি, কখনো কম এসেছে, আবার কখনো পণ্য বিক্রির অর্থ গোপনে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ফলে বিদেশী ব্যাংক তাদের পাওনা মিটিয়ে নিলেও স্থানীয় ব্যাংকগুলো মার খেয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব : এ ধরনের অফশোর ব্যাংকিং কেলেঙ্কারি দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য ভয়াবহ সঙ্কট তৈরি করেছে। ব্যাংকের তারল্য সঙ্কট বেড়েছে, সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে ডলার সঞ্চয় বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশী ব্যাংকের কাছে অর্থ ফেরত দিতে গিয়ে স্থানীয় ব্যাংকগুলোকে জোরপূর্বক ডলার জোগাড় করতে হচ্ছে। এতে জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দায়বদ্ধতা : ব্যাংকার ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই কেলেঙ্কারির মূল কারণ হলো রাজনৈতিক প্রভাব ও শিথিল তদারকি। প্রভাবশালী মহলের কারণে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ মঞ্জুর করেছে। এখন তারা নিজেরাই বিপাকে। এস আলমসহ সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও খাতগুলোকে আলাদা করে চিহ্নিত করে তাদের প্রয়োজনীয় সুবিধা দেয়া উচিত।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এস আলম অফশোর ব্যাংকিং কেলেঙ্কারি বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করেছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল তদারকির সুযোগ নিয়ে কত সহজে রাষ্ট্রের বিপুল সম্পদ বিদেশে পাচার করা সম্ভব। এখনই যদি কঠোর পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তবে ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনগণের আস্থা চরমভাবে নষ্ট হবে এবং সামষ্টিক অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং অফশোর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা সময়ের দাবি।