৭ অক্টোবরের আক্রমণ ও গাজায় ইসরাইলি বর্বরতার দুই বছর পূর্তি

বন্দীদের ফেরানোর দাবিতে ইসরাইলে মন্ত্রী-এমপিদের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ

Printed Edition
গাজা উপত্যকায় হামাস কর্তৃক আটক ইসরাইলি বন্দিদের আত্মীয়স্বজন এবং সমর্থকরা তাদের প্রিয়জনদের অবিলম্বে মুক্তির দাবিতে ও যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন : ইন্টারনেট
গাজা উপত্যকায় হামাস কর্তৃক আটক ইসরাইলি বন্দিদের আত্মীয়স্বজন এবং সমর্থকরা তাদের প্রিয়জনদের অবিলম্বে মুক্তির দাবিতে ও যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন : ইন্টারনেট

টাইমস অব ইসরাইল

জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলে হামাসের দুঃসাহসী অভিযানের দ্বিতীয় বছর পূরণ হলো গতকাল ৭ অক্টোবর। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় আটক ইসরাইলি বন্দীদের মুক্তির দাবিতে মঙ্গলবার ইসরাইলের বাণিজ্যিক রাজধানী তেল আবিবে কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপির বাড়ির সামনে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ করেছেন বন্দীদের পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা।

ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা ইসরাইলের সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইলকে বলেছেন, ইসরাইলের সরকার গাজায় আটকে থাকা বন্দিদের কথা ‘ভুলে গেছে’। সরকারকে তা স্মরণ করিয়ে দিতেই এ কর্মসূচি পালন করছেন তারা। ইসরাইলের সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য এ ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি; তবে তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে নিহতদের স্মরণ করা হচ্ছে; নিহতদের ছবি পোস্টার আকারে বিভিন্ন জায়গায় টানানো হয়েছে, সেখানে শ্রদ্ধাও নিবেদন করছেন সাধারণ লোকজন।

এ ছাড়া গাজায় আটকে থাকা বন্দীদের মুক্ত করতে এবং গাজায় যুদ্ধের অবসানে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নতুন পরিকল্পনা হাজির করেছেন। সেই প্রস্তাবের ওপর মিসরের পর্যটন শহর শারম আল শেখ শহরে গত সোমবার বৈঠক শুরু হয়েছে ইসরাইল, হামাস এবং এ যুদ্ধের ৩ মধ্যস্থতাকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মিসর ও কাতারের প্রতিনিধি। গতকাল মঙ্গলবারেও বৈঠক অব্যাহত আছে।

স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র ও দশকের পর দশক ধরে ইসরাইলি হত্যালীলা ও দখলদারিত্বের অবসানের লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ভোরবেলায় ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে ঢুকে অতর্কিত অভিযান চালায় ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের যোদ্ধারা। অভিযানে এক হাজার ২০০ জন নিহতের পাশাপাশি ২৫১ জনকে বন্দী হিসেবে ধরে নিয়ে যায় তারা। এই হামলার জবাব দিতে এবং বন্দীদের মুক্ত করতে পরের দিন থেকে গাজায় সামরিক আগ্রাসন শুরু করে ইসরাইলি বাহিনী।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ইসরাইলি আগ্রাসনে ৬৭ হাজার ১৬০ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং আহত হয়েছেন এক লাখ ৬৯ হাজার ৬৭৯ জন। নিহত ও আহতের অধিকাংশই শিশু, নারী ও বেসামরিক মানুষ। নিহতের প্রকৃত সংখ্যা অবশ্য আরও বেশি। কারণ অনেকের লাশ ভবনে ধ্বংসস্তূপের তলায় চাপা পড়ে থাকায় তাদেরকে হিসেবের মধ্যে ধরা হয়নি।

গাজায় সামরিক আগ্রাসন পরিচালনার পাশাপাশি গত দুই বছর ধরে সেখানে ত্রাণ সরবরাহও সীমিত রেখেছে ইসরাইল। ফলে খাবার, ওষুধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অভাবে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় শুরু হয়েছে সেখানে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, খাদ্যের অভাবে শুধু অপুষ্টির শিকার হয়ে গত দুই বছরে গাজায় মৃত্যু হয়েছে দুই শতাধিকের। এই মৃতদের প্রায় সবাই শিশু।

গাজায় গত দুই বছরের আগ্রাসনে হামাসের শীর্ষ নির্বাহী নেতা ইসমাইল হানিয়া, তার উত্তরসুরী এবং ৭ অক্টোবর হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী ইয়াহিয়া সিনওয়ারসহ হামাসের অধিকাংশ শীর্ষ নেতা, কমান্ডার এবং যোদ্ধাদের হত্যা করেছে ইসরাইলের বাহিনী। হামাসকে সহযোগিতা করার দায়ে প্রতিবেশী দেশ লেবাননে বিমান অভিযান চালিয়ে প্রকিশোধ সংগঠন হিজবুল্লাহর ওপরও হামলা চালিয়েছে ইসরাইল।

দলটির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে, ধ্বংস করা হয়েছে অস্ত্রভাণ্ডার ও বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা। এককথায় হিজবুল্লাহর পুরো নেটওয়ার্ক তছনছ করে দেয়া হয়েছে। গাজায় সামরিক অভিযান বন্ধ ও আলোচনার ভিত্তিতে বন্দিদের মুক্তির জন্য গত দুই বছর ধরে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ওপর ব্যাপকভাবে চাপ এসেছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল থেকে।

তবে নেতানিয়াহু এসব চাপ এবং আহ্বানে আমল দেননি। তিনি গাজায় সামরিক আগ্রাসন অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, সেই সঙ্গে পশ্চিম তীরেও ইসরাইলি দখলদারিত্ব বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর মধ্যেই গত ২২ অক্টোবর ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতিদানের জন্য ফ্রান্স ও সৌদি আরবের উদ্যোগে আয়োজিত বৈশ্বিক সম্মেলন এবং সেই সম্মেলনে এবং সম্মেলনের আগে ও পরে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, লুক্সেমবার্গসহ বেশ কয়েকটি দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল অবশ্য সেই সম্মেলন বয়কট করেছিল, তবে ইউরোপের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ায় টনক নড়ে ইসরাইলের। ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে রাজি হতে তাই বেশি সময় নেননি নেতানিয়াহু।