আনারসের ঘ্রাণে এক দিন: মামুন চাকলাদার

Printed Edition
আনারসের ঘ্রাণে এক দিন: মামুন চাকলাদার
আনারসের ঘ্রাণে এক দিন: মামুন চাকলাদার

দিনটি ছিল মঙ্গলবার, ভোর ৫টায় রুমমেট শাকিবের ডাকে আমার ঘুম ভেঙেছিল। তখনো শরীরে জ্বর ছিল, সর্দিও বাড়ছিল। অসুস্থ শরীর নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে কি না ভাবছিলাম। আবার মনে হচ্ছিল বিভাগের স্যার-ম্যাম যাচ্ছেন, এমন সুন্দর ফিল্ডওয়ার্ক আর হয়তো হবে না। ভাবতে ভাবতেই প্যারাসিটামল খেয়ে প্রস্তুত হলাম। হেমন্তের ভোর, ক্যাম্পাস কুয়াশায় ঢেকেছিল। সাড়ে ৬টায় গাড়ি ছাড়ার কথা থাকলেও পনেরো মিনিট দেরি হয়েছিল। আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজে মোড়া গাড়িতে উঠে সিটে বসে পাশে একজনকে বলেছিলাম, ‘আমি কিছুটা অসুস্থ কাউকে বলো না।’

গাড়ির ভেতর সবাই নাশতা করছিল; আমি খেতে পারিনি, শুধু ভাজা ডিমের কয়েক টুকরো খেয়েছিলাম। বমি বমি ভাব হচ্ছিল। আমাদের গন্তব্য ছিল টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার পীরগাছা গ্রাম। আমাদের দু’জন সহপাঠী অ্যানি ও রুকুদের বাড়ি টাঙ্গাইল হওয়ায় আমাদের যাত্রা পূর্বপ্রস্তুতি সহজ হয়েছিল। টাঙ্গাইলের নাম শুনলেই যে ছবি চোখে ভেসে ওঠে। শালবন, লাল মাটি আর আনারসের সারি পীরগাছা সেই পরিচিত দৃশ্যের মধ্যেই নিজস্ব এক সৌন্দর্যে দাঁড়িয়ে আছে! আমাদের টিমের গবেষণার বিষয় ছিল- ‘গ্রামীণ অঞ্চলের শিশুদের ডিজিটাল মিডিয়ার ব্যবহার ও অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণ ও কৌশল।’

গাড়ি চলতে শুরু করলে অনেকেই গান ধরেছিল। সবাই ছিল উত্তেজিত গবেষণার কাজ, নতুন জায়গা দেখা, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা সব মিলিয়ে আলাদা রকম প্রাণচঞ্চলতা। সালেহ আমার অসুস্থতা বুঝে আরেকটি প্যারাসিটামল দিয়েছিল। সিট সঙ্কট থাকায় কয়েকজন দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। বিশেষ করে দুই-তিনজন মেয়েদের দাঁড়িয়ে থাকা দেখে খারাপ লাগলেও কিছু করার ছিল না। দায়িত্বশীল রিভু, শ্রেণী প্রতিনিধি জিদান ও প্রীতি ব্যবস্থা করেছিল। যারা কিছুক্ষণ সিটে বসেছে, তারা যেন দাঁড়িয়ে অন্যদের বসার সুযোগ দেয়।

মধুপুরের দিকে ঢুকতেই প্রকৃতি রূপ বদলাতে শুরু করেছিল। সমতলের পরিচিত দৃশ্য যেন ধীরে ধীরে থেমে গিয়ে শুরু হয়েছিল অরণ্যের নীরবতা। বিচ্ছিন্ন ঘর বাড়ি, একটু নির্জন জায়গায়। তবে সেই নির্জনতা নিস্তব্ধ ছিল না মানুষের চলাচল, শিশুর হাসি, শালপাতার ঝিরঝির, পাতা ঝরার নৃত্য ছন্দ সব মিলিয়ে সজীব শান্ত আবহাওয়া।

পীরগাছায় পৌঁছে শামসুন্নাহার মেরি ম্যাম, তারানা ম্যাম ও কামরুজ্জামান স্যার দল গঠন করেছিলেন। আমাদের দলে ছিলাম আমি, সুরুজ, জেরিন, শানু, তন্নী ও তার সহগবেষক শান্তা। বেলা তখন ১১টা। গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে দেখছিলাম বাড়িঘর আছে কিন্তু মানুষ নেই। জেরিন বলেছিল, ‘বাড়িঘর, পরিবেশ সবই সুন্দর অথচ মানুষ নেই; যেন পরিত্যক্ত জনপদ।’ একটু পর তন্নী আর শান্তা পথের একটি বাড়ির দিকে এগোতেই দু’টি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে এগিয়ে এলো। তারা ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল। আমি বলেছিলাম, ‘স্থির থাকো, কিছু করবে না।’ গৃহিণী এসে কুকুর সরিয়ে দিলে তারা স্বস্তি পেয়েছিল। অল্প এগোতেই দেখা গেল সবাই আসলেই মাঠে কাজে ব্যস্ত। ধান কাটার মৌসুম। মাঠে কৃষক ধান কাটছেন, কেউ আঁটি বেঁধে বাড়ি তুলছেন। ছোট বাচ্চারা এক পাশে চাদরের ওপর বসে আছে। কয়েকজন বৃদ্ধ কাটা খড়ের ওপর অলস দুপুর কাটাচ্ছিলেন। এক মা শিশুকে দুধ খাইয়ে দিচ্ছিলেন গ্রামজীবনের স্নিগ্ধ দৃশ্য, আর কাস্তের মতো বেঁকে যাওয়া পথ দেখে মনটা হারিয়েছিল নিমিষেই। আরেক বাড়ির উঠানে কৃষাণী ধান শুকাচ্ছিলেন। রোদের আলোয় সোনালি ধান যেন শস্য নূপুরের মতো চিকচিক করছিল কৃষাণীর পায়ে। এসবের ভেতর দিয়ে আমরা কথা বলেছি, পর্যবেক্ষণ করেছি, তথ্য নিয়েছি। গ্রামবাসী গবেষণার বিষয়টি আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন। কেউ বলেছিলেন, সন্তানের মোবাইল ব্যবহারে সময় বেঁধে দেন। কেউ পড়াশোনার চাপ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন। কোথাও অ্যান্ড্রয়েড ফোনই ছিল না। আবার কোথাও শিশুরা নিষেধ মানে না, ফলে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। বোঝা গেল প্রযুক্তি গ্রামে ঢুকেছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি পরিবারকেন্দ্রিক। এটাই স্বাভাবিক হওয়া উচিত, একজন মহিলা বলছিলেন, তার আঠারো মাসের এক নাতি টিকটকে ভিডিও দেখে অপলক চেয়ে থাকে। এসব তো নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে! ডিজিটাল মিডিয়ার অবাধ ব্যবহার শিশুদের ক্ষেত্রে পরিবারকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

গ্রামটির আরো একটি বৈশিষ্ট্য- হিন্দু ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের শান্ত সহাবস্থান। মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি ও গির্জার সুর যেন গ্রামটিকে আরেক স্তরের সৌন্দর্য দেয়।

দুপুর থেকে বিকেল সময়ের ভেতর আমরা উঠান থেকে উঠানে, মাঠ থেকে মাঠে, বাগানে ঘুরে বেড়িয়েছি। গবেষণার তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি গ্রামজীবনের অদেখা রঙগুলো মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। দুপুরের প্রখর শেষ আলো যখন আনারস বাগানে ঢলে পড়ছিল, মনে হয়েছিল- একটি গ্রামকে বুঝতে গেলে শুধু প্রশ্নোত্তর নয়; তার নীরব স্রোতটা ও সজীব চঞ্চলতাও অনুভব করতে হয় ফসলের হাসির মতো। পীরগাছা আমাদের গবেষণাকে সমৃদ্ধ করেছে আর দিনশেষে মনে করিয়ে দিয়েছে, গ্রাম এখনো প্রকৃতি, পরিবার আর শ্রমের সহজ সমীকরণে টিকে আছে। বাংলা যে সুন্দর পীরগাছা তার প্রমাণ দিয়েছিল আমাদেরকে। বাংলার এই সবুজ সোনালি রূপের মাঠে মন যেন হারিয়েছিল অচেনা পথিকের মনের মতোই।

লেখক : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়