পুঁজিবাজারে ব্যাংকের দাপটে কুপোকাত অন্যসব খাত

এসএমই বোর্ডে বিনিয়োগে শর্ত শিথিল

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার সাথে অনেকটাই মিলতে শুরু করেছে নতুন বছরে দেশের পুঁজিবাজার আচরণ। গতকাল নিয়ে নতুন বছরে টানা দ্বিতীয় দিন দুই পুঁজিাবাজারের সবগুলো সূচকের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটল। তবে গতকাল বাজারের সবচেয়ে বড় ব্যাংকিং খাতের দাপটে অন্য খাতগুলো একপ্রকার মøানই ছিল বলা যায়। সূচকের বড় ধরনের উত্থানেও খাতটির বাইরে অন্য খাতগুলোর একটি বড় অংশই দরপতনের শিকার ছিল। লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধি দু’দিক থেকেই এগিয়ে ছিল ব্যাংকিং খাত। এ সময় বৃদ্ধি পায় বাজারগুলোর লেনদেনও।

সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক পতন সত্ত্বেও নতুন বছরে পুঁজিবাজার একটি সম্ভাবনার জায়গায় ফিরবে এমনটিই প্রত্যাশার কথা জানিয়েছিলেন বিনিয়োগকারীসহ অন্যান্য পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা। সবার এ আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে পুঁজিবাজারের দ্বিতীয় কর্মদিবসেও। গতকাল রোববার দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। ওইদিন লেনদেনের শুরু থেকে বড় কোনো বিক্রয়চাপ ছাড়া সূচকের সাবলিল উন্নতিতেই দিন শেষ করে বাজারগুলো।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৫৪ দশমিক ৬২ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। সকালে ৪ হাজার ৯১০ দশমিক ৬১ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি রোববার দিনশেষে পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯৬৫ দশমিক ২৪ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির অপর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১৮ দশমিক ৪২ ও দশমিক ৬১ পয়েন্ট।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই এদিন ১২৭ দশমিক ২১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৮৭ দশমিক ৩৯ ও ৭৫ দশমিক ০৬ পয়েন্ট।

সূচকের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে দুই পুঁজিবাজারের লেনদেনে। ডিএসই গতকাল ৫৩৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ১৬৯ কোটি টাকা বেশি। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৩৬৮ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার লেনদেন নিষ্পত্তি করে ২৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার। আগের দিন বাজারটির লেনদেন ছিল ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

এদিকে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটাতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পভিত্তিক কোম্পানিগুলোর জন্য নির্দিষ্ট এসএমই বোর্ডে লেনদেনের শর্ত শিথিল করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে সেকেন্ডারি মার্কেটে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে এমন যেকোনো বিনিয়োগকারী এসএমই প্ল্যাটফর্মে শেয়ার কেনাবেচার সুযোগ পাবেন। গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত কমিশনের ৯৯০তম সভায় এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়। এর আগে এসএমই বোর্ডে লেনদেনের জন্য বিনিয়োগের ন্যূনতম সীমা ছিল ৩০ লাখ টাকা, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এসএমই বোর্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।

সংশোধিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশী ও বিদেশী উভয় শ্রেণীর বিনিয়োগকারীরা যদি ডিএসইর সেকেন্ডারি মার্কেটে অন্তত ১০ লাখ টাকার পোর্টফোলিও ধারণ করেন, তাহলে তারা এসএমই বোর্ডে ‘কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর’ হিসেবে গণ্য হবেন। এ লক্ষ্যে বিএসইসি ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জারি করা নির্দেশিকায় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। বিএসইসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আগের কমিশনের সময়ে আইনের মূল বিধিমালার সাথে পৃথক নির্দেশনার মাধ্যমে যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছিল, তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল। বর্তমান কমিশন সেই বিভ্রান্তি দূর করতে এবং বিধিমালার সাথে নির্দেশনার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে প্রণীত এসএমই সংক্রান্ত বিধিমালায় ক্ষুদ্র মূলধনী কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের জন্য ১০ লাখ টাকার সীমা নির্ধারিত ছিল। তবে পরবর্তীতে শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশন আলাদা একটি নির্দেশনার মাধ্যমে এই সীমা বাড়িয়ে ৩০ লাখ টাকা করে। এতে আইনের মূল উদ্দেশ্যের সাথে নির্দেশনার সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এসএমই বোর্ডের লেনদেনের গভীরতায়। নতুন কমিশন এখন মূল বিধিমালার আলোকে আবারো ১০ লাখ টাকার সীমা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সাধারণত এসএমই বোর্ড মূলত ৫ কোটি থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত পরিশোধিত মূলধনসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর জন্য মূলধন সংগ্রহের একটি বিকল্প প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হয়। বাজার সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, ৩০ লাখ টাকার বিনিয়োগ শর্তটি আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল এবং এটি এসএমই বোর্ডের তারল্য সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করেছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এসএমই শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ সহজ হবে এবং দীর্ঘদিন ধরে নিস্তেজ হয়ে থাকা এই প্ল্যাটফর্মে লেনদেন বাড়বে বলে তারা আশা করছেন।

২০২১ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকেই এসএমই বোর্ড বারবার নীতিগত পরিবর্তনের মুখে পড়ে। শুরুতে বিনিয়োগের ন্যূনতম সীমা ছিল ৫০ লাখ টাকা, যা পরবর্তীতে কমিয়ে ২০ লাখ এবং এরপর আবার বাড়িয়ে ৩০ লাখ করা হয়। এই ঘন ঘন পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও আগ্রহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে ২০২৫ সালে এসএমই সূচক ‘ডিএসএমইএক্স’ প্রায় ২১ শতাংশ কমে ৮৫৫ পয়েন্টে নেমে আসে এবং দৈনিক গড় লেনদেন সীমিত হয়ে দাঁড়ায় মাত্র ৫ কোটি টাকায়। নতুন নীতিমালার ফলে ২০২৬ সালে এসএমই বোর্ডে আবারো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে বলে প্রত্যাশা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।