আ’লীগের পুনর্বাসন নিয়ে কোনো চাপে নতি স্বীকার করবে না সরকার

জাতীয় নিরাপত্তায় ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের সমর্থন বেশি গুরুত্ব পেতে পারে

পুনর্বাসন বিতর্ক মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণের ফল। একটি বড় রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ ভূমিকা, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন- এসব বিষয় নিয়েই আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি অংশ মনে করে, বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের জন্য উপযুক্ত নয়। অন্য দিকে ফ্যাসিবাদের সমালোচকদের যুক্তি, অতীত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং জনমতের প্রতিফলন বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যারা রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস ও ফ্যাসিবাদ কায়েমের জন্য অভিযুক্ত তাদের আইনের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহের বাইরে গিয়ে পুনর্বাসনের সুযোগ নেই।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক কূটনীতিতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে- কোনো বিদেশী চাপ, বিশেষ করে ভারতের দিক থেকে, এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে কি না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো ধরনের বহিরাগত চাপের কাছে নতি স্বীকার করার প্রশ্নই আসে না; রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কেবল দেশের সংবিধান, আইন এবং জনগণের স্বার্থের ভিত্তিতেই নেয়া হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুনর্বাসন বিতর্ক মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণের ফল। একটি বড় রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ ভূমিকা, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন- এসব বিষয় নিয়েই আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি অংশ মনে করে, বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের জন্য উপযুক্ত নয়। অন্য দিকে ফ্যাসিবাদের সমালোচকদের যুক্তি, অতীত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং জনমতের প্রতিফলন বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যারা রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস ও ফ্যাসিবাদ কায়েমের জন্য অভিযুক্ত তাদের আইনের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহের বাইরে গিয়ে পুনর্বাসনের সুযোগ নেই।

আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনে ভারতীয় চাপের প্রসঙ্গটি সাধারণত দুই দেশের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে আলোচিত হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতা রয়েছে। ফলে যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন আঞ্চলিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হয়। তবে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের প্রভাব নেই এবং থাকবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিতর্কের মূল বিষয় হলো স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি। যদি কোনো রাজনৈতিক দলকে ভবিষ্যতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হয়, তবে তা আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই হতে হবে। একই সাথে জাতীয় ঐক্য, আইনশৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশী বিনিয়োগ, রফতানি প্রবৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতে রূপান্তরের জন্য একটি পূর্বানুমেয় রাজনৈতিক পরিবেশ দরকার। তাই সরকারের ওপর চাপের ধারণা নয়; বরং নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতার ওপরই জোর দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। সার্বিক বিবেচনায়, আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন বিতর্ক কেবল একটি দলীয় ইস্যু নয়; এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকার যেহেতু বহিরাগত চাপের বিষয়টি অস্বীকার করছে, তাই আগামী দিনে সিদ্ধান্তগুলো কিভাবে সাংবিধানিক কাঠামো ও জনমতের ভিত্তিতে অগ্রসর হয়, সেটিই মূল পর্যবেক্ষণের বিষয় হবে।

এ দিকে আওয়ামী লীগের ‘পুনর্বাসন’ বিতর্ক এখন আর কেবল দেশীয় আলোচনার বিষয় নয়; এটি এখন ওয়াশিংটন থেকে দিল্লি এবং বেইজিং থেকে রিয়াদ পর্যন্ত বিস্তৃত এক জটিল কূটনৈতিক দাবার চালে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বিজেপির রাজনৈতিক আধিপত্য এই সমীকরণকে আরো সংবেদনশীল করে তুলেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গত দুই বছরে এক আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যই পরিবর্তন করেনি; বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় ও বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে ভারত দীর্ঘকাল পরিচিত। দিল্লির কাছে আওয়ামী লীগ ছিল একটি ‘প্রেডিক্টেবল’ বা নির্ভরযোগ্য শক্তি, যারা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে নজিরবিহীন সহযোগিতা করেছে।

জুলাই-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দিল্লি সরাসরি কোনো দলের পক্ষ না নিলেও তাদের ‘ইনক্লুসিভ পলিটিক্স’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বার্তাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে মুছে ফেলার বিপক্ষে ভারতের একটি পরোক্ষ অবস্থান।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বিজেপির রাজনৈতিক শক্তিবৃদ্ধি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন মাত্রার চাপ সৃষ্টি করেছে।

পশ্চিমবঙ্গ ও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি : পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এখন প্রধান শক্তি। অনুপ্রবেশ, এনআরসি এবং সিএএ-এর মতো ইস্যুগুলো নিয়ে তাদের সরব উপস্থিতি দিল্লির নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলছে। বিজেপি নেতৃত্ব মনে করে, বাংলাদেশে একটি ‘ভারত-বান্ধব’ (আওয়ামী লীগ ঘরানার) শক্তি ক্ষমতায় না থাকলে সীমান্ত নিরাপত্তা ও হিন্দু সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

আসাম ও ত্রিপুরা : আসামে বিজেপি সরকার ‘অবৈধ অভিবাসন’ ইস্যুকে তাদের রাজনীতির মূল ভিত্তি করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কোনো নির্দিষ্ট শক্তির উত্থান যদি আসামের জনতাত্ত্বিক কাঠামোতে প্রভাব ফেলার শঙ্কা তৈরি করে, তবে দিল্লি আরো কঠোর অবস্থান নিতে পারে।

কানেক্টিভিটি ও ‘চিকেন নেক’ উদ্বেগ : ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন নেক’-এর নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশে অনুগত সরকার অপরিহার্য। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনে করে, বাংলাদেশের কোনো সরকার যদি চীনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে বা ভারত-বিরোধী মনোভাব পোষণ করে, তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো কৌশলগত ঝুঁকিতে পড়বে।

অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান অনেকটা ‘শর্তসাপেক্ষ’। এক দিকে তারা বাংলাদেশে মানবাধিকার রক্ষা ও অবাধ নির্বাচনের কথা বলছে, অন্য দিকে তারা একটি স্থিতিশীল কাঠামো চায়। পশ্চিমা কূটনীতিকদের ভাষায় ‘ডি-এস্কেলেশন’ এবং ‘পলিটিক্যাল রিকনসিলিয়েশন’ বা রাজনৈতিক সমঝোতার সুর শোনা যাচ্ছে। তবে তারা আওয়ামী লীগের অতীত শাসনের জবাবদিহিতা চায়। পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লাখ ভোট বাতিল করে বিজেপি যেভাবে ক্ষমতা দখল করেছে সেটিকে পশ্চিমা দেশগুলো গণতন্ত্রের স্বাভাবিক গতিপথ মনে করছে না। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে কোনো দেশের আগ্রাসী মনোভাবকে প্রশ্রয় দেবে না এসব দেশ। এসআইআর ও এনআরসির মাধ্যমে বাংলাদেশকে একধরনের চাপে ফেলার ব্যাপারে তাদের আশঙ্কা রয়েছে।

বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও বাংলাদেশের সার্বভৌম অস্থিত্ব নিয়ে যেকোনো হুমকি নিয়ে তাদের অবস্থান অভিন্ন। চীনের অবস্থান বরাবরের মতোই দৃশ্যত ‘অরাজনৈতিক’। বেইজিংয়ের কাছে ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ বড়। তবে আওয়ামী লীগের ভারতীয় স্বার্থে অতিমাত্রায় আত্মসমর্পণে বিরক্ত ছিল তারা। আওয়ামী লীগের পতন-উত্তর সরকারের সাথে বেইজিং সুসম্পর্ক বজায় রাখে। অন্য দিকে সৌদি আরব, কাতার বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো স্থিতিশীলতা ও নিরাপদ শ্রমবাজারের নিশ্চয়তা চায়। তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিষয়ে কমিটেড।

পর্যবেক্ষকদের ধারণা- আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন বিতর্কটি এখন তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে : ১. অভ্যন্তরীণ জনমত : যারা জুলাই-আগস্টের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বিপ্লবের সুরক্ষা এবং গণহত্যাকারীদের জবাবদিহিতা ও বিচার চায়। ২. আন্তর্জাতিক চাপ : যাদের কেউ কেউ স্থিতিশীলতা ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের দোহাই দিয়ে রাজনীতিতে সব দলের অংশগ্রহণ চায়। ৩. আঞ্চলিক নিরাপত্তা : বিশেষ করে বিজেপির শাসিত সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলো থেকে নিরাপত্তা উদ্বেগ, যা দিল্লির সিদ্ধান্ত গ্রহণে সৃষ্টি হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শীর্ষ নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, ‘‘ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি আদর্শের চেয়ে ‘স্বার্থ’ দ্বারা বেশি চালিত হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত এই বহুমুখী স্বার্থের টানাপড়েনের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে। ভারতের চাপ বা চাওয়া চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক হবে না। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের কৌশলগত স্বার্থ নিয়ে বোঝাপড়া হলে বাংলাদেশ নিয়ে দিল্লির কোনো চাপ কার্যকর হবে না। এ জন্য দিল্লি নিজেদের নিরাপত্তা প্রশ্নে মস্কোর ওপর বেশি নির্ভর করতে চাইছে।’’ এই বিশ্লেষক বলেন, ‘বাংলাদেশ একই সাথে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে চট্টগ্রামে বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে বুঝতে হবে প্রতিবেশী দেশের চাপ বাংলাদেশে শেষ পর্যন্ত কাজ করবে না। ভারত একই সাথে দুই প্রকল্প ঠেকানোর চেষ্টা করছে। আর এর প্রতিক্রিয়ায় সহিংস কোনো নাশকতার প্রকল্প নেয়া হলে সেটি ভারতীয় নিরাপত্তার জন্য বুমেরাং হতে পারে।’

এই বিশ্লেষক মনে করেন, ‘এই অঞ্চলে বার্মা অ্যাক্ট ও ব্রেইভ বার্মা অ্যাক্টের পর অনেক হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। এই বাস্তবতা সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে। তা না হলে অনেক সুযোগ যেমন হাতছাড়া হবে তেমনিভাবে অনেক বিপত্তিও অনিবার্য হয়ে ওঠতে পারে।’