নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, বিএনপি পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিবাদের রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করেছে। রাষ্ট্রের মৌলিক যেসব জায়গায় পরিবর্তন দরকার, সুশাসন কায়েমের জন্য, সত্যিকারের স্বাধীনতার স্বাদ জনগণকে দেয়ার জন্য, প্রত্যেকটি বিষয়ে বিএনপি বিরোধিতা করে চলেছে। এটি জাতির সাথে সুস্পষ্ট প্রতারণা।
গতকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই জাতীয় সমাবেশে’ সভাপতির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিএনপি ও আমরা একসময় একসাথে মজলুম ছিলাম। বিএনপি হাজার চেষ্টা করলেও ওই আওয়ামী লীগ হতে পারবে না; বড়জোর দুর্বল আওয়ামী লীগ হতে পারবে। যে আওয়ামী লীগ একসময় পুরো জাতিকে নিয়ে কিংবা বিরোধী দলকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করত, আজ তাদের কী দশা? আপনারা ঠিক একই কাজ শুরু করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, আওয়ামী লীগ তাদের পোষ্য লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে কর্তৃত্ব কায়েম করেছিল। কিন্তু তাদের সে দুর্দিনে কোনো লাঠিয়াল পাশে এসে দাঁড়ায়নি।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি তাদের ইশতেহারে দেয়া ৩১ দফা কর্মসূচিরই বিরোধিতা করছে। আমার মনে হয়, তারা যে বিরোধিতা করছে এই জ্ঞানটাও বোধহয় তারা হারিয়ে ফেলেছে। জামায়াতে আমির বলেন, ভুলে যাবেন না, এ জুলাই না হলে, মানুষ জীবন না দিলে আপনারা ক্ষমতা এনজয় করতে পারতেন না।
তিনি বলেন, যারা বিদেশে ছিলেন, স্বদেশে আসার সুযোগ পেয়েছেন। এ বিপ্লব না হলে আপনারা বোধহয় কল্পনাও করতেন না দেশে ফিরে আসার। এখন কেউ কেউ দাবি করে অমুক নেতা আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড। অমুকের নেতৃত্বে আন্দোলন সফল হয়েছে। এসব সব ভুয়া।
তিনি বলেন, আমরা কারো ন্যায্য অবদানকে কখনো অস্বীকার করি না। আন্দোলন আমরা সবাই করেছি। কিন্তু আমরা তীরে ফিরতে পারি নাই। আমাদের তরি সমুদ্রে ভাসমান ছিল। জুলাই আন্দোলনের নায়কেরা এ তরি নিয়ে ঘাটে ভিড়েছে। জাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছে। তাদের সম্মান করতে শিখুন, ভালোবাসতে শিখুন। তাদের নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবেন না।
জামায়াতের আমির আরো বলেন, সংসদে আমরা প্রথম দিনেই দাবি তুলেছি সংস্কার পরিষদ গঠনের। আমরা শপথ নিয়েছি, তারা শপথ নেন নাই। জাতির সাথে দেয়া ওয়াদা ভঙ্গ করে তারা প্রতারণা করেছেন। এরপরে যখন জাতিকে প্রতারিত করা হয়েছে, আমরা নোটিশ দিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করেছি। তারা তার বিরোধিতা করেছে। যে আইনগুলো সংশোধন না হলে অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন না হলে, ফ্যাসিবাদী শাসনের পরিবর্তন হবে না তার সবগুলো আগের স্বৈরাচারী সরকারের মতো রাখার পক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, এমনকি আইনের আশ্রয়স্থল থানার ভেতরে ঢুকে দুঃখজনকভাবে ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপরে হামলা করা হয়েছে। নেত্রকোনায় আমাদের এক এমপি ও তার গাড়ির ওপর হামলা হয়েছে। বার্তা পরিষ্কার, যেদিন তারা গণভোটের রায় অস্বীকার করেছে আমি বলেছিলাম বিএনপি আজ থেকে ফ্যাসিবাদের পথে যাত্রা শুরু করল।
তিনি বলেন, এ বাংলাদেশ আমরা চাই না। আমরা পরিবর্তনের বাংলাদেশ চাই। আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমাদের সন্তানদের হাতে দা কুড়াল দেখতে চাই না। আমরা খাতা-কলম দেখতে চাই। কোনো আদুভাই, দাদুভাই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে আমাদের সন্তানদের পথ আটকাবে, আমরা এটা দেখতে চাই না। এ সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। যদি বন্ধ না করেন, মনে রাখবেন জুলাই শুধু ২৪ সালে ছিল না। জুলাই প্রত্যেক বছরে আসে। সে জুলাই আবার ফিরে আসবে। তখন ফাইনালি ফ্যাসিবাদের কবর রচনা হবে। শুভ বুদ্ধির উদয় হোক, জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান দেখান। ৭০ ভাগ মানুষের রায় মেনে নিন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন যদি না করেন, আমাদের লড়াই সংসদের ভেতরেও চলবে, খোলা ময়দানেও চলবে ইনশাআল্লাহ।
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সরকার মাত্র দুই মাসে এতটা অজনপ্রিয় হয়নি। আমরা জানি না, আগামী ছয় মাসে তাদের কী পরিণতি হবে। আমরা কোনো অস্থিতিশীলতা চাই না। আমাদের দাবি একটাই, গণভোটের আলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন। আমরা সেটার জন্য রাজপথে এবং সংসদে আছি। ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা এ দাবি আদায় করে ছাড়বো।
আওয়ামী লীগের পথে হাঁটলে ভয়াবহ পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়ে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানকে বিএনপি যে নতুন করে দলীয়করণ করছে, এর মাধ্যমে তারা আওয়ামী লীগের পথেই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিএনপি যদি আওয়ামী লীগের পথে, পুরনো স্বৈরাচারের পথে এ দেশকে এগিয়ে নিতে চায়, তাহলে বাংলাদেশের জনগণ আবারো রুখে দাঁড়াবে। নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দিয়ে জনগণকে ভোলানোর চেষ্টা করছে; কিন্তু এ কার্ড দিতে দিতে তাদের জ্বালানি ফুরিয়ে গেছে, তেল ফুরিয়ে গেছে।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট কর্র্নেল (অব:) অলি আহমেদ বীরবিক্রম বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে বলবো অহঙ্কার আপনাদের ধ্বংস করে দিচ্ছে। এটা থেকে বের হয়ে আসুন। আপনার চারপাশে যারা আছে তাদের বেস্টনি থেকে বের হয়ে আসুন। ১১ দলের নেতাদের সাথে বসেন। আলোচনা করে দ্রুত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করুন। না হলে রাজপথে আবারো জনতার মিছিল বাড়তে থাকবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বিএনপি এখন যে রাজনীতি করছে সেটা তাদের দু’টি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত; একটি হলো সুবিধাবাদের রাজনীতি, আরেকটি হলো দ্বিচারিতার রাজনীতি। এ মোনাফেকি করে দ্বিচারিতা করে একবার গাং পার হতে পেরেছেন। ভবিষ্যতে আপনারা জাতির কাঠগড়ায় আসামি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবেন। সুবিধাবাদের রাজনীতি বাদ দেন। গণভোটের রায় কার্যকর করুন। তিনি বলেন, বিএনপি বলছে তারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবেন। এটা মূলত জনগণের সাথে নতুন করে আরেকটি প্রতারণা এবং ভাঁওতাবাজি।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি বলেন, জুলাই আন্দোলন হয়েছিল নতুন বাংলাদেশ গড়তে, আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত করতে। আজ সে আন্দোলনকে অস্বীকার করা হচ্ছে। আজকে দু’মাসের মাথায় রাজপথে নামতে হচ্ছে। এটি কারো জন্য সুখকর হবে না। জুলাইয়ে দেশ আবার স্বাধীন হয়েছে। আজকে আবার এক ব্যক্তির শাসনের দিকে নিতে চায় বিএনপি, কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ তা মেনে নেবে না। সরকার যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে, তাহলে ১১ দল আন্দোলনের ডাক দিলে প্রথম কাতারে থেকে প্রথম শহীদ হওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। আমরা গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য জনগণকে সাথে নিয়ে আবার দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলব। যেসব সাংবিধানিক কাঠামো ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার জন্য দায়ী, তার প্রত্যেকটি সংস্কারের জন্য যে প্রস্তাবনা, তাতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বিএনপি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ এবং নির্বাহী পরিষদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরো বক্তৃতা করেন, সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম এমপি, ড. হামিদুর রহমান আযাদ, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, এবি পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির মুফতি মুখলেসুর রহমান কাসেমী, বিডিপির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, জাগপার সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন, ল ইয়ার্স কাউন্সিলের সভাপতি অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, জুলাই শহীদের মা রোকেয়া বেগম, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান, শহীদ আকিবের পিতা অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় ছাত্র সংসদের জিএস মাজহারুল ইসলাম, জুলাইযোদ্ধা কামরুল হাসান, জুলাই শহীদ যুবায়ের খানের পিতা অ্যাডভোকেট শহিদুল ইসলাম খান, শহীদ আনাস ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম খান, হাত হারানো জুলাইযোদ্ধা তৌহিদ ফারাজী, জুলাই শহীদের পিতা জাকির হোসেন, শহীদের পিতা শেখ জামাল হোসাইন, শহীদের পিতা গাজিউর রহমান, হাত হারানো জুলাইযোদ্ধা আতিকুল ইসলাম প্রমুখ।



