নয়া দিগন্ত ডেস্ক
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে প্রকৃত স্বশাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, স্থানীয় সরকারকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন, প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা জরুরি।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত : সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আদালতের রায় ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব দাবি উঠে আসে। বৈঠকের আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন কবি ও প্রাবন্ধিক এবং চর্চা ডটকমের সম্পাদক সোহরাব হাসান, নাগরিক কোয়ালিশনের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, কবি লিলি হক প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।
সুজনের সম্পাদক বলেন, সরকার সম্প্রতি সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদ ভবনে ‘বসার জায়গা’ করে দেয়ার জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এর ফলে সংবিধানে নির্ধারিত আইন প্রণয়নের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সংসদ সদস্যদের হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হবে। তিনি আরো বলেন, সাংবিধানিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা এবং সরকারি দলের অঙ্গীকার সত্ত্বেও দ্রুত নির্বাচন আয়োজন না করে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করতে গঠিত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।
স্থানীয় সরকারের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও নীতিগত ভিত্তি তুলে ধরে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংবিধানে স্থানীয় সরকারের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকলেও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ‘কুদরত-ই-এলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ’ (৪৪ ডিএলআর (এডি), ১৯৯২) মামলার রায়ে এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যার সমাধানই স্থানীয় সরকারের মূল লক্ষ্য- অর্থাৎ জনগণের ‘স্বশাসন’ প্রতিষ্ঠা।
তিনি বলেন, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার গণতন্ত্রের ভিত মজবুত করে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা সহজ করে এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে। একই সাথে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং নতুন নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে। তার মতে, ক্ষমতা, দায়-দায়িত্ব ও সম্পদের যথাযথ বিকেন্দ্রীকরণের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো শক্তিশালী স্থানীয় সরকার। কিন্তু নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান না থাকায় দেশে বরাবরই কেন্দ্রীকরণ বেড়েছে, যা অপচয়, অদক্ষতা ও দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে।
স্থানীয় সরকারের সাংবিধানিক ভিত্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, সংবিধানের ৯, ১১, ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ১১-তে প্রশাসনের সর্বস্তরে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে এবং ৫৯ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকারকে স্বায়ত্তশাসিত কাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বিদ্যমান আইনে নানা অসঙ্গতি ও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। অনেক আইন পরস্পরবিরোধী এবং সময়োপযোগী নয়। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার আইন তুলনামূলক কার্যকর হলেও জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ সংক্রান্ত আইনে গুরুতর সমস্যা বিদ্যমান।
তার মতে, উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং ইউএনওকে প্রধান নির্বাহী করা, এই দু’টি বিষয় স্থানীয় সরকারের স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী এবং দ্বৈত কর্তৃত্ব সৃষ্টি করে। এ ছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্তের ক্ষমতা সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে থাকায় তা রাজনৈতিকভাবে অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সাম্প্রতিক কিছু সরকারি সিদ্ধান্ত— যেমন সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ, সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী। একই সাথে এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সাথেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি উপজেলা পরিষদে এমপিদের জন্য ‘বসার জায়গা’ নির্ধারণের সিদ্ধান্তকে ‘ভয়ানক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এর ফলে স্থানীয় সরকার পুরোপুরি সংসদ সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং ‘এমপি-নির্ভর’ শাসনব্যবস্থা ফিরে আসতে পারে।
তিনি অবিলম্বে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান। পাশাপাশি ২০২৪ সালের স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ও ২০০৭ সালের শক্তিশালীকরণ কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সোহরাব হাসান বলেন, অনেক সংসদ সদস্য নিজ এলাকায় অবস্থান করেন না, ফলে স্থানীয় উন্নয়ন ব্যাহত হয়। তার মতে, সংবিধানে স্থানীয় সরকার থাকলেও বাস্তবে তা চর্চায় অনুপস্থিত।
তিনি বলেন, একসময় ইউনিয়ন পরিষদে জনশুনানির মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত হতো। কিন্তু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন চালুর পর সেই চর্চা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তিনি আরো বলেন, নাগরিকরা নিজেরা কর প্রদানে অনীহা দেখালে স্থানীয় সরকার কখনোই শক্তিশালী হবে না। একই সাথে এমপিদের স্থানীয় সরকারে হস্তক্ষেপ রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান।
ফাহিম মাশরুর বলেন, সিভিল সোসাইটিতে স্থানীয় সরকার নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক কম। সংবিধানে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সরকারি পদক্ষেপগুলো থেকে সরকারের প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ-ইচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এক বছরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখনো নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি, ফলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান এফপিটিপি পদ্ধতি বহাল থাকলে স্থানীয় সরকারকে প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। আংশিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা আইন প্রণয়নে সীমিত রাখা যেতে পারে।
সঞ্চালক দিলীপ কুমার সরকার বলেন, সংসদ সদস্যদের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং সংসদের স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অন্য দিকে স্থানীয় উন্নয়নের দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের ওপর ন্যস্ত।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সংসদ সদস্যদের হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে স্থানীয় সরকার আরো দুর্বল হবে এবং উন্নয়নের গতি বাধাগ্রস্ত হবে।
বৈঠকে বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সরকার স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেবে এবং জনআকাক্সক্ষার আলোকে একটি শক্তিশালী, কার্যকর ও স্বশাসিত স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তুলবে।



